
যাত্রা শুরু হল এবার…
সমীরদা আমাকে শেয়ালদা স্টেশন থেকে দুপুর দু’টো নাগাদ একটা ডায়মন্ড হারবার লোকাল ট্রেনে চেপে মগরাহাট স্টেশনে নামতে নির্দেশ পাঠালেন। সেই নির্দেশমতো আমি মগরাহাট স্টেশনে নেমে এধার-ওধার সমীরদাকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ নজরে এল, স্টেশনের ওভারব্রিজের নিচে লুঙ্গি ও ছেঁড়া শার্ট পরা ছাতা মাথায় একজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে। কথা ছিল, সমীরদা আমাকে দেখতে পেলেই ছাতাটা বন্ধ করে হাঁটতে শুরু করবেন। আমি একটু তফাত থেকে তাঁকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকব। ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ছাতা বন্ধ করে একবার আমাকে দেখল এবং হাঁটা শুরু করল। আমিও একটু দূরত্ব বজায় রেখে তাঁর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। আমার পরনে হাফ শার্ট ও পাজামা। মাথায় একটা ঢাউস ব্যাগ, সেই ব্যাগে লালফৌজে যোগদানের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চিরকালের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা ‘বিপ্লবী’-র একা একা হেঁটে চলা।
বাঁ পাশে একটা খাল নাক বরাবর চলে গেছে। তারই পার ধরে একটি সোজা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে অনেকের সঙ্গে দূরের গ্রামের দিকে হেঁটে চলেছেন সেই মানুষটি। আমিও হেঁটে চলেছি তার পেছন পেছন। ট্রেন থেকে নামার সময়েই আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখতে পেয়েছিলাম। এবার আকাশ উপুড় করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টি দু’জন মানুষের মধ্যে গোপনীয়তার ব্যবধান কমিয়ে দু’জনকে এক ছাতার তলায় মিলিয়ে দিয়েছিল। সেই সাধারণ মানুষটি আমার কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, “সারাদিন পেটে কিছু পড়েছে?” উত্তরে আমি বললাম, “দুপুরে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি সমীরদা”। সমীরদা তক্ষুনি আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “উঁহু, এখানে আমাকে আর সমীরদা বলে ডাকা নয়। আমার নাম খগেন। অর্থাৎ আমাকে ডাকবি খগেনদা বলে। এখানে লোকে আমাকে খগেন ডাক্তার বলে চেনে। আমি গাঁয়ের লোকেদের বায়োকেমিক ওষুধ দিই। আর তোর নাম এখন থেকে হল সনাতন, ডাক নাম সোনা। মনে থাকবে তো?”
তারপর মাইল তেরো হেঁটে, কাদায় রাস্তায় পা পিছলে আছাড় খেতে খেতে, ভিজে চুপসে আমরা দু’জনে যখন গ্রামের একটা কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন রাত প্রায় এগারোটা। ব্যাঙের গোঙানি, পাতা থেকে জল ঝরবার টুপটাপ শব্দ এবং দূরে কয়েকটা কুকুরের ডাক ছাড়া গ্রামে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। খগেনদা অতি সাবধানে সেই ঘরের দরজার কড়া আস্তে আস্তে নাড়তে নাড়তে মৃদুস্বরে দু’বার ডাকলেন, “ওস্তাদ, অ্যাই ওস্তাদ। ঘরের মধ্যেই সেই ওস্তাদ যেন ধড়মড় করে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠেছিল। তারপর, দেশলাইয়ের বারুদ কাঠির ঘষঘষানি এবং একটা জ্বলন্ত কেরোসিন ল্যাম্প হাতে এক গ্রাম্য তরুণের আত্মপ্রকাশ। ফিসফিসিয়ে তার জিজ্ঞাসা, “তোমরা এসে গিয়েছ? যাও, ঘাট-পানে গিয়ে পা-হাত ধুয়ে এসো”।
তারপর দুপুরে জল দিয়ে ভিজিয়ে রাখা পষ্টিভাত গিলে তিন জন মিলে সারারাত ফিসফিসিয়ে গল্প, কেবল গল্প। কখন ঘাঁটি অঞ্চলে পৌঁছব, গণফৌজে যোগ দিয়ে রাইফেল হাতে জোতদার জমিদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব, তার জন্য আমার মনে তখন ছটফটানি এবং এক সময় তিনজনেই ঘুমিয়ে পড়া।
(চলবে)
