
এই সভার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘হুল্লোড়ে’ আর ‘হুজুগে’ এই শব্দ দুটি বাঙালি সম্পর্কে সবসময় সত্যি। সেই উনিশ শতকে ঠাকুরবাড়ির বাঙালিরাও নানারকম কাণ্ড ঘটিয়েছেন। সেইসব কাণ্ডকারখানাকে কেন্দ্র করে হুল্লোড়ের কোনো ঘাটতি ছিল না। আড্ডাবাজ অতীতের বাঙালিও যুক্তি তক্কের তোয়াক্কা না করেই সভা সমিতি তৈরি করেছে কত। এমনি এক সভার নাম ছিল ‘হামচূপামূহাফ’।
ঠাকুরবাড়িতে একসময় সবরকম ক্রিয়াকাণ্ডের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তখন তাঁর অনুগত কিশোরবাহিনীর একজন। হামচূপামূহাফ একটি গুপ্তসভার সাংকেতিক নাম। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গুপ্তসভার গুরুত্ব ছিল অনেকটাই। ঠাকুরবাড়িতে এই গুপ্তসভার উদ্যোগের মূল কারণ ছিল স্বাদেশিকতা । তবে ধীরে ধীরে এই সভায় বিচিত্র কর্মকাণ্ডের ভিড়ে প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। তবে, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে অমলিন হয়েছিল হামচূপামূহাফ। এই গোপন গুপ্তসভা, পোড়োবাড়িতে তার অধিবেশন, ঋগ্বেদের পুথি, মড়ার মাথার খুলি, খোলা তলোয়ার নিয়ে অনুষ্ঠান— এইসব রোমাঞ্চকর স্মৃতির কোলাজ সভাটিকে ঘিরে সদস্যদের আবেগের নস্টালজিয়াকে আরও প্রতিষ্ঠা দিত। রাজনারায়ণ বসু ছিলেন জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব। তিনি সভার সকলকে স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকেও!
সভাটির আসল নাম ছিল ‘সঞ্জীবনী সভা’। পরাধীন ভারতবর্ষকে নতুন করে জাগিয়ে তোলাই ছিল এই সভার উদ্দেশ্য। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই সভার ধারণা পেয়েছিলেন ইতালির ‘কার্বোনারি সভা’র থেকে। মাৎসিনি ছিলেন এই সভার প্রতিষ্ঠাতা। ‘কার্বোনারি’ কথার অর্থ হল the charcoal burners— সভার সবরকম কাজকর্ম হত সাংকেতিক ভাষায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হামচূপামূহাফেও এই সংকেত ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।
প্রথমদিকে, মানে ১৮৭৭ সালে সভার সদস্যদের উৎসাহ ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু অতি আবেগ অনেক অসাধ্য পরিকল্পনার জন্ম দিয়েছিল। স্বদেশ উদ্ধার ও বিলিতি বস্তু বয়কটের তাগিদে অনেক জল্পনা কল্পনা হত। দেশলাইয়ের কারখানা, কাপড়ের কল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেই দেশলাই কারখানা থেকে কয়েকটি দেশলাই বাক্স বেরোলেও এক বাক্স দেশলাইয়ের জন্য যা খরচ হয়েছিল তাতে একটা পল্লীর সম্বৎসরের চুলা ধরানো চলত। রবীন্দ্রনাথ পরে লিখেছিলেন, দেশের প্রতি ওই জ্বলন্ত অনুরাগ যদি ওই দেশলাই কাঠির জ্বলনশীলতা বাড়াতে পারত তবে তারা বাজারে চালু থাকত। কাপড়কলের ইতিহাসও দুঃখজনক। এক অল্পবয়স্ক ছাত্রের কাপড়কলের জন্য যথেষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কাপড়কল একটি মাত্র সবেধন নীলমণি গামছা প্রসব করে দেহ রেখেছিল। কিন্তু সেই একটুকরো গামছা মাথায় বেঁধে দুহাত তুলে আশ্চর্য ভঙ্গিতে নেচেছিলেন ব্রজনাথ দে। তিনি আবার রবীন্দ্রনাথের শিক্ষকও ছিলেন। সভার অন্য সভ্যরাও সেই উদ্বাহু নৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন। এই আবেগভরা উন্মাদনাই ছিল হামচূপামূহাফের প্রাণ।
