বছরে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে ১০,০০০ শিশু

ভারতবর্ষে প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে এক লক্ষ শিশু নিখোঁজ হয়। কেবল পশ্চিমবঙ্গ থেকেই নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার

পশ্চিমবঙ্গে  শিশু চুরি, শিশু পাচার ও শিশু নিখোঁজ কে কেন্দ্র করে বেশ কিছু দিন হই- চই হয়ে গেল। এখন অবশ্য আলোচনা অন্য দিকে ঘুরে গেছে, অন্য খবরের চাপে। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, বেশ কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ    শিশু পাচার ও শিশু নিখোঁজ এর ঘটনায় দেশের শীর্ষে। ভারতবর্ষে প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক লক্ষ শিশু নিখোঁজ হয়ে যায়। এর মধ্যে কেবল পশ্চিমবঙ্গ থেকেই নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। লক্ষণীয়, প্রতি দশ জন নিখোঁজ শিশুর মধ্যে সাতজন কন্যা শিশু। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে  বৃহত্তম সমাজে কন্যা শিশুদের চাহিদা। যদিও শিশু পাচার ও শিশু নিখোঁজ এর মধ্যে  সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য আছে, কিন্তু, দু’টি ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গে  শিশু মানসিক ও শারীরিক হিংসার শিকার হয়। শিশু নিখোঁজ বলতে বোঝায় মা-বাবা সহ অভিভাবকের কাছে শিশু কোথায় আছে ও কেমন আছে এ সম্পর্কে কোন তথ্য না থাকলে তাকে নিখোঁজ শিশু হিসাবে গণ্য করা হবে। এবং শিশু অধিকার আইন অনুসারে এই শিশুকে খুঁজে বের করা, এর সুরক্ষা ও বাড়ি পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে শিশু ইচ্ছায় বা বাধ্য হয় বাড়ি ছাড়তে। এই ধরনের বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম দারিদ্র্যের কারণেই, বিশেষ করে একবেলার খাবারের সন্ধান করতেই বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়। ইদানিং কালে বড় সড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু শিশু নিখোঁজও হয়ে যায়। অনেকেই পরিবারের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এড়াতে বাড়ির মায়া কাটিয়ে অনিশ্চিত ও ঝুঁকি পূর্ণ জীবনের দিকে পা বাড়ায়।  মালদহ স্টেশনে এই রকমই এক জনের সঙ্গে আলাপ হয়।  কেন নিজের ইচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছিল জানতে চাইলে ১৬ বছরের রাজার উত্তরে চমকে উঠেছিলাম। “অন্য ভাই-বোনেদের থেকে আমার গায়ের রং বেশি কালো হওয়ার জন্য আমার বাবা মনে করত আমার মায়ের অন্য কোন সম্পর্কের ফলে আমার জন্ম। এই অজুহাতে বাবা মা-র ওপর প্রায়ই অত্যাচার করত। যে দিন থেকে এ কথা বুঝতে পারলাম সেই দিনই বাড়ি ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে ফেলি। এখন মালদহ স্টেশনে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে নিজের খাবার ব্যবস্থা করতে পারি। রাজা একা নয়,মালদহ স্টেশনে তার বয়সী আরও ১৮-২০  জন শিশুর দেখা মেলে। এই সব  শিশুদের উপর শারীরিক ও যৌন অত্যাচারে ঘটনা আকছার ঘটে, তবে এটা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।

শিশু পাচারের সূচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু নিখোঁজের ঘটনার মধ্য দিয়েই হয়। পাচারকারীরা প্রথমে দারিদ্র ও শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত পরিবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। চাকরী অথবা বিয়ের লোভ দেখিয়ে ভিন্ন রাজ্যে বিক্রি করে দেয়। আগেই বলেছি নিখোঁজ শিশুদের একটা বড় অংশ কন্যা শিশু। পাচারকারীর ছলনায় শিশুদের অবিভাবকরা বিশ্বাস করে তাদের হাতে নিজদের শিশুদের  তুলে দেয়, ভাল দিনের আশায়। এই বিশ্বাস অটুট রাখতে অভিভাবকদের  মাস খানেক  টাকাও পাঠান হয়। আস্তে আস্তে তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিভাবক থানায় নিখোঁজ– এর অভিযোগ করতে গিয়ে জানাতে পারে তাদের শিশু পাচার চক্রের হাতে পড়েছে। এই শিশুদের প্রথম গন্তব্য স্থল হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বড় শহরের লালবাতি এলাকাগুলি।  পুরুষের যৌন লিপ্সা চরিতার্থ করারা জন্য আজও অল্পবয়সী মেয়েদের খুব চাহিদা।

শিশু পাচার নিয়ে আমাদের নীরবতা পাচার কারীদের সাহস যোগায়। অর্ধ-দশক পার হয়ে গেছে আমাদের দেশে শিক্ষার অধিকার আইন চালু হয়েছে, এখনো সব শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া যায়নি। শিক্ষার অধিকার কেবল মাত্র ৬-১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য, পাচার ক্ষেত্রে আমারে দেখতে পাচ্ছি ১৪ বছরের পর স্কুলে ঝড়ে পড়ার হার বেশি, এর ফলে মেয়েরা ঝুঁকি –পূর্ণ হয়ে পড়ছে। তবে মেয়েদের শিশু বিবাহ রুখতে ও শিক্ষা চালিয়ে যেতে পশ্চিমবঙ্গে কন্যাশ্রী চালু হয়েছে। অচিরে এই প্রকল্পের ফলও পাওয়া যাবে। এছাড়া ভারত সরকার ট্রাক দ্যা চাইল্ড ও খোয়া পাওয়া নামদের দু’টি ওয়েব সাইট চালু করেছে। এর মাধ্যমেও  পাচার ও নিখোঁজ শিশুদের বাড়ী ফিরে দেওয়া সম্ভব হবে। শিশু পাচারের এই সামাজিক ব্যাধির নিরাময় হবে না যদি আমরা এ বিষয়ে সরব হই।

Developed by DXDasia