শহিদ-জননী জাহানারা ইমাম

অস্পষ্ট অন্ধকারের জঠর থেকে জন্ম নেওয়া আলোর রেখা

নারী তো কখনো কন্যা , কখনো প্রেমিকা, তারপর জায়া ও জননী। আমি এখন এক জননীর দিনলিপিতে মগ্ন হয়ে আছি।বিবশ।বিস্ময়ে আর ব্যথায়। এ এক এমন বিষয়, যা আমাদের কাছে নতুন নয়। আমাদের দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ, নকশালবাড়ি .. অনেক কিছু লেখা হয়ে গেছে। সংগ্রামের কথা, অত্যাচারের কথা, নির্বিচারে হত্যা …সব কিছু। কিছু লিখেছেন প্রত্যক্ষ সংগ্রামী যাঁরা, কিছু বা উঠে এসেছে গবেষকদের কলমে। কিন্তু কোনো জননীর প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণার যুদ্ধের রোজনামচা আমি অন্তত পড়িনি। তাই এই লেখা, এই ভাগ করে নেওয়া। সকলের সঙ্গে। তাই এই "অন্ধকারের আলো"। 

অন্ধকারের আলো

একটি রোজনামচা। একাত্তরের দিনগুলি। জাহানারা ইমাম। শহীদ জননী।
এক বাংলাদেশী বন্ধু আমার হাতে এই বইটি তুলে দিয়ে বলেছিলেন , "বাংলাদেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে এই বইটি আলো ছড়ায়।"

জাহানারা ইমাম। আয়ুষ্কাল ৩.৫.১৯২৯ – ২৬. ৬ .১৯৯৪। মানুষ সত্যিসত্যি কতদিন বাঁচে ? যতদিন সে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয় না কি যতদিন সে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটা নিজে নিজের কাছে প্রমাণ করতে পারে ? জাহানারা পেরেছিলেন। ৬৫ বছর ধরে প্রতিদিন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। অস্পষ্ট অন্ধকারের জঠর থেকে জন্ম নেওয়া আলোর রেখা। গোঁড়ামির আবিল আবর্ত থেকে উঠে আসা প্রতিবাদের আগুন। জাহানারার প্রতিদিনের চিন্তায়, প্রতিদিনের ডায়েরির পাতায়। ১লা মার্চ থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাকে চিনিয়ে দিচ্ছে জানিয়ে দিচ্ছে ঠিক কেমন ছিল সেদিনের বাংলাদেশ।

১লা মার্চ থেকে এই রোজনামচার শুরু। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রুমী বলেছিল, " ঘটনার একটা নিজস্ব গতি আছে। জলপ্রপাতের মতো। উঁচু পাহাড় থেকে যখন গড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে রুখতে পারে এমন কোনো শক্তি নেই। আমাদের দেশের জনতা এখন ওই জলপ্রপাতের মতো একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে অত্যন্ত তীব্রবেগে ছুটে যাচ্ছে। একে আর বোধ হয় রক্ষা যাবে না।"

যায়ওনি। জনতা একের পর এক কারফিউ লঙ্ঘন করছে, মিটিং মিছিল, আকাশ ফাটানো স্লোগান, এবং গুলি খেয়ে কালো পিচের রাস্তা রং বদল করে রাঙা। তাই রুমী বাইরে গেলেই "আমার প্রাণটা যেন হাতে কাঁপতে থাকে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে একটা গুলির ব্যবধান মাত্র, কখন আচমকা কোনদিক থেকে তীক্ষ্ণ শিস ছুটে আসে কে বলতে পারে!"

