দিল্লির চিনা দূতাবাসের কর্মীরা আমাকে বললেন কলকাতার একটি হোটেলে দেখা করতে

বৈদ্যবাটিতে হাজির হলেন ‘চিনাম্যান’-রা

এর মধ্যে একদিন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসলেন নয়া দিল্লির চাইনিজ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও থার্ড সেক্রেটারি। আমি সেইদিন চুঁচুড়াতে গণনাট্যকর্মীদের এক সভায় গিয়েছিলাম।

আমরা আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচারের জন্য সিপিএম-এর মধ্যে থাকাকালীন সময়েই একটা নাট্যদল গড়ে তুলেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম ‘প্রেরণা’। ‘প্রেরণা’ গণনাট্য আন্দোলন, যা ছিল সিপিআই(এম)-এর অফিসিয়াল লাইনের ছাতার তলায়। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে উৎপল দত্তের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সংযুক্ত গণশিল্পী সংস্থা’-য় ঢুকে পড়েছি আমরা। সেদিন চুঁচুড়াতে সেই যোগদান সম্পর্কে একটা আলোচনাসভায় দুপুরেই চলে গিয়েছিলাম। ফিরলাম সন্ধেবেলা। আমাদের পাড়ায় ঢোকার মুখে ডানদিকে ছিল (এবং এখনও আছে) একটা বিশাল পুকুর। বাঁ দিকে আটাকল। আমাদের পাড়ারই এক ভদ্রলোক সেই গমকল চালাতেন। দিনটা ছিল রোববার। আমি বাড়ি ফিরতেই আমার বাড়ির লোকেরা জানাল, দু’জন ‘চিনাম্যান’ নাকি একটা গাড়ি করে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমাকে না পেয়ে মোড়ের সেই গমকল মালিকের হাতে নাকি কী সব দিয়ে গেছেন। সেই রাতেই ছুট লাগালাম তাঁর বাড়ি।

তিনি আমার হাতে এক বড়োসড়ো প্যাকেট আর একটা চিঠি দিয়ে বললেন, ওই ‘চিনাম্যানেরা’ নাকি কলকাতা থেকে জিটি রোড ধরে আসার পথে বৈদ্যবাটি পোস্ট অফিসের সাইনবোর্ড দেখে গাড়ি থেকে নেমে আমার বাড়ির ঠিকানাটা কোথায় হবে, তার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একটি ছেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে আমাকে ও আমার বাড়ি কোথায় জানত। সে-ই আমাদের পাড়া পর্যন্ত তাঁদের নিয়ে এসেছিল। ওই আটাকলের সামনে গাড়ি রেখে ওঁরা আমার বাড়ি এসে আমাকে না পেয়ে গমকলের মালিক সেই ভদ্রলোকের হাতে একটা প্যাকেট ও একটা চিঠি দিয়ে গেছে। আমি ভদ্রলোকের বাড়ি যেতেই নিদারুণ বিস্ময় নিয়ে তিনি সেই ‘চিনাম্যান’দের সম্পর্কে নানা কথা বলে আমার হাতে সেই প্যাকেটটা এবং চিঠিভরা একটা এনভেলাপ তুলে দিলেন। আমি সেগুলো নিয়ে বাড়ি এসে দেখলাম – প্যাকেটে আছে ইংরেজিতে চার খণ্ড মাও রচনাবলী এবং খামের মধ্যে রয়েছে একটি চিঠি। ওই ‘চিনাম্যানেরা’ হলেন নয়া দিল্লির চিনা দূতাবাসের ফার্স্ট ও থার্ড সেক্রেটারি। তাঁরা আমাকে একটা নির্দিষ্ট তারিখে ডালহৌসির একটা বিখ্যাত হোটেলের ঘরের নম্বর দিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করতে বলেছেন।

নয়া দিল্লির চাণক্যপুরীতে অবস্থিত চিনা দূতাবাসের সঙ্গে আমার চিঠিপত্রের যোগাযোগ ছিল বেশ কিছুকাল ধরেই। ওঁরা আমাকে নিয়মিত ‘সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি’-র খবর সমৃদ্ধ বুলেটিন পাঠাতেন। আমি ওঁদের কাছে কাছে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সম্পর্কে ছবি পাঠাতে লেখায় ওরা আমাকে প্রচুর ফটো পাঠিয়েছিলেন। মিনার্ভা মঞ্চে যে ক’দিন ‘নকশালবাড়ি উৎসব’ চলেছিল সেই কয়দিন মঞ্চের টিকিট কাউন্টারের সামনে আমি ওই ফটো সাজিয়ে একটি প্রদর্শনী করেছিলাম, যে কথা এই লেখায় আমি আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু সেই দূতাবাসের উচ্চপদস্থ লোকেরা দিল্লি থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, সেটা আমার ভাবনারও অতীত ছিল।

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia