সোমনাথবাবু জানতেন পার্টি থেকে কিছু নিতে নেই, দিয়েই যেতে হয়

ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিশেষ প্রজন্মের প্রায় প্রস্থান সূচিত করলেন সোমনাথবাবু

লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হবার পরে অনেকগুলি প্রশ্ন আমাদের সামনে চলে এসেছে। তাঁর মরদেহের সামনে বামপন্থী নেতারা উপস্থিত থাকবেন এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেই তালিকায় যোগ দিয়েছেন লোকসভার বর্তমান অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত অনেকেই। তাতে একথা অন্তত প্রমাণিত হয়, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থাকলেও অন্যদের মধ্যেও তাঁর বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সোমনাথবাবুর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটি হল, ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিশেষ প্রজন্মের প্রায় প্রস্থান তিনি হয়ত সূচিত করলেন। জন্মসূত্রে যেখানে বিপুল বৈভবের পরিমণ্ডলে লালিত হয়েও যুগের হাওয়াকে স্বীকার করে কমিউনিস্ট পার্টির জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন, সেই তালিকায় তিনি যেমন আছেন, তেমনি ছিলেন স্নেহাংশু আচার্য, জ্যোতি বসু, ইন্দ্রজিত গুপ্ত, রেণু চক্রবর্তী, সাধন গুপ্ত প্রমুখেরা। এঁদের সকলের মধ্যেই দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রতীয়মান ছিল। আদর্শগত ভাবে যারা সর্বহারা দলে যোগ দিয়েছেন। নিজেদের যথাযোগ্য ভাবে তৈরি করেছেন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে। সেই পেশাগত যোগ্যতাকে উজার করে দিয়েছেন দলের কাজে। দলীয় শৃঙ্খলাকেও শিরোধার্য করেছেন।

সেই সঙ্গে কোনোদিনই আখের গোছানোর জন্য রাজনৈতিক সুবিধাবাদের পথ অনুসরণ করেননি। এটাই যদি হয় তাঁদের প্রথম বৈশিষ্ট্য, তবে দ্বিতীয়টি অবশ্যই তার বিপরীত। তাঁরা কেউই বৈভবপ্লাবিত পারিবারিক বৃত্তকে পরিত্যাগ করে সর্বসাধারণের ঘোলা গঙ্গাস্রোতে মিশে যাননি। তাঁরা যখন একটি সাম্যবাদী দলের অনুসরণ হচ্ছেন, তখন শুধুমাত্র সেটুকু হবার জন্যেও তাঁদের অনেক ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সেই ঝুঁকি অনেকেই নিয়েছেন, কিন্তু তাঁরা বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের কমিউনিস্ট নেতারা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সর্বস্ব পার্টিকে দান করে তারপরে দলে যোগ দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় অবশ্যই উঠে আসবে দক্ষিণ ভারতের ইনস নাম্বুদিরিবাদ এবং রাজেশ্বর রাওয়ের মানুষদের নাম, যাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত যাবতীয় সম্পত্তি দলকে দান করে দিয়েছিলেন। পারিবারিকমণ্ডলে অবস্থানের জন্য সোমনাথবাবুদের মতো অনেকের মধ্যেই কোনো অপরাধবোধ কাজ করেছে কিনা বা আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোনো নিকট সাফল্য দিগন্তে আভাসিত না হলেও তাঁরা একটি অতিদূর স্বপ্নের তাগিদেই আরেকটি গুণ অর্জন করেছিলেন। তা হল নানাবিধ সেবামূলক কাজে নিজেদের যুক্ত করা। তার জন্য সাধ্যমতো নিজেদের সম্পত্তি ও রোজগার ব্যয় করা। হয়ত সেই তালিকায় স্নেহাংশু আচার্যের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে। কিন্তু বাকিরাও তাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় অবশ্যই তর্কাতীত নন। জনসমক্ষে মিডিয়ার দৌলতে তাঁকে জ্যোতি বসুর ভাবশিষ্য বলেই ধরে নেওয়া হয়। সেই কথাটা সর্বাংশে সত্য না হলেও অনেকটাই সঠিক। আইনি পেশায় বা সংশোধীয় জীবনে তিনি সর্বত ভদ্র আচরণের জন্য নিশ্চিত সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পেরেছেন। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা প্রকাশে কোনো ঘাটতি ছিল না। আজ এই বিদায়বেলায় একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, তিনি সর্বসম্মোতিক্রমে লোকসভার অধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত হয়েছিলেন। সেই পদের মর্যাদা তিনি অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তেমন কথা মেনে নিতে বাজপেয়ী- সোনিয়া- ঠাকরে- মমতা কারোরই কোনোদিন আপত্তি হয়নি।

একেবারে শেষবেলায় সোমনাথবাবু যে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন, তার জন্য অর্ধেক দায়ী তাঁর দল এবং অর্ধেক তিনি নিজে। পরমাণুচুক্তির প্রশ্নে সিপিআইএম প্রথম ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। দলের যেসব তাত্ত্বিক পণ্ডিতরা এমন সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, তাঁরা কেউই মাদুর পেতে পলিটব্যুরোর বৈঠক করার মানুষ নন। কেন্দ্রীয় কমিটির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে মার্ক্সবাদের ফলিত প্রয়োগ নিয়ে মনোমুগ্ধকর ভাষণে তাঁরা যথেষ্ট পটু। ভারতীয় জনগণের নাড়ি টেপার ক্ষমতা তাঁদের নেই।

তাঁরা সোমনাথবাবুকে অধ্যক্ষের পদ ছাড়তে বলেন। সেই সিদ্ধান্ত অপ্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু সোমনাথবাবুর মতো মানুষের পক্ষে অনেকবেশি শোভন হত যদি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তিনি দলকে শোধরানোর চেষ্টা করতেন। যেহেতু তিনি জ্যোতিবাবুর ভাবশিষ্য বলে পরিচিত, তাই তেমনটাই তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিল। কারণ লোকসভার অধ্যক্ষের চেয়ে অনেকবেশি লোভনীয় পদ দেশের প্রধানমন্ত্রীত্ব জ্যোতিবাবু গ্রহণ করেননি একমাত্র দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার কারণে। একজন মানুষকে তাঁর মিত্রদল ছাড়া সকলেই প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করতে বলছেন এমন নজির পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে জানা নেই।

সোমনাথবাবু আরও অনেকের মতোই জানতেন পার্টি থেকে কিছু নিতে নেই, দিয়েই যেতে হয়। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে পারিতোষিক বিতরণে সম্ভবত তাঁরও তেমন অরুচি ছিল না। কিন্তু পাশাপাশি একথাও স্বীকার করতে হবে যে, দল তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেও তিনি নিজস্ব ওজন বাজি রেখে বিপরীত শিবিরে যোগ দিতে যাননি। হয়ত সেটাই সোমনাথবাবুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

Developed by DXDasia