শেখ মুজিবর রহমানের সেই নির্বাচনী পোস্টার খুঁজে পেলে বোঝা যেত, প্রমাণ করে দেওয়া যেত চাল, আটা, নুন, কাগজ, সোনা থেকে শুরু করে সব খাতে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শুষে ছিবড়ে করে দিয়েছিল। সেই ইস্তাহার ছিল "সোনার বাংলা শ্মশান কেন"। তাতে পাই পয়সা ধরে লেখা ছিল বৈষম্য আর শোষণের সমস্ত তথ্য।

জাহানারার মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দ্বন্দ্ব। ছেলে কি শুধু মায়ের? দেশের নয়? "আমি কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সারা দেশ স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল। শান্তিপ্রিয় বাঙালিরা আজ মরীয়া হয়ে লাঠি, সড়কি যা পাচ্ছে, তাই হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে গুলির সামনে। ঘরে ঘরে নিজের হাতে বোমা, পটকা, মলোটভ ককটেল বানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রতিপক্ষের ওপর। এই রকম সময়ে আমার ছেলেকে আমি কি চাইব ঘরে আটকে রাখতে? আমি কি চাইব সে শুধু বন্ধুবান্ধব নিয়ে জাঁকিয়ে বসে স্বাধীনতার দাবিদাওয়ার প্রশ্নে তর্কবিতর্ক, চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে মত্ত থাকুক?"

এর পাশাপাশি অজিত নিয়োগী। জ্যোতিষশাস্ত্রজ্ঞ। তাঁকে জিজ্ঞাসাও তো করতে হয়, "আমার কপালে পুত্রশোক আছে কিনা তাই বলুন। ওটা থাকলে লখিন্দরের লোহার ঘর বানিয়েও লাভ নেই।"

"এক একটি বাংলা অক্ষর এক একটি বাঙালির জীবন।"
"একতারা তুই দেশের কথা বল রে আমায় বল .."

এই সব কথা, এই সব গান নিরীহ মানুষের বুঝে ঝড় তুলে দেয়। রক্ত ছলকে ওঠে বুকে। সুকান্তর কবিতার ওপর অনুষ্ঠান হয়। ছাড়পত্র। দেশলাই। অসংখ্য দেশলাই কাঠি একটার পর একটা জ্বলে ওঠে। একটা থেকে আর একটা, তার থেকে আর একটা। গুনতে গিয়ে গুলিয়ে যায়। চোখে শুধু মশাল জ্বলে।

এপ্রিল মাস। "ইসলামের নামে ওরা যা করছে, তাতে খোদার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠছে। খোদার ঘর মসজিদে ঢুকে কোরান তেলওয়াতরত মানুষ খুন! মায়ের সামনে ছোট বাচ্চাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। বয়:প্রাপ্ত ছেলের সামনে মাকে বেইজ্জত করেছে।"

মে মাস। "কাছেই বোমা পড়েছে, বিকট শব্দ, লোকজনের চিৎকার শুনেছি, আগুন দেখেছি। আর তখুনি একবস্ত্রে পালিয়েছি পাশের এক গ্রামে। কিন্তু সেখানে এক রাত থাকার পরই শুনলাম মিলিটারি আসছে। যাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম, তারাশুদ্ধু পালালাম। দু'দিন পর ফিরে এসে দেখি — পুরো গ্রাম আগুনে পুড়ে ছাই।"

সব ছবি সাদা-কালো। তাতে এলোমেলো রক্তের ছিটে।

রুমী চলে গেল। ৬ই মে। মুক্তিযুদ্ধে। দুটো বই ছিল সঙ্গে। সুকান্ত সমগ্র আর জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা। আর জাহানারা ?

"একটা লোহার সাঁড়াশি যেন পাঁজরের দুই পাশ চেপে ধরে আছে। মাঝেমাঝে নি:শ্বাস আটকে আসে। মাঝেমাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। মাঝেমাঝে সব কাজ ফেলে ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মাছের মাকে নাকি শোক করতে নেই। চোরের মাকে নাকি ডাগর গলায় কথা বলতে হয়।”

৩রা মে। টাইম ম্যাগাজিন। ড্যান কগিনের প্রবন্ধের শিরোনাম : "ঢাকা, সিটি অফ দ্য ডেড।"

যুদ্ধ জারি থাকুক। পূর্ণমাত্রায়। দাউদকান্দিতে নদী পেরিয়ে নগরদা বলে একটা জায়গা। ক্যাম্প সেখানে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের এক অধ্যাপকের নেতৃত্বে। প্রতিদিন নতুন নতুন ছেলে জমা হচ্ছে। অধ্যাপক তাদের রিক্রুট করে বাছাই করে কোম্পানি গঠন করে তারপর প্লাটুনে ভাগ করে দিচ্ছেন। একজন ল্যান্স নায়েক ছেলেদের ট্রেনিং দেন।

