‘আমি একজন মার্কসবাদী হিসেবে এই তথাকথিত বামপন্থীদের বিরোধিতা করছি’

শরীর খারাপ হল ওই বয়সে অমানুষিক পরিশ্রম করার ফলেই

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

তরুণ সান্যালকে প্রথম চিনি আমাদের স্কটিশ চার্চ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে। ১৯৭১-এর শেষে কলেজে ভর্তি হই আমি। তবে অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম না। পরিচয় পত্রিকায় লিখতাম; তরুণবাবু সম্পাদক ছিলেন তখন। সেই সূত্রে আলাপ। কফি হাউসে পরিচয়ের অফিসে দেখা হত মাঝেমধ্যেই, নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন আমাদের সঙ্গে। অর্থনীতি উনার বিষয় হলেও, দর্শন, রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্যে অগাধ দখল। নিজে কবিতা লিখতেন। 

তরুণবাবু মার্কসবাদী ছিলেন মনেপ্রাণে, নিজেও বারবার বলতেন এ-কথা। রাজনীতির দিক দিয়ে সিপিআই-এর সঙ্গে ছিলেন তিনি। সত্তরের উত্তাল দশকে সিপিআই-এর কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠতা আমাদের ভালো লাগত না, অস্বস্তি হত, এমন পণ্ডিত হয়েও কেন সিপিআই করতেন উনি। সে-কারণে আমি পরিচয় পত্রিকায় লেখা বন্ধ করে দিই। তবে তাঁর সঙ্গে এ-নিয়ে আলোচনা করিনি কখনও। ১৯৭৭-৭৮-এর পর সিপিআই থেকে তৈরি হয় ইউসিপিআই। তরুণবাবু ইউসিপিআই-এ ছিলেন। ওই সময়ে নিয়মিত দেখা হত না তাঁর সঙ্গে। 

২০০০-২০০১-এর পর থেকে তরুণবাবু অন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। ওই সময় আবার যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাঁর সঙ্গে। আমি মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেই সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে, এসেছেন। তীব্র ভাষায় বিরোধিতা করেছেন অন্যায়ের। এই তরুণ সান্যালকে আমি জানতাম না আগে।

সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে ভয়ানক বিদ্রোহী ভূমিকা নিয়েছিলেন তরুণবাবু। ভালো করে হাঁটতে পারতেন না তখন। লাঠি নিয়ে বা কারো কাঁধে ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। সেই নিয়েও বিভিন্ন মিটিং-মিছিলে গিয়েছেন, তীব্র ভাষায় বামেদের ভূমিনীতি ও রাজনীতির নিন্দা করছেন তিনি। 

আমি ওঁর সঙ্গে সিঙ্গুর গিয়েছি অনেকবার। প্রায় প্রত্যেক জায়গাতেই উনি উপস্থিত থাকতেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রবল অ্যাক্টিভ ছিলেন। তখন ওঁর বয়স প্রায় ৭৭। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেছেন, মানুষকে সচেতন করেছেন বামেদের বিরুদ্ধে। শরীর খারাপ হল ওই বয়সে অমানুষিক পরিশ্রম করার ফলেই। ওঁকে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমি আপনাকে নতুন ভূমিকায় দেখলাম।’ গাড়িতে একসঙ্গে যেতে যেতে একদিন হেসে বললেন, ‘জানো তো, বাড়ি ফিরে গিয়ে বকুনি খেতে হবে। বাড