দ্বীপের জঙ্গলে গুলি করা হবে আমাদের!

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭২তম তম পর্ব

দ্বিতীয় ক্ষেপে হরিপদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়ার পর আমি খালি ভাবছি, পুলিশ কী করছে, হরিপদ পুলিশকে কী বলছে কে জানে! একবার তো মনে হল, হরিপদ ব্যথায় চিৎকার করছে। আমি আর সহ্য করতে না পেরে গারদের কোলাপসেবল গেট ধরে শব্দ করে ঝাঁকুনি দিতে লাগলাম। একজন সাব ইনস্পেকটর ছুটে এলেন সেই শব্দ শুনে। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করায় আমি তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করলাম, আমার বন্ধুকে কেন আপনারা এভাবে মারছেন?” ওই সাব ইনস্পেকটর খোঁজ নিয়ে এসে বললেন, “ধুর মশাই, আপনার বন্ধুকে দেখলাম, বড়োবাবুর পাশে চেয়ারে বসে সিগারেট খেতে খেতে কথাবার্তা বলছেন”। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হরিপদ ফিরলে আমার ডাক পড়ল। এভাবে সন্ধে পর্যন্ত আমাদের তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ চলেছিল। না, কেউ আমাদের গায়ে হাত দেয়নি। আমাদেরও একই কথা একঘেয়েভাবে বলে চলা।

(গত পর্বের পর) 

বাইরের দোকান থেকে আমাদের চারজনের জন্য শালপাতা করে রুটি-তরকারি এল। আমরা মুখহাত ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরুতে না বেরুতে গারদের কোলাপসেবল গেট নাড়িয়ে আমাদের দু’জনকে থানার বড়োবাবু জানান দিয়ে গেলেন, আমরা যেন রাত এগারোটা নাগাদ তৈরি থাকি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এত রাতে কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?” বড়োবাবু বললেন, “আপনাদের নিয়ে যাওয়া হবে একটা দ্বীপের জঙ্গলে। সেইখানে কেবল দুটি গুলি খরচ করব আমরা – ঢিসুম ঢিসুম”। তাঁর বলার ঢঙে আমরা হেসে উঠলাম। 

বড়োবাবু বললেন, “বিশ্বাস হল না? ঠিক আছে, এখন শেষ ঘুমটা খানিক ঘুমিয়ে নেন। আমরা আপনাদের জাগিয়ে নিয়ে যাব”। হরিপদ সেদিন রাত্তিরে আমার কানে কানে বলা কথাটা জোরে জোরেই বড়োবাবুকে শুনিয়ে দিল, “বিপ্লবীদের হত্যা করে বিপ্লবকে ঠেকানো যায় না”। বড়োবাবু হেসে বললেন, “তাই নাকি! আজ রাতেই সে পরিচয় পাওয়া যাবে।”

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ক’জন পুলিশ, একজন অফিসার-সহ থানার দারোগাবাবু কোলাপসেবল গেটের তালা খুলিয়ে আমাদের গারদ ঘরে ঢুকলেন। এবং হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী তৈরি তো?”

এতক্ষণ পর্যন্ত বড়োবাবুর কথাটাকে ঠাট্টা ধরে নিয়েছিলাম। এখন মনে হল, তা হলে ব্যাপারটা সত্যি সত্যি ঘটতে চলেছে! হরিপদ আমার মুখের দিকে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকাল। আমি বললাম, তৈরি হয়ে নিই দু’জনে”।

পুলিশ একজোড়া হাতকড়া নিয়ে ঘরে ঢুকল। আমি হাত বাড়াতেই বড়োবাবু মেঝেতে শুয়ে থাকা এক ‘গরুচোর’কে পা দিয়ে ঠেলে বললেল, “এই শালারা ওঠ, রেডি হ”। ওরা ধরমর করে উঠে দাঁড়াল। আমার বাঁ হাতের সঙ্গে এক ‘চোরের’ ডান হাত আর হরিপদর বাঁ হাতের সঙ্গে আরেক ‘চোরের’ ডান হাতে হাতকড়া পরাতেই আমি অনুমান করে নিলাম, ওরা আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাবে। তবে দ্বীপে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারার গল্পটা ঢপ ছাড়া কিছুই নয়। তা হলে নিশ্চয়ই গরুচোরদেরও আমাদের সঙ্গে নিত না।

রাত বারোটা নাগাদ আমাদের নিয়ে একটা চালাওয়ালা ভটভটি নৌকো গোসাবা থেকে অন্ধকারে জল কেটে যাত্রা শুরু করল। নৌকোর ঠিক মাঝখানে আমরা জোড়ায় জোড়ায় হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় বসে ঝিমুতে ঝিমুতে রাতটা কাটিয়ে দিলাম। এটি যাত্রীবাহী নৌকো। নৌকো ভর্তি যাত্রী ও নানা মালপত্র। জানতাম এই নৌকোটি রোজই রাত্রিতে এভাবে যাত্রী নিয়ে গোসাবা-হিঙ্গলগঞ্জ চলাচল করে। 

ভোর হল। ভটভটির একঘেয়ে শব্দ কমে আসতেই লোকজন নামার জন্য তৈরি হওয়া শুরু করল নিজেদের মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে। দেখি ফেরিঘাটে আমাদের স্বাগত জানাবার জন্য একদল পুলিশ রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব যাত্রী ও মালপত্র নেমে যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গে আসা পুলিশেরা ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশদের হাতে আমাদের তুলে দিয়ে কী সব কাগজপত্র সইসাবুদ করতে চলে গেল। ঘাটের পুলিশরা আমাদের দু’জনকে আর গরুচোরদের আলাদা জোড়া হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে দিল। আমাদের দু’জনকে নিয়ে একটা পুলিশ ভ্যান শহরে ঢুকল। দোকানপাটে্র সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম, আমরা চলেছি বসিরহাটে। পুলিশদের কাছ থেকে জানলাম, আমাদের বসিরহাট পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গাড়ি ওই দপ্তরের গেটে এসে পৌঁছল। পুলিশরা জোরে কী একটা সংকেত বলে চেঁচিয়ে উঠতেই গেট খুলে দিল পাহারাদারেরা। গাড়ি ভেতরে ঢুকে গেল। থানার লক-আপে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে এই পুলিশদের কাজ শেষ।

(চলবে…) 

(ছবি  প্রতীকী)

Developed by DXDasia