আমাদের থিয়েটারের Matriarch হয়ে শোভাদি বেঁচে থাকুন

নাট্য সমাজ বা পি এল টি-এর পর্বে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় তো আমাদের মুগ্ধ করেছে

মার্চ মাসের (’০৩) শেষে বিশ্বনাট্য দিবস। বাংলা আকাদেমিতে সেই উপলক্ষ্যে আমার একটা বক্তৃতা ছিল- বিধায়ক ভট্টাচার্য স্মারক বক্তৃতা। আমি একটু আগেই পৌঁছে ছিলাম। আকাদেমি সচিব সনৎ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে আড্ডা দিতে। হঠাৎই দেখা শোভাদির সঙ্গে। পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে লাঠি নিয়ে টুক টুক করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। পাশে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু এরকম পোশাকে শোভাদি এখানে কী করছেন – আমি আর সনৎবাবু দু’জনেই বিস্মিত। শোভাদির পরনে কালো থ্রি কোয়ার্টার পাজামা, আর কালো জামা। জানা গেল, রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে সেদিন বিশ্ব নাট্যদিবস উপলক্ষ্যে যে অনুষ্ঠানগুলি হচ্ছিল তারই একটাতে অভিনয় করবেন শোভাদি। এবার বিস্ময়ের সঙ্গে শ্রদ্ধা এসে যোগ দিল।

পা নিয়ে অনেকদিনই ভুগছেন শোভাদি। নেতা, কমরেড, জীবনসঙ্গী, প্রেরণা ছিলেন যিনি সেই উৎপল দত্ত আর সঙ্গে নেই। কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া কাছে থাকে না। কিন্তু শোভাদি হাসিমুখে সব বাধা – বিপত্তি-প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে আজ ও একটি নাট্য দলের দায়িত্ব, উৎপল দত্ত ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ও সংগঠন, উৎপল দত্তের বিশাল রচনাবলীর প্রকাশনা, ‘এপিক থিয়েটার’-এর নিয়মিত প্রকাশ, তার সঙ্গে পি এল টির নাটকে নিয়মিত অভিনয় – সমস্ত কিছুই তো চালিয়ে যাচ্ছেন । তাছাড়াও নানা সভাসমিতি, মিটিং – মিছিল। সেই কবে থেকেই তো শোভা দিকে দেখছি-প্রথমে দূর থেকে, তারপর একটু কাছ থেকে। গণনাট্য সংঘের স্বর্ণযুগে, বাংলা চলচ্চিত্রে স্বর্ণযুগে, নাট্য আন্দোলনের স্বর্ণযুগে।

গণনাট্য কিংবা নব নাট্যের মাইল ফলক ‘নবান্ন’-এর অভিনেতৃ মণ্ডলীর মধ্যে যিনি এখনও বেঁচে আছেন * – শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়, বিশ্বাস, আর্দশ এবং জীবনীশক্তি নিয়ে- তিনি তো শোভা সেনই। ‘নবান্ন’-এর অভিনয় দেখার সুযোগ হয় নি। কিন্তু পরবর্তী কালে এল টি জি, বিবেক নাট্য সমাজ বা পি এল টি-এর পর্বে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় তো আমাদের মুগ্ধ করেছে, উদ্দীপিত করেছে। কেউ যদি পুরনো বাংলা ছবি ফিরে দেখার আগ্রহী হন, তাহলে, তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ করবেন, শোভাদির অভিনয়ে বরাবরই এক সহজ স্বাভাবিক চলচ্চিত্র – ধর্মীয়তার স্বাদ পাওয়া যায়। প্রথম নিও-রিয়ালিস্ট বাংলা ছবি যাকে বলা হয় সেই ‘ছিন্নমূল’-এ ঋত্বিক ঘটক বা বিজন ভট্টাচার্যের নাটুকে অভিনয়ের পাশে শোভাদির উজ্জল উপস্থিতি আধুনিক চলচিত্রাভিনয়ের দৃষ্টান্ত। অনতিকাল পরে নির্মিত ‘নাগরিক’-এও তাই। কিংবা কমার্শিয়াল ছবি বাবলা। যেখানে চলচ্চিত্রের অভিনয় রীতি আয়ত্ত বা রপ্ত করতে অনেক বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীর অনেক সময় লেগে যায় সেখানে শোভাদি অনায়াসে তাঁর সহজাত ক্ষমতার বলে ঠিক মাত্রাটি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তারপর তাঁর শিল্পী জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায়, নিরন্তর নিরলস চর্চায়, অনুশীলনে, অধ্যয়নে, শীর্ষ মাত্রা স্পর্শ করেছেন। তবু মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্র যতটা সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল তাঁর অভিনয়ে, ততটা সুযোগ বা চ্যালেঞ্জ সে রাখতে পারেনি শিল্পীর সামনে। আমাদের দেশে এমনটাই ঘটে, বহুক্ষেত্রে।

অনেকেই হয় তো জানেন না, শোভাদি আকাশবাণীর এক জন নিয়মিত অভিনয় শিল্পী, (স্টাফ – আর্টিস্ট) ছিলেন। বেতারে শুক্রবারের নাটকে তাঁর কন্ঠ শোনা যেত প্রায়ই। আর ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাঁর মুখে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতে শুনেছি বাণীকুমার বা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম।

সময়ানুবর্তিতা, শৃ্ঙ্খলাপরায়ণতা ও নিষ্ঠার প্রতিমূর্তি শোভা সেন। লজ্জা দিতে পারেন যে কোনও অনুজ সহকর্মীকে। সভাসমিতি বা মহলায় সঠিক সময়ে লাঠি হাতে ঠক ঠক করে এখনও যিনি হাজির হন তাঁর নাম শোভা সেন। শুনছি আবার নাকি পায়ের অপারেশন হবে। হাসতে হাসতেই বললেন- ‘সুস্থ হয়ে ফিরে এলে আবারও মঞ্চে দেখতে পাবি।’ সত্যি যেন তাই হয়। আমাদের থিয়েটারে Matriarch হয়ে শোভাদি আরও দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকুন।

*(কুঞ্জর ছেলে মাখনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মণিকা ভট্টাচার্য (বর্তমানে চক্রবর্তী) – বিজন ভট্টার্চাযের বোন, জগদীশ চক্রবর্তীর স্ত্রী, খ্যাতনামা অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তীর মা।)

চিত্রগ্রাহক – নিলাঞ্জন রায় (কেবলমাত্র বঙ্গদর্শনের জন্য)

Developed by DXDasia