জুলাই। "বিকেলবেলা জিন্না এভিনিউতে গিয়েছিলাম একটা কাজে। গ্যানিজের দোকানটা আছে না? ঐখানে কয়েকজন বিচ্ছু গুলি আর গ্রেনেড ছুঁড়ে কয়েকজন পুলিশ মেরে দিয়ে চলে গেল। উ:, কী সাহস ছেলেগুলোর! একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে…"

আর কীই বা আছে! সাহসটুকু ছাড়া? যে সাহস অবিরতই প্রেরণা যুগিয়ে যায়..বাঁচার অর্থ খুঁজে নেবার।

এপ্রিলের রাজশাহী। টাউনের চোদ্দ আনা লোক পলাতক। বাকি দু'আনা ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে মৃতপ্রায়। রাজশাহী টাউন শ্মশান হয়ে গেছে। পাক সেনা দুপাশের সব কিছু জ্বালাতে জ্বালাতে শহরে ঢুকেছিল। ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদে আকাশ লজ্জায় মুখ লুকিয়েছিল কি, মেঘের আড়ালে ? কেউ রেহাই পায়নি সেদিন। বয়স নির্বিশেষে। এক ডাক্তার বলেছিলেন, " যদি এই খানসেনারা ধ্বংস না হয়, তাহলে আল্লার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমাকে নতুন করে ভাবতে হবে। "

১লা অগাস্ট। জাহানারা লিখছেন, "তিনজন মার্কিন নভোচারী অ্যাপোলো -১৯ নভোযানে চড়ে কোটি কোটি মাইল মহাশূন্যে পাড়ি দিয়ে চাঁদের পিঠে নেমে আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহা, আমি যদি কোনরকম একটা টুটাফুটা আকাশযান পেতাম, যেটায় চড়ে মাত্র কয়েকশ' মাইল দূরে মেলাঘর বলে একটা জায়গায় নেমে মাত্র একপলকের জন্য আমার রুমীকে চোখের দেখা দেখে আসতে পারতাম! রুমী গেছে আজ আটচল্লিশ দিন হল। মনে হচ্ছে আটচল্লিশ মাস দেখিনি। এক এক সময় মনে হয় রুমী বলে কেউ কি আছে ? রুমী বলে কেউ কি ছিল কোনকালে? না কি রুমী একটা অলীক মায়া ?"

মেলাঘরে সে মেলা ভিড়। ঢাকার যত কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা, ধানমণ্ডি-গুলশনের বড়লোক বাপের গাড়ি হাঁকানো ছেলেরা, খেলার মাঠের চৌকস ছেলেরা, ছাপোষা চাকুরে বাপের ছেলেরা ..সব্বাই সেখানে গেছে। যুদ্ধ করতে। ওখানে গেলে নাকি সিগারেট না ধরে উপায় নেই! কারণ খাওয়া দাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই তো; সিগারেট ভরসা। খিদে ভুলিয়ে রাখার। আর খাবার? ভাত আর ঘোড়ার ডাল। মানে সাধারণভাবে ঘোড়ার খাবার। রুটির মধ্যে সেঁকা পোকা। কিছু ব্যাপার না। সেঁকা পোকাটা খুঁটে ফেলে দিয়ে রুটি খেয়ে নাও। আবার কখন কী জুটবে কে জানে।

গেরিলা নিয়ে লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা এরপর।

"দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে
কুলুজি তোমার আঁতিপাতি ! তোমার সন্ধানে ঘোরে
ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন
করে খোঁজে প্রতি ঘর।  
পারলে নীলিমা চিরে বের
করত তোমাকে ওরা, দিত ডুব গহন পাতালে।  
তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছ হাত ধরে পরস্পর।  
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দু:খ-তাড়ানিয়া
তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন সন্তান আমার।"

যখন খুব বৃষ্টি নামে, মেলাঘরেও কি বৃষ্টি খুব ? খোলা আকাশের নীচে ঘাসজমিনে শুয়ে কেটে যায় রাতের পর রাত। ভাত খাওয়া মাটির সানকিতে, গ্রেনেডের খালি বাক্স কেটে। ভারতীয় সেনানায়ক বাসনের ব্যবস্থা করতে চাইলে ওরা বলেছিল, তার বদলে বুলেট চাই। নুন ছাড়া তরকারী… দিনের পর দিন। অনেকদিন বাদে নুন জুটলে সেদিন খাবার কম পড়ে যায়।

সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয় !
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।  

রুমী বলেছিল, "কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না। চায় রক্তস্নাত শহীদ। আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব — এই কথা ভেবে মনকে তৈরী করেই এসেছি। এ অনেকটা বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মতো। হয়ত জীবনের পুরোটা তোমাদের মতো জানি না, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য-তিক্ততা-বিষ –সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি।যদি চলেও যাই, কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না। "

২৯শে অগাস্ট। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল রুমীকে। সঙ্গে জামী আর ওদের বাবা শরীফ।কিছুই নাকি না! নিয়মমাফিক জিজ্ঞাসাবাদ। রাতভ'র ফেরেনি ওরা। রুমীকে বাইরে নিয়ে গিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছিল অন্য একটা জীপগাড়িতে। বাকিরা আলাদা। রুমীর কী হয়েছিল?

৩১শে অগাস্ট। মঙ্গলবার। শরীফ, জামীর মুক্তি হল। ফিরল না শুধু রুমী। জামী বলেছিল , "১৯৭১-এর ২৫শে মার্চের পর পাঁচ মাসে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পাঁচশ' বছর এগিয়ে গেছে। ওদের কীর্তিকলাপ শুনলে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীও মাথা নত করবে। তার প্রমাণ আমরা এই দু'দিনে দু'রাতে দেখে এসেছি। আমরা সশরীরে সজ্ঞানে হাবিয়া দোজখ ঘুরে এসেছি। "

সেপ্টেম্বর। কিছুতেই মার্সি পিটিশন নয়। যে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রুমীর মুক্তিযুদ্ধ, তার কাছে মার্সি পিটিশন করলে রুমী তার মা বাবাকে ক্ষমা করবে না। খুনী সরকারের কাছে প্রাণভিক্ষা মানে আদর্শের অপমান।

বন্দীরা সব খেলনা। বুকে ঘুষি, পেটে লাথি, আচমকা ঘাড়ে রদ্দা, চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে এল, রাইফেলের বাঁট দিয়ে অকথ্য মার, বুট দিয়ে কনুই, কব্জি আর হাঁটুর জোড় খুবসে থেঁতলে দাও ! কয়েক মিনিট বিরতি। আবার শুরু। অজ্ঞান হয়ে গেছে ? তাহলে তো খেলার মজাটাই মাটি। জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনো। দেখো, এমনভাবে মেরো না, যাতে বন্দী হঠাৎ করে মরে যায়। হাড় ভেঙে চুরচুর করে দাও, নাকমুখ দিয়ে রক্তের ঢল, চোখ উপড়ে নাও..কিন্তু প্রাণটুকু ধুকপুক করুক। তবেই না মজা ! হাড় ভেঙেছে এমনভাবে যে নড়বড় করছে, ঝুলছে অসহায়ভাবে, চোখ গলে বেরিয়ে এসেছে গালের ওপর, জখম আঙুল মুচড়ে পাটকাঠি। বন্দীর পা দুটো সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে জোরে পাখা চালিয়ে দিলে হয় না ? নীচের দিকে মাথা। নাকে চোখে মুখে ছিটকে যায়, ভলকে ভলকে ওঠে তাজা রক্ত। কিন্তু স্বীকারোক্তি আদায় কি অতই সহজ ? কেউ কেউ ফেরে। বেশিরভাগই ফেরে না। রুমীও না।

২রা সেপ্টেম্বর। আজ জামীর জন্মদিন। বাগান আলো করে ফুটে ছিল বনি প্রিন্স। রুমী তার আম্মীকে জন্মদিনে দিয়েছিল না , একটি আধফোটা বনি প্রিন্সের কলি ? রুমী নেই। কিন্তু নির্লজ্জের মতো বাগান আলো করে ফুটে থাকে গোলাপ। রুমী নেই। জামী তো আছে। জাহানারার আর একটি বনি প্রিন্স। যে ফেরেনি, তার কথা ভেবে ভুলতে বসা কি ভালো যে আছে তাকে ? জামী সেতার বাজায় খোলা ছাদে। মুখটি নীচু। একা। "আমার চোখ ভ’রে পানি এল। ফুলটা আলতো করে জামীর গায়ে ছুঁইয়ে অস্ফুটে বললাম, মেনি মোর রিটার্নস। "

জাহানারা জামীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রুমীর ওপর ঠিক কতখানি অত্যাচার হয়েছে। জামী বলেছিল তার মায়ের চোখে চোখ রেখে, "ভাইয়াকে আমরা শেষ দেখি ৩০ তারিখ দুপুরে। ভাইয়া বলেছে ও খুব টাফ।" রুমী তার মাকে বলেছিল, "যার ওপর টর্চার করা হয়, খানিকক্ষণ পরে সে কিন্তু আর কিছু ফীল করে না। যারা শোনে বা পড়ে, তারাই বেশি শিউরায় ভয় পায়। "

রুমী নেই ? রুমী যে এই সেদিনই আবৃত্তি করছিল :

"যা কিছু পেয়েছি, যাহা কিছু গেল চুকে,
চলিতে চলিতে পিছে যা রহিল পড়ে,
যে মণি দুলিল, যে ব্যথা বিঁধিল বুকে,
ছায়া হয়ে যাহা মিলায় দিগন্তরে,
জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা —
ধূলায় তাদের যত হোক অবহেলা,
পূরণের পদ-পরশ তাদের 'পরে। "

জাহানারা রুমীর ফটোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। কতদিন দেখা হয়নি ওই প্রিয় মুখটি? রুমীরা থাকে না। যুদ্ধ জারী থাকে।  

"দু:খ যদি না পাবে তো
দু:খ তোমার ঘুচবে কবে ?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে
দহন করে মারতে হবে। "

হৃদয়কে পাথর করে রেখে তার নীচে তিরতির করে বয়ে যেতে দাও ব্যথার নদী।   অনেক নীচে বিছিয়ে আছে অভিজ্ঞতার নুড়িপাথর। রাশিরাশি। মন শক্ত কর , রুমী-জামীর মা … শোকবিহ্বল ফরিয়াদ নয়, তোমার বাগানের কালো গোলাপ বনি প্রিন্স যেমন ..ঠিক তেমনি করেই  পাপড়ি মেলুক তোমার রোজনামচার ব্যথার ফুলটি … হৃদয়ের ফুল। স্বাধীনতা পেল বাংলাদেশ। তোমার নেতৃত্বে গড়ে উঠল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা ছিল অসংখ্য, গ্রামে বা শহরে রাজাকারও তো কিছু কম ছিল না। তাদের চিনিয়ে দিতে হবে। কাজটা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। রুমী নেই।  রুমীর বাবা শরীফ যুদ্ধের ডামাডোলে চিকিৎসাবিভ্রাটে চলে গেছেন। কিন্তু তুমি আছ। সমাজ বদলাতেই হবে।  আজ তোমার অজস্র সন্তান।   যারা তোমার চোখ দিয়ে স্বপ্ন দেখে। আলোর স্বপ্ন। শুধু মা হলেই হয় না। মাকে স্বপ্ন চেনাতেও জানতে হয়। যে স্বপ্নের রং শুধু আত্মসুখের উগ্র রং নয়। যে রং চেতনার রং, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রং। খানিক পেরেছিলে, খানিক পেরে ওঠোনি।   কর্কটরোগ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল খানসেনাদের মতো। কাঁকড়াবিছের কামড়। শরীরের যুদ্ধে হার হয়েছিল। মনের যুদ্ধে জিতে গেছ। তবে সে সব তো সবাই জানে। আমি আছি তোমার রোজনামচার পাতায়। যেখানে তুমি ….

জননী থেকে শহীদ জননী হয়ে গেলে !

Developed by DXDasia