
কার্শিয়াং-এর বহু গ্রামে এভাবেই মহিলারা খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের জীবন
বাইসাইকেলের চাকাই তাঁদের কাছে চরকা। সেই চরকা ঘুরিয়ে সুতো ভরা হয়। তারপর এক যন্ত্র থেকে আরেক যন্ত্র। আর যন্ত্রের সঙ্গে মহিলাদের হাতের কাজের যত্ন, কেরামতি। তা দিয়েই তাঁরা তৈরি করছেন সুতির শাল, চাদর, টাওয়েল, রুমাল, বেডকভার, শাড়ি, ধুতি, জামা প্রভৃতি। এই পদ্ধতিকে তাঁরা বলছেন শাটল লুম।

আবার, আরেকটি পদ্ধতি হল লায়ন লুম। মূলত উল ব্যবহার করা হয় তাতে। শাল, মেখলা, সোয়েটার, ব্যাগ, মাফলার, টুপি, মোজা, কার্পেট প্রভৃতি এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়। সেখানেও হাতের নৈপুণ্যের সঙ্গে মহিলাদের ধৈর্য আর মেশিনের সাহায্য তাঁদের স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে।

দার্জিলিং পাহাড়ের কার্শিয়াং এলাকার বহু মহিলা এভাবে স্বনির্ভর হচ্ছেন। রাজ্য সরকারের হ্যান্ডলুম দফতরের সহায়তাও নিতান্ত কম নয়। তবে মহিলারা আরও সরকারি সহায়তা চাইছেন।

কার্শিয়াং-এর মধ্যে কাটলেরি গ্রাম। সেখানেই রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় ২০১৩ সাল থেকে চলছে মহিলাদের হস্তশিল্পের সমবায় সৃষ্টি উইভারস ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি। সদস্য সংখ্যা ২১ জন। সেখানেই বহু গ্রামের মহিলা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হস্তশিল্পের কাজ করে চলেছেন। কোচবিহার থেকে সুতো কিনে আনেন তাঁরা। তারপর শাটল লুমে তৈরি করা হয় একের পর এক সামগ্রী – যেমন চাদর, টাওয়েল, শাড়ি, ধুতি। সেই সব সামগ্রী রাজ্য সরকার পরিচালিত বিভিন্ন হস্তশিল্পের মেলা বা হাতে-হাতে বিপণনের ব্যবস্থা করেন বলে জানালেন সৃষ্টি উইভারস সোসাইটির সভাপতি অনু প্রধান এবং কোষাধ্যক্ষ সীতা শর্মা। শাটল লুম এবং লায়ন লুমে তৈরি ওই সব সামগ্রীর দাম ৬০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। বিভিন্ন সামগ্রীর গুণগত মানের ওপর ভিন্ন ভিন্ন দাম।

২০১৬ সালে এক ভূমিধসের জেরে কো-অপারেটিভের শাটল লুমের বিভিন্ন যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাত্র পাঁচটি যন্ত্র এখন ঠিক আছে। ফলে সেই শাটল লুমের কাজ কার্যত বন্ধ। উৎপাদন মার খাওয়ায় বহু মহিলা আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। তাঁরা চাইছেন সরকার এই সমবায়কে বাঁচাতে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিক। নেওয়া হোক বিশেষ প্রকল্প। তাছাড়া স্রেফ উদাসীনতার জেরে অনেক যন্ত্র চুরি হয়ে গিয়েছে। যে স্থানে আগে কাজ হত সেই স্থান ধসে নষ্ট হওয়ার পর মেরামত করা হচ্ছে না। সেখানে প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় খোদ জেলা ক্ষুদ্রশিল্প কেন্দ্রের অনেক সামগ্রী দুষ্কৃতীরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

একদিকে এই চেহারা থাকলেও, কার্শিয়াং পুরসভার সামনে অবস্থিত বয়েজ প্রাইমারি স্কুল চত্বরে ২০১৩ সাল থেকে শুরু হয় মহিলাদের আর একটি হস্তশিল্পের সমবায় প্রগতি উইভারস ডেভেলপমেন্ট সমিতি। এই সমবায়ের সদস্য সংখ্যা এগারো জন। শাটল লুম আর লায়ন লুম দুটোরই কাজ হয় এখানে। এর সভাপতি নিশা মোক্তান এবং সম্পাদিকা সমিতা গুরুং জানালেন, তাঁদের ধাগা উইভিং-এ বহু মহিলা কাজ করেন। বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করলেও, বিপণন ভালো নেই। সরকারি সাহায্যের অপেক্ষাতেই তাই বসে আছেন তাঁরা।