এই সভাকে ঘিরে একটা রোমাঞ্চকর গোপনীয়তা ছিল। যদিও তাদের আচরণে রাজা বা প্রজার ভয়ের কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু ভরদুপুরে তাদের গতিবিধি বিষয়ে আত্মীয়পরিজন কেউ কিছু জানতেন না। রুদ্ধ ঘরে, ঋকমন্ত্রে দীক্ষা, চুপিচুপি কথায়, অব্যক্ত ভাবাবেগে, ভীষণ গাম্ভীর্যে সঞ্জীবনী সভা ওরফে হামচূপামূহাফ বেশ জমজমাট ছিল।উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির কাছে একর পরিত্যক্ত স্কুলবাড়িতে সভা বসত। একটা ভাঙা টেবিল, কয়েকটি ভাঙা চেয়ার, একদিকে ঝুলে পড়া ভাঙা টানা পাখা আর লাল রেশমে জড়ানো একটি বেদমন্ত্রের পুথি— বেশ একটা আবহ তৈরি করত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য টেবিলের দু-পাশে রাখা ছিল দুটি মড়ার মাথা, তাদের চোখের কোটরে মোমবাতি জ্বলত। মড়ার মাথা ছিল দুর্বল ভারতের প্রতীক, বাতি জ্বালানো ছিল মৃত ভারতে প্রাণ সঞ্চারের প্রতীক। ‘সং গচ্ছ্বধ্বম্ সং বদধ্বম্’ গেয়ে সভার কাজ শুরু হত। নতুন কোনো সভ্য দীক্ষা নিলে রাজনারায়ণ বসু লাল পাটের বস্ত্র পরে আসতেন। মন্ত্রগুপ্তির গুরুত্ব সভার সব সভ্যরা জানতেন। প্রাণ থাকতে সভার কথা বাইরে যাবে না— এই ছিল তাঁদের পণ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বাংলা স্বর ও ব্যঞ্জনের সাহায্যে সাংকেতিক বর্ণমালা তৈরি করেছিলেন । ‘হামচূপামূহাফ’ নামকরণটি আর সভার কাজ ওই ছদ্ম বর্ণমালা অনুসারেই হত।
এই সভার কাজে আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। একটি সর্বজনীন ভারতীয় পোশাকের কথা ভাবা হয়েছিল সেই প্রস্তাবে। ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবী ঐক্যের কথা ভেবে পোশাক পরিকল্পনার ভার নিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। অনেক ভেবে ঠিক হল, মালকোঁচা মেরে পরা কাপড় ও মাথায় যাতে রোদবৃষ্টি না লাগে তার জন্য মাথায় শোলার টুপির উপর পাগড়ি বসানো শিরস্ত্রাণ হবে সর্বজনীন ভারতীয় পোশাক। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পাজামার উপর একখণ্ড কাপড় পাট করে কৃত্রিম মালকোঁচার মতো করে পরে, মাথায় শোলার টুপির উপর শিরস্ত্রাণ চাপিয়ে শহর পরিক্রমায় বেরোলেন। সকলের বিস্মিত চোখ তাঁকে থামাতে পারে নি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এমন বীরপুরুষ অনেক থাকিতে পারে কিন্তু দেশের মঙ্গলের জন্য সর্বজনীন পোশাক পরিয়া গাড়ি করিয়া কলকাতার রাস্তা দিয়া যাইতে পারে এমন লোক নিশ্চয়ই বিরল।’ এই সভার উদ্যোগে বন্দুক চালনা এবং শিকার করার ব্যবস্থা হয়েছিল। উদ্দেশ্য —দেশবাসীকে সাহসী করা। শিকারের আয়োজন থাকত, খাবাররের ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু শিকার ছিল গৌন। এই সভার জন্যই একটি ইটিং ক্লাব তৈরি হয়েছিল। পালা করে সভ্যদের খাবারেরও আয়োজন করতে হত। সে এক কাণ্ড বটে।
ঠাকুরবাড়িতে এমন মজাদার কর্মকাণ্ড অনেক হয়েছে। হয়তো অতিরিক্ত আবেগ সব উদ্যোগকে সফল হতে দেয়নি। হামচূপামূহাফ এমনি এক কর্মকাণ্ড। তবু পরাধীন ভারতবর্ষে কয়েকটি তরুণ ও কিশোরের এই গোপন সভাটি স্নিগ্ধ মাটির পিদিমের মতোই বাঙালির স্মৃতির ঘরে জ্বলছে, জ্বলবে। অতীতের স্মৃতির প্রকোষ্ঠ থেকে ঠিকরে আসা এ এক অন্য জ্যোতি।
সহায়ক গ্রন্থঃ
জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
