বক্তৃতার শুরুতেই ছাত্রনেতার মাইক কেড়ে নিতে বললেন প্রিন্সিপ্যাল

ভারত-চিন যুদ্ধ আলোড়িত করেছিল সেদিনের ছাত্রসমাজকে

ছাত্র পরিষদের নেতারা আমাদের জব্দ করতে এবার আরেকটা ফন্দি আটল। এনসিসি’র কমান্ডার ধরনের একজন উচ্চপদস্থ কর্তাকে এনে ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে কলেজে একটি সভার আয়োজন করল। কলেজ কর্তৃপক্ষও তাতে সায় দিয়ে সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে ও শিক্ষকদের উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক করে সে সভার বন্দোবস্ত পাকা করলেন। প্রিন্সিপ্যাল হলেন সে সভার সভাপতি। অনেকেই তাঁদের বক্তৃতায় কে কতটা দেশপ্রেমিক তা প্রমাণের চেষ্টা করলেন। চিনপন্থী ‘দেশদ্রোহী’দের এদেশ থেকে বিতাড়ন কতটা জরুরি তা ছাত্রছাত্রীদের বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা চলল। আমাদের বিরুদ্ধে ছাত্র পরিষদের ছেলেরা ‘চিনের দালাল মুর্দাবাদ মুর্দাবাদ’ শ্লোগান তুলে আমাদের একঘরে করে দিতে উঠে পড়ে লাগল। আমরা সব শুনে চুপচাপ হয়ে রইলাম উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায়। এবং কিছুক্ষণ পরেই সেই সুযোগ আমাদের করে দিলেন প্রধান বক্তা সেই ‘কমান্ডার’ মশাই। তিনি তাঁর বক্তৃতায় কলেজের ছেলেমেয়েদের কেন এনসিসিতে যোগদান করা উচিত তার ব্যাখ্যা দিলেন। অনেকের ধারণা, সেনাবাহিনীতে যোগদান করলে নাকি তেমন আয় হয় না – এ ধারণা যে কত ভুল তা তিনি ব্যাখ্যা করে বোঝালেন। আমি মনে মনে বললাম, এবার কমান্ডার, তোমার জব্দ হবার পালা! একটু অপেক্ষা করো।

ছাত্র পরিষদের এক নেতৃত্বস্থানীয় কর্মী কিছুক্ষণ ‘দেশপ্রেমিক’ বক্তৃতা দিলেন। তারপর আমার বক্তব্য রাখার ডাক পড়ল। আমি বক্তৃতা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই ছেলেরা শ্লোগান দিতে শুরু করল – “ভারত মাতা কী জয়! চিনের দালাল ধ্বংস হোক! চিনের দালালদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দাও” – ইত্যাদি। আমি মাইক্রোফোনের সামনে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে ওদের পরিশ্রান্ত হতে দিলাম। ভেবে নিলাম, শুধুটা কেমন করে করব।

ওই সময়ে পার্লামেন্টে ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের একটা কথা নিয়ে ভারতীয় ‘দেশপ্রেমিক’রা খুব হৈচৈ বাঁধিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন – চিনা সৈন্যবাহিনী ভারত সীমান্তে যে অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়েছে, যে অঞ্চল বরফে ভরা, দুর্গম। সে অঞ্চলে ঘাস পর্যন্ত জন্মায় না। দেশপ্রেমিকরা এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল – ভারতীয় কমিউনিস্টরা মনে করে ওই অঞ্চল দখল করে চিনারা ভারতের কি এমন ক্ষতি করেছে! সুতরাং তারা ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের সমালোচনায় মুখর হলেন। তাঁকে চিনাপন্থী নামে অভিহিত করলেন। যদিও ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত ছিলেন রুশপন্থী, এবং আমৃত্যু তিনি সেই অবস্থান বজায় রেখে গিয়েছিলেন।

আমি বক্তব্য শুরু করলাম এই বলে, “অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি জানাচ্ছি, এই সভার প্রধান বক্তার বক্তব্যের সাথে আমি একমত নই”। বলেই এক মিনিট থামলাম। ছাত্র পরিষদের ছেলেরা ‘চিনের দালাল’-এর বিরোধিতায় সোচ্চার হল। উপস্থিত শিক্ষকেরা এ ওঁর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। প্রিন্সিপাল মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন – “ওর কাছ থিক্যা মাইক সরাওয়া লও”। ছাত্র পরিষদের একজন সে দায়িত্ব পালন করতে আসছে দেখে আমি বক্তব্য আবার শুরু করলাম। বললাম, “আমাদের দেশের ছাত্র সমাজ, যুবসমাজ বেতনের বিনিময়ে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দেয় না। সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য তা করে না। কে কত টাকা পাচ্ছে, সে হিসাব করে তারা দেশের জন্য লড়তে নামে না। সুতরাং মাননীয় প্রধান বক্তা অধিক আয়ের প্রত্যাশায় ছাত্রসমাজকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য যে উৎসাহ জোগাতে চাইলেন, তা ছাত্রদের অপমান করারই সামিল। ভারতের ছাত্র ও যুব সমাজ দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত, উচ্চ বেতনের প্রত্যাশায় তারা লড়তে যায় না। তাই আমি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করি”।

(চলবে)

Developed by DXDasia