সাতমুখীহাট ও মোরগের লড়াই

নিষিদ্ধ হলেও আজও এই প্রাচীন বিনোদন চলছে

পাশে সবুজ ধানক্ষেত, ধানের ক্ষেতে থেকে দেখা যাচ্ছে সূর্য অস্ত যাওয়ার দৃশ্য। আর এর ঠিক পাশেই ছোট্ট পোড়ো মাঠ, মাঠের ঠিক মাঝখানেই মস্ত বড় বটগাছ। এই বটগাছে নীচেই চলছে লড়াই। লড়াই টা কিসের? মোড়গের লড়াই। যেমন ভীড়, তেমনি চেঁচামেচি, চিৎকার, হট্টগোল। এছাড়া রয়েছে মুখে খিস্তি ও গালিগালাজ। সঙ্গে চলছে বেটিং, কেউ একশো, কেউ বা দুশো, কেউ আবার পাঁচশো টাকা দিয়ে বেটিং করছে। পাশে দেখলাম কিছু মহিলারা বসে হাঁড়ি নিয়ে জাল দিচ্ছে ‘হাঁড়িয়া’। মোরগের লড়াই এর বেটিং করছে আর গ্লাস গ্লাস হাড়িয়া খাচ্ছে।

এককথায় বলতে গেলে আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন দেখেছিলাম গ্রামে গঞ্জে বা গ্রামের হাটে বাজারে হাট দিন গুলোতে মোরগের লড়াই এর আসর বসত। কিন্তু বর্তমানে গ্রামে এই খেলা আগেকার মত ঘন ঘন আর হয় না। খুবই কম চোখে পড়ে। তবে মোরগের লড়াই কেমন ভাবে হয় তা আলোচনা করা প্রয়োজন।শিশুদের একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা খেলা যেইরকম তেমনি মোরগের লড়াই খেলাটি সেইরকমই। এটি সুন্দরবনে আদিবাসীরদের সর্বাপেক্ষা প্রিয়খেলা। এই খেলা আদিবাসী ছাড়াও হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সুন্দরবনে বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন :- সাতমুখীহাট, হেড়োভাঙ্গা, তালদি, কাঁকড়া, মাতলা, গোসবা, ছোটমোল্লাখালী, রাণীপুর, বাসন্তি, সোনাখালী, পাণিখালী,চুনাখালী, ভরতগড়, ঝড়খালী, সাতকেওড়া ও চড়বিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে হাট ও বাজারে কে কেন্দ্র করে এই খেলা বসে। বিশেষ করে সুন্দরবনে বনবিবির মেলা, কৃষিমেলা দিনে মোড়গের লড়াই দেখতে পাওয়া যায় বেশী। সৌভাগ্যক্রমে আমরা একবার মোরগের লড়াই দেখেছিলাম। দেখেছিলাম সাতমুখীহাটে।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় ক্যানিং ব্লকে অন্তর্গত প্রায় সাত কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত "সাতমুখীহাট"। এখানকার লোকের মুখে মুখে শোনা যায় যে, এই হাটের চারিদিকে সাতটি মুখ আছে যা প্রত্যকটি রাস্তার সাথে সংযুক্ত রয়েছে।আর এই সপ্ত মুখের উপরে যে হাট বা বাজার বসে। সেই হাটের নামকরণ হয় "সাতমুখীহাট"। সাতমুখীরহাট বসে প্রতি সপ্তাহে রবিবার ও বুধবার (১৯৯৭ সাল অনুসারে)। পরে হাট বসার বার পরিবর্তন করে করা হয় মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার।

এই হাট পরিচালনা সমিতি ও দায়িত্বে রয়েছে "ক্যানিং ১ নং গ্রাম পঞ্চায়েত সমিতি"। আগে হাটটি ভগ্ন দশা ছিল। হাটে বর্ষায় জল ও কাদা জমে যেত। হাট বসতে সমস্যা হত। বিগত কয়েক বছর হাটটি সংস্কার করে ক্যানিং ১নং গ্রাম পঞ্চায়েত সমিতি। বর্তমানে হাটটি পিচের ঢালাই, টিনের ও আসবেসট্যাস ছাউনি করে দেওয়া হয়েছে। যাতে ঝাড় বৃষ্টিতে কোন সমস্যা না পড়তে হয়। নিকাশী ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। তবে সাতমুখীরহাটে হাটবাজারের দিনে বিভিন্ন শাক- সবজি থেকে শুরু করে ফল – ফল সবই বসে। প্রীতি রঞ্জন সরকারের থেকে জানলাম যে, এই বাজারে খুব সস্তায় যেকোনো জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকম মাছের দাম খুবই কম দাম পাওয়া যায়। আরও শোনা গেল যে, সবজির মধ্যে আলু, পৌষে বেগুন, কুমড়ো, রাঙা আলু, ঝিঙে, উচ্ছে, পটল, লাউ, সিম, বডবটি, করলা, ও শশা; শীতের সময় পুইশাক, পালংশাক, বাঁধাকপি, ওলকপি, লঙ্কা ও কচু বেশী দেখা যায়। আর মাছের মধ্যে কাতলা, রুই, পোনা, মৃগেল, ট্যাংরা, পুঁটি, লোটে মাছ, ভেটকি, এছাড়া হাটের দিনে দিশি মোড়গ ও মুরগী বিক্রি বেশী হয়। তবে সুন্দরবন তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ার জন্য এই হাটে কাঁকড়া, চিংড়ি বেশি চোখে পড়ে। যেমন গলদাচিংড়ি, বাগদাচিংড়ি ও কুঁচো চিংড়ি আছেই, আর কাঁকড়ার মধ্যে তেলে কাঁকড়া, চিতি কাঁকড়া, যেমন সস্তা তেমন এখানে বেশী দেখতেও পাওয়া যায়। তবে সাতমুখীরহাটে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চাষের জিনিসপএ কেনাবেচা হয় বেশী। যেমন এই হাটের পার্শ্ববতী অঞ্চলগুলি হল ডাবু, হেড়োভাঙ্গা, রায়বাঘিনী, ট্যাংরাখালী ও ঢোষা ইত্যাদি। এই সব অঞ্চলের চাষের শাক- সবজি থেকে শুরু করে ফুল ও ফল সব চাষের জিনিস আসে অটো, মোটরভ্যান, ও পা- ভ্যানে করে। সুন্দর করে ঝাঁকায় সাজিয়ে আনা হয় সাতমুখীরহাটে। এই হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট একটি শাখা নদী যা, ডাবু ও ক্যানিং নদীতে অর্থাৎ মাতলাতে মিশেছে। আর এখানকার লোকেরা শাখানদীর উপর নির্ভরশীল যেহেতু এই নদীর জলের মাধ্যমে চাষ- আবাদ করে, আবার মাছও চাষ করে থাকে। নদী থাকার ফলে জমির উরর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, আর চাষের জলের কোন সমস্যা থাকে না।

যাইহোক এতক্ষণে হাটের বর্ণনা দিলাম, এবারে মোরগের লড়াইয়ের প্রসঙ্গে আশা যাক। সাতমুখীর হাটের উপরে একটি বড়ঠাকুরের মন্দির আছে, এই মন্দিরের সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে ডাবুর দিকে, আর হাট থেকে এই রাস্তায় নাক বরাবর মিনিট পাঁচেক হাঁটলে বড় বটগাছের তলায় দেখতে পাওয়া যাবে মোরগের লড়াই এর আসর। প্রতি সপ্তাহে রবিবার সাতমুখী হাটের কাছে বিকেলের দিকে মোরগের লড়াই আসর বসে। আমি প্রত্যক্ষ করলাম লড়াই শুরু করানোর আগে তাদের নাম নথিভুক্ত করতে হয় ষাট টাকা দিয়ে। আর তারপর খেলা শুরুর আগে মোরগের খেলোয়াড়রা নিজেদের মোরগ নিয়ে সমকক্ষ জোড় খোঁজার জন্য অন্যান্য মোড়গের সামনে রেখে পরীক্ষা করে দেখে নেন। মোরগের সমান সমান জোড় নাহলে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন মোরগের সাথে মোড়গের লড়াই হয়। যেমন :- বন মোরগ, কাওড়া মোরগ ও জংলি মোরগ ইত্যাদি। ভালো জাত মোরগ ভালো দামে ব্রিক্রি হয়। রক্তমাতাল হওয়া মোড়গ লড়াইয়ের জন্য ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে তৈরি হয়। তবে আসরে প্রত্যক্ষ করলাম মোরগকে রাগানোর জন্য নানাপ্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সেটি করে খেলোয়াড়রা। যেমন মোরগকে মাদক দ্রব্য কখনও হাড়িয়া খাওয়ানো হয়। ফলে মোরগ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আবার এই লড়াই এর আগে থেকে বেটিং শুরু হয়, ;কেউ একশো থেকে শুরু করে পাঁচশো টাকা বেটিং ধরে। মোরগের পায়ে অস্ত্র বাঁধার জন্য কাঁতিদার থাকে। কাঁতিদার চটের উপর কাঁত, চামড়া টুকরো সুতো নিয়ে বসে থাকে।আর এরাই মোরগের পায়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বেঁধে দেয়। যেমন- সোজা ফলি, বাঁকা ফলি, লোহার ধারালো অস্ত্র বাঁধা হয়। এইসব অস্ত্রগুলিতে তুঁতে মাখানো থাকে। যাতে খুব সহজে ঘায়েল করা যায়।

একটি ব্যাপার লক্ষ্য করার মত যখন মোরগের লড়াই চলে তখন দর্শকদের হাততালি দেওয়া নিষিদ্ধ। এটা তাদের নিয়ম। তবে অনেক সময় মোরগের লড়াইকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি শুরু হয়। এইসব অশান্তি ঠেকাতে আসেন হাটের সমিতি লোকেরা। সাতমুখীহাটেও বহুবার অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে জানা গেল।

নানা কারণে মোরগের লড়াই নিষিদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের আনন্দ, আমোদ, প্রমোদ করার জন্য আজও গ্রামে বিভিন্ন হাটে ও বাজারে কেন্দ্র করেই এই খেলার আসর বসে। তার উদাহরণ স্বরূপ হল সাতমুখীরহাট। যা আজও মোরগের লড়াই খেলা চলে। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে।

Developed by DXDasia