শিলং ও রবীন্দ্রনাথ

‘গর্মি যখন টুটলো না আর পাখার হাওয়া সরবতে ঠান্ডা হতে দৌড়ে এলুম শিলং নামক পর্বতে।’

‘গর্মি যখন টুটলো না আর পাখার হাওয়া সরবতে ঠান্ডা হতে দৌড়ে এলুম শিলং নামক পর্বতে।’

                – শিলংয়ের চিঠি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 নভেম্বর বড় নিদারুণ মাস। বিপর্যয়ের কারণে নয়, বিশাল অর্জনের কারণে। রুশ বিপ্লব তো বটেই, সারা বিশ্বের চেতনা-জগতেও আর এক বিপ্লব ঘটেছিল এই নভেম্বরেই। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলীর ইংরেজি অনুবাদ সং অফারিংস (Song Offerings) এর প্রথম প্রকাশ এই মাসেই, ১৯১২ সালে। তারপরের টুকু সকলেরই জানা -এই প্রথম একজন নন- ইউরোপিয়ানের নোবেল লাভ।

এই নভেম্বরে শিলং পাহাড়ে এসে আবিষ্কার করলাম কবির সঙ্গে এই শৈলশহরের অচ্ছেদ্য বন্ধন। আন্তরিক তোলপাড়ের মধ্য দিয়ে বেদনা,আনন্দ এবং উপলব্ধি নতুনভাবে এল। অনেক অজানা নতুন তথ্য যখন চেতনার চারপাশে গজানো আগাছার গোড়াশুদ্ধ উপড়ে দিলো, তখন অনুভূতিগুলো হয়ে উঠলো বড়ই নবীন আর টাটকা, যেন উমিয়াম লেকের সবুজ পরিপার্শ্ব।

শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, নেতাজী এবং স্বামী বিবেকানন্দও শিলংয়ের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কবির মতো বার বার ফিরে আসেননি তাঁরা। যখনই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে চিত্তবৈকল্য ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ ছুটে এসেছেন এই পাহাড়ে। রচনা করেছেন তার অতি বিখ্যাত উপন্যাস বা নাটক। পাইন, দেবদারুর সুরভিত অরণ্যে তাঁর সৃষ্টিশীলতা যেন উপচে পড়তো উথলানো দুধের কড়াইয়ের মতো। 

১৯১৯ সালের বিক্ষুব্ধ ভারতে প্রতিবাদের মুখ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাওলাট এক্ট, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড-সমস্ত অনাচারের বিরুদ্ধতা করেছেন তিনি। মানুষের মুখ থেকে প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেবার অপচেষ্টা তাকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছিল। চারশ নিরস্ত্র, নিরপরাধ ভারতবাসীর হত্যার প্রতিবাদে তিনি ঐ বছরের ১৩ই এপ্রিল ভাইসরয়কে চিঠি দিয়ে নাইটহুড ত্যাগ করেন। তারপর মানসিক শান্তির খোঁজে আশ্রয় নেন শিলং পর্বতে।

কবির ঠিকানা ছিল রিবংয়ের ব্রুকসাইড বাংলো। টানা দুমাস ছিলেন তিনি ওই বাড়িতে। রচনা করেছিলেন অন্যধারার উপন্যাস শেষের কবিতা। সামনে সর্পিল রাস্তা, দুধারে পাইন, ইউক্যালিপটাস আর দেবদারু। দূর থেকেই দেখা যায় বিরাট স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। পেছনে গাড়িবারান্দায় ঘেরা থামওয়ালা বাড়ি, মাথায় ঢালু ছাদ, এদেশে যাকে বলে অসম টাইপ বাড়ি। বাড়িটি এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সংগ্রহশালা, যদিও খানকতক ছবি, আসবাব ইত্যাদি ছাড়া তেমন কিছু নেই। তবুও মনে হয়, পর্দার ফাঁকে উঁকি দিলেই দেখবো সোফায় লম্বা হয়ে আছেন বাবার সঙ্গে শিলংয়ে আসা রথীন্দ্রনাথ, ফায়ার প্লেসের ধারে কি যেন করছেন প্রতিমা দেবী ; আর কবি ব্যস্ত তাঁর জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে স্মৃতিচারণায়। 

এই বাড়িতে বসে তিনি সৃষ্টি করেছেন শেষের কবিতার যোগমায়ার মমতা, লাবণ্যের ব্যক্তিত্ব আর অমিতের দোলাচলতা। কল্পনা আপনা হতেই আসে, ওই যে চড়াই বেয়ে উঠে আসা যুবক, 'দাড়িগোঁফ-কামানো, চাঁচা মাজা চিকণ শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ,… চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না' ওইই কি অমিত রয় ! যে কিনা 'সোনার রঙের দিগন্তরেখা, ধরা দিয়েই আছে, তবু ধরা দেবে না '।

তাই বড় খারাপ লাগে যখন দেখি বাংলোর হাতায় গজিয়ে উঠেছে বাস ডিপো, অযত্নে ভেঙে যাচ্ছে পেছনের সিঁড়ি, ডাঁই করা রয়েছে লোহার আসবাব ভাঙা ট্যাংকের নীচে।

১৯২০-২১ সালে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘসময় ছিলেন ইউরোপ আমেরিকায়। পাশ্চাত্য জীবন মননের যান্ত্রিকতা আর পুঁজিবাদের লোভ তাঁকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল। মানসিকভাবে ধ্বস্ত কবি আবার এলেন শিলংয়ে। সাল ১৯২৩। এবার তাঁর ঠিকানা রিবংয়ের "জিতভূমি"। বাড়িটির মালিক ছিলেন আর এক ঠাকুরবংশজা মণীষা দেবী। এবার এলো নতুন নাটক, রক্তকরবী। ধনতন্ত্র আর ঢের জমা করবার অসহ্য প্রবণতা ধরা পড়ল নন্দিনী আর রাজার মধ্যেকার টানাপোড়নে। শিলংয়ের বিশুদ্ধ বাতাস আর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের মানসিকতার অনুকূল ছিল বলেই বিশ্বাস।

এই বাড়িদুটোর দ্বিতীয়টি স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ব্রুকসাইড বাংলোর ভবিতব্যও তাইই হতো, যদি না রুখে দাঁড়াতেন কলকাতায় বড় হয়ে শিলংয়ে ঘর করতে যাওয়া এক বিদূষী – মালবিকা বিশারদ। ব্রুকসাইড বাংলোর জমিতে অনধিকার প্রবেশ মেঘালয় বিধানসভার, তবু বাড়িটি যে টিঁকে আছে সে কৃতিত্ব এঁর। বাড়িটি যখন শেওলা আর ফাঙ্গাসে আক্রান্ত, খুলে পড়ছে কড়িবরগা, একা লড়াই করেছেন মালবিকা, চিঠি লিখেছেন বিশ্বভারতী থেকে কেন্দ্রের সরকার বাহাদুরকে। বই লিখেছেন এই আবাসগুলির ওপর, রক্ষণাবেক্ষণের ফান্ড যোগাড়ে ছুটেছেন। শেষ অব্দি ২০১০ সালে ব্রুকসাইড বাংলোর সংস্কার শুরু হয়। 

তবু শেষ রক্ষা হলো কই !  এই বাড়িদুটিতে রক্ষিত কবির ব্যবহার করা জিনিসের কোন হদিশ নেই। সুরক্ষার কারণে সরকারি কোষাগারে তারা ঠাঁই পেয়েছে এইরকম জনশ্রুতি সত্ত্বেও সে হিসেব সরকারিভাবে মেলেনি কোনদিন। তার থেকেও মারাত্মক, যখন সারা দেশে মহাসমারোহে চলছে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মোৎসব, তখন তাঁর শেষবার বাস করা বাড়িটি ভেঙে ফেলা হলো নিঃশব্দে।

১৯২৩ সালে আপল্যান্ড রোডের সিধলি হাউসে অনেকদিন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এখানেই রচিত হয় বিখ্যাত উপন্যাস যোগাযোগ আর সুসময়, দেবদারুর মতো কবিতা। এই বাড়িটি ছিল এক ইটালিয়ান দম্পতির, কবি তাদেরই অতিথি ছিলেন। পরে অসমের গোয়ালপাড়া জেলার সিধলি রাজবংশের রাণী মঞ্জুলা দেবী বাড়িটি কিনে নেন, রবীন্দ্রস্মৃতি রক্ষায় ওখানে গড়ে তোলেন সঙ্গীত, নৃত্য, শিল্পচর্চা কেন্দ্র। এই রাণী ছিলেন লেডী রাণু মুখার্জির মতো রবীন্দ্রাহত। অতি ছোটবেলায় দেখেছিলেন দেবদুর্লভ কান্তি, আর সারা জীবন ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা সিধলি হাউস বেচে দেয় অনেক টাকায়। যৌথ মালিকানায় ওখানে মাথা তোলে কংক্রিটসার প্রাসাদ, পরিবেশ প্রকৃতির সঙ্গে, কবির স্মৃতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

রসিক মুখ্যমন্ত্রী মেঘালয়ের মুকুল সাঙমা। দেশ জুড়ে শোরগোল, সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলে বসলেন, শিলংয়ে রবীন্দ্রনাথ বাস করেছেন এইরকম কোন বাড়ি আমার জানার মধ্যে নেই ! খালি সান্ত্বনা দিয়েছেন সিধলি হাউসের বর্তমান মালিকেরা। ওখানে একটি নতুন দেওয়ালে লাগানো হয়েছে পুরোনো ফলক, যাতে লেখা আছে, "Here lived Rabindranath Tagore in april, May and June, 1923," রবীন্দ্রনাথ এখানে ১৯২৩এর মে এবং জুন মাস কাটিয়েছিলেন। যথাযথ তর্পণই বটে !

এই নভেম্বরে তাই অযথা টুরিস্ট-ভিড় বাড়াইনি পুলিশ বাজারে। ব্রুকসাইডের বারান্দায় বসে থেকেছি আমি আর প্রকৃতি। কারণটা রবীন্দ্রনাথই বলে গেছেন শেষের কবিতায় –'শিলং পাহাড়টা চারদিক থেকে অমিতকে নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য ওঠবার আগেই। জানলা দিয়ে দেখলে দেবদারু গাছের ঝালরগুলো যেন কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা মেঘের উপর পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা লম্বা টান লাগিয়েছে -আগুনজ্বলা যে সব রঙের আভা ফুটে উঠেছে তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই! '

Developed by DXDasia