সত্তরের দশক-সিসিফাসদের দশক

বুধবার নকশালদের স্টাডি সার্কল হত আমাদের পাড়ায়, অধিকাংশই অনুপস্থিত থাকতেন; রেডিওতে সেদিন সম্প্রচারিত হত বিনাকা গীতমালা

অর্ধশতাব্দীতে কতকিছু ঘটে যায়। নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয় পুরনো বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে। পুরনো বিশ্বাসের চড়া পড়ে যাওয়া পথে উথলে ওঠে নতুন অপ্রতিরোধ্য আর্থসামাজিক বাস্তবতার মিথষ্ক্রিয়া। এই শতাব্দী শূন্যের, অর্থহীনতার, তার পাশাপাশি প্রগতির, তথ্যের বাহুল্যের-একথা তো বদ্রিলার্ড বলেছেন নিজেই। এই শতাব্দীতে পৌঁছে এই অসীম শূন্যতাবোধের মধ্যে থেকে, একান্ত নাস্তির মধ্যে থেকে এক প্রজন্ম কীভাবে খুঁজে নেয় বিগত প্রজন্মের ইতিহাস?

সত্তর দশক-এই সন্দর্ভটা এই নামেই আমাদের মগজের কোষে কোষে প্রোথিত হয়ে যায়। এর ফাঁকে বাঙালিদের এই প্রজন্মের কজন মনে রাখে ১৯৬৭ সালের ২৫শে মে-এর কথা? আজ নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছর নিয়ে বাজারী সংবাদপত্রের সাপ্লিমেন্টারির পাতা ছেয়ে যাচ্ছে, মোচ্ছবের হাওয়ায় উড়ছে ঝকঝকে বাজারী পত্রিকার পাতা। এর আগে বিবিধ ছোট বা মাঝারিমানের পত্রপত্রিকা, প্রকাশনা সংস্থা নকশাল আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সময় উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। গবেষণাও হয়েছে বিস্তর, অ্যাকাডেমিয়া নানাবিধ ক্যালাইডোস্কোপিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেপে দেখেছে এই আন্দোলনকে। কিন্তু সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, রাজনৈতিক বিদ্যাচর্চাকে অনাবশ্যক মনে করে না, সততই রাজনীতিসচেতন এবং ইতিহাসসচেতন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের যদি বাদ রাখা যায়, তাহলে যে সংখ্যাগুরু হরেক কিসিমের তরুণ তুর্কিরা নববসন্তের অগ্রদূত তাদের মধ্যে কজন জানে জঙ্গল সাঁওতালের নাম? কানু সান্যালের সঙ্গে কতজন পরিচিত? অবসাদলীন আত্মহননেচ্ছু তরুণ তরুণীদের কজন কানু সান্যালের আত্মহত্যার উত্তাপ বুঝতে সক্ষম হবে? সদ্যপ্রয়াত নারায়ণ সান্যালকে চিনত কজন? খোকন মজুমদার, যাকে দিনের পর দিন মাটিতে শুয়ে থাকতে হয়েছে হাসপাতালে, অবহেলায়, তাকে চেনে এমন কতজন হাত তুলতে পারে ছকবাঁধা ক্লাসরুমে? নিদেনপক্ষে চারু মজুমদার নামটাই বা শুনেছে কজন? কতজন পড়েছে সুবিখ্যাত ইস্তেহারটি?

কিন্তু এসব নামের থেকেও একাংশের কাছে চিরকেলে জনপ্রিয় নাম অনিমেষ এবং মাধবীলতা। সেই একাংশকে "নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে যাহা জানো লিখো" লিখতে দিলে অষ্টোত্তর শতনামের মতন তারা অনিমেষ মাধবীলতা মাধবীলতা অনিমেষ লিখে যাবে হয়তো খাগের কলম দোয়াতে ডুবিয়ে। অধুনার না ঘরকা না ঘাটকা বাংলা সিনেমাতে সবথেকে বিজ্ঞাপিত উপাদানটির নাম সত্তর দশক। একটা গোটা প্রজন্মের সিংহভাগ নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে আগামাথা কিছুই জানল না, জানল শুধু পুলিশ ক্রিকেট বা ফুটবল কোচেদের মত করে ময়দানে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের বেলায় জিপ থেকে আগুনখেকো বিপ্লবীদের নামিয়ে দিয়ে ছুটতে বলে এবং তারপর একটি প্রাণপণ উসেইন বোল্টমার্কা দৌড় দেখা যায় বিবিধ অ্যাঙ্গেল থেকে এবং অবশেষে পেছন থেকে বুলেট ছুটে এসে পাঞ্জাবি পরা রোগাভোগা নকশালের দেহকে ঝাঁঝরা করে দেয়। সাম্প্রতিকের একটি প্রবল জনপ্রিয় বাংলা সিনেমাতে একটি পরিচালক হয়ে উঠতে চাওয়া ঝকঝকে নবীন চরিত্রের সংলাপে শোনা যায় সে নকশাল আন্দোলনকে কীভাবে ক্যামেরায় ধরবে তার বৃত্তান্ত। সে জানায় কোনো সরু গলির মধ্যে দিয়ে ছুটন্ত নকশালকে সে পেছন থেকে শুট করবে হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায়; এই বিবরণ দিয়ে সে সংলাপে দিব্যি জুড়ে দেয় একটি অলংকার, " আ লা 'কলকাতা একাত্তর' "। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু এই দায়িত্ব নিতে হবে কোনো প্রবীণ মহান পরিচালককেও, বাংলা সিনেমাকে যিনি এমন ছিনিমিনি ছেলেখেলাসুলভ সিনেম্যাটিক আর্কেটাইপ উপহার দিলেন একটি আন্দোলন সম্পর্কে।

কিন্তু এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অবশ্যম্ভাবী ভাবে মনে পড়ে যাবে 'হারবার্ট'-এর কথা। 'সুবর্ণরেখা'-র নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে আশান্বিত হয়ে হাঁটতে থাকা বিনুকে নবারুণ কীভাবে নিয়ে আসেন তাঁর ক্যানভাসে তা আশ্চর্য করে দেয়। 'হারবার্ট' চলচ্চিত্রের যে দৃশ্যে বিনুর মুখের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে আশাভঙ্গের কালো রক্ত, এবং লাল চাদরে ঢাকা বিনুর দেহের ভেতর থেকে অন্তর্ভেদী সংলাপ ভেসে আসে, "ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরনো দিনগুলো", তখন শিহরণ হয় মেরুদন্ডে। লাল চাদরে ঢাকা দেহ যখন স্থির হয় তখন দেখা যায় সেই দেহের পায়ে শিকল বাঁধা।

আটষট্টির ফ্রান্সে দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা ছিল, "যে সমাজ তোমার সব রোমাঞ্চ শেষ করছে শেষ করো সেই সমাজকে-সেইই তোমার শেষতম রোমাঞ্চ"। বিনুর পায়ের শিকল আসলে সেই হত্যাকারী সমাজেরই চিহ্ন? হারবার্ট মার্কুইজ তরুণ প্রজন্মের যে প্রবণতাকে 'গ্রেট রিফিউজাল' বলেছেন তাই হয়ে উঠেছিল সেইসময়ের অভিজ্ঞান। যে আশাবাদী প্রত্যয়ী অস্বীকৃতির, নৈরাজ্যের চর্চা সেসময় ঘটছিল তাকে দেখতে পাই 'প্রতিদ্বন্দ্বী'-র সিদ্ধার্থর চেয়ারটেবিল ভাঙচুরের পর ঋজু হয়ে হেঁটে যাওয়াতে। যে তরুণ প্রজন্ম একসময় ছিল 'ইয়ং বেঙ্গল', হঠকারী হলেও যারা সমাজের সব ক্লেদ অস্বীকার করত এককথায়, আবার যে তরুণ প্রজন্ম কালীর আইডিয়াকে সম্বল করে সন্ত্রস্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকারকে, তাদেরই উত্তরপুরুষেরা সত্তরের বঙ্গদেশে এমন দুঃসাহসী স্পর্ধিত সন্ত্রাসের কান্ডারী। কলকাতা শহরের নিশ্চিন্ত মধ্যবিত্ত যাপনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এইসময়ের হিংস্রতা। ঘেঁটে গিয়েছিল সব নাগরিক নিরাপত্তা। ঝুঁকি নিতে একদল ভয় পায়নি, তারা জানত, "মোষের শিং-এ মৃত্যু বাঁধা"। রাষ্ট্রের দমনপীড়নে দুরমুশ হয়ে যাওয়া তরুণের লাশকে অতিক্রম করে মধ্যবিত্ত গৃহীকে সেদিন বাজারে যেতে হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নকশাল আন্দোলনকে পেয়েছি গত প্রজন্মের স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির টুকরো কোলাজ দিয়েই কথা বলায় ইতি টানব আপাতত। সেসময়ের তুমুল জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা, দেব আনন্দ অভিনীত 'প্রেম প্রতিজ্ঞা'। শচীন দেববর্মণের সুরে এই সিনেমার গানগুলো রীতিমত শ্রুতিমধুর। অথচ এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে কলকাতা তটস্থ হয়ে পড়েছিল একসময়। 'রাধা' সিনেমাহলে নকশালরা বিস্ফোরণ ঘটান এই সিনেমা চলাকালীন। এইসময়ের একটি ঘটনা জনশ্রুতির ইতিহাসে রয়ে গেছে। জনৈক নকশালপন্থী সাংবাদিকের খুন দেখে ফেলেন স্বয়ং উত্তমকুমার, প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে। তারপর নাকি শাসকপক্ষের ক্রমাগত হুমকি এবং বিপ্লবীদের তরফ থেকে মুখ খোলার জন্য আবেদনে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মনে আছে 'সোপান' নামে একটি বাংলা সিনেমা হয়েছিল এই ঘটনাটির ছায়া অবলম্বনে। এইসমস্ত ঘটনাই আমি শুনতে পাই সেইসময়ের প্রত্যক্ষদর্শী, সেইসময়ের বাসিন্দাদের থেকে। বুধবার করে নকশালদের স্টাডি সার্কল হত আমাদের পাড়ায়, অথচ সেদিন অধিকাংশই অনুপস্থিত থাকতেন; কারণ রেডিওতে সেদিন সম্প্রচারিত হত বিনাকা গীতমালা। এমন স্মৃতিও এসে পৌঁছেছে আগের প্রজন্ম মারফত। টাউন স্কুলের সামনে নকশালদের হাতে বামনেতা হেমন্ত বসুর খুন হওয়ার নির্মম ঘটনা, পাড়ার একজন নির্দোষ বামকর্মীকে নকশাল সন্দেহে থানায় নিয়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রী দিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা, শ্যামপুকুর অঞ্চল বিড়ম্বিত হয়ে যাওয়ার ফলে বাবার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়ার ঘটনা, যখনতখন বোমা পড়ে পুরনো বাড়ির পুরু দেওয়াল কেঁপে ওঠার ঘটনা, পাড়ার মধ্যে কারফিউর সময় যখনতখন পুলিশ জিপের হাজির হওয়া, পারস্পরিক সন্দেহের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এসবই আমার পূর্বসূরীদের স্মৃতিতে কুড়িয়ে পাওয়া নুড়িপাথর। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, দেবী রায়, রুণু গুহ নিয়োগী প্রভৃতি নামগুলোকে ঘৃণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম কোন ছোটবেলায়। কখনও দেখেছি মধ্যবিত্ত স্মৃতিতে নকশাল আন্দোলনের বেঁচে থাকা শুধুই সন্ত্রাস হিসেবে, কখনও দেখেছি আগের প্রজন্মের চোখে আলো, যেন একটা ক্ষয়ে যাওয়া শ্যাওলাধরা অচল সময়ের বুকে প্রত্যাশার আগাছা জন্মেছিল, যে স্বপ্ন দেখেছিল সুদূরের, "সেদিন, কাছে এসো, ভালবাসি একসাথে এই সবকিছু"। সেই আশায় ভর করেই সিসিফাস হয়ে পাথর ঠেলে যাওয়া অবিরাম।

Developed by DXDasia