
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৫তম পর্ব
ধীরে ধীরে মেলায় সন্ধে নেমে আসে। সংকীর্তনের সুর ভেসে আসে। মেলা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য লোকজনের ঠেলাঠেলি। আমাদের দোকানে কিন্তু তখনও ভিড়। বেঞ্চি দখল করে বসে আছে সাত-আটজন। এছাড়াও গোটা আট-দশজন লোক ভিড় করে কী যেন বলাবলি করছে। কমলদার গরম জলের ডেস্কিতে জলের টগবগ শব্দ, কাঁচের গ্লাস ধোওয়ার ঠুনঠুন ব্যস্ততা। এমন সময়…
(গত পর্বের পর)
“ধর ধর শালাদের ধর” বলে চিৎকার করে উঠে ভিড়ের লোকগুলো আমাদের দু’জনকে জাপটে ধরল। কয়েকজন আমাদের দু’হাতে দড়ি বেঁধে দিল। মাটিতে ফেলে কিল, চড়, লাথি – যে যা পারে মারতে লাগল আমাদের। চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসতে লাগল। কেউ বলে উঠল, “ডাকাত ডাকাত!” কেউ বলল, “শালারা নকশাল! মার শালাদের মার!”
আমরা দু’জনে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে যতদূর সম্ভব নিজেদের বাঁচিয়ে মার খেয়ে যেতে লাগলাম। তবে মারার লোকের চেয়ে আমাদের দেখার ভিড়টাই বেশি ছিল। আর ছিল আতংক। “ব্যাটারা নিশ্চয়ই দু’জনই মাত্র নয়। এদের আরও লোকজন ধারেকাছে কোথাও আছে” – এসব নানা কথাবার্তা আমাদের কানে আসতে লাগল। একদল এসে আমাদের দু’জনের কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে চলল নদীর দিকে। পাঞ্জাবি পরা একজন লোক আমাদের দিকে একটা বন্দুক উঁচিয়ে ধরে পেছন পেছন হেঁটে চলল, আর মুখে বলতে লাগল, “এবারে শেষ করে দেব ব্যাটাদের”। হঠাৎ একটা চিৎকার কানে ভেসে এল। পাশের কোন গ্রামে নাকি এক ঝুড়ি বোমা নিয়ে তিন-চারজন ছুটে পালাচ্ছিল, গ্রামের লোকেরা তাদের তাড়া করে ধরে ফেলেছে। আর এ খবর পেয়ে বন্দুক হাতে লোকটা সামনে শিকার পাওয়া বাঘের মতো বন্দুক উঁচিয়ে লাফালাফি করতে লাগল। কিছু লোক আমাদের পরনের কাপড়-চোপর সার্চ করে দেখতে লাগল পিস্তল-টিস্তল আছে কিনা। কিছু না পেয়ে এদের যেন সাহস আরও বেড়ে গেল। যে যেদিক থেকে পারে আমাদের দু’ঘা মেরে আবার ভয়ে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে।
নদীর পাড়ে এসে ভিড়টা একটু হাল্কা হয়ে গেল। চার-পাঁচজন লোক আলোচনা করতে বসল। আমাদের ‘বিসর্জন’টা কীভাবে হবে, তা নিয়েই আলোচনা হচ্ছে, সন্দেহ নেই। আমাদের আর দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা ছিল না। দু’জনে কেমন নেতিয়ে বসে পড়লাম। এটুকু শুনতে পেলাম, আমাদের নৌকো করে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হবে। বন্দুকধারী লোকটা বলল, “তোমরা একটু অপেক্ষা করো, আমি ক’টা ‘দানা’ নিয়ে আসি আরও”। আমাদের দু’জনারই তখন প্রায় কাহিল অবস্থা। চারদিকে আমরা শুধু ছায়াছায়া মানুষের দৌঁড়াদৌঁড়ি দেখতে পাচ্ছি। শুনতে পাচ্ছি, “ওই তো নৌকা এসে গেছে! নৌকা এসে গেছে!”
এবং নৌকো এল। নৌকোর কাঠ তুলে টেনে হিঁচড়ে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে যাত্রা শুরু করল। নৌকোর পেটে জমে থাকা নোনা জলের আদরে আমাদের দেহের ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলো জ্বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সচেতনতা ফিরে পেলাম। হরিপদকে কানে কানে বললাম, “গুলি খেয়ে মরার আগে আমরা কী বলব, হরিপদ?” ও ফিসফিস করে বলল, “বিপ্লবীদের হত্যা করে বিপ্লবকে ঠেকানো যায় না, যাবে না”। বন্দুক হাতে লোকটা আমাদের ফিসফিসানি বোধহয় শুনতে পেয়েছিল। বলে উঠল, “যতই ফন্দি আঁটো, তোমাদের বিপ্লব এবার কাবার হয়ে এল”। এবং বলে খ্যাঁক করে একবার হেসে উঠল।
হরিপদর সাথে আমার খুব বেশি চেনা জানা ছিল না। কিন্তু তার মুখে আমার প্রশ্নের ওই জবাব শুনে ব্যথা বেদনা যেন কোথায় উড়ে গেল। হাত খোলা থাকলে আমি ওকে সেদিন বিপ্লবী উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরে বলতাম, “সাবাশ! কমরেড, সাবাশ!" সেই উল্লাস প্রকাশ করার কোনো সময় দিল না আমার দেহ। আমি এবার সত্যি সত্যি জ্ঞানহারা হলাম।
(চলবে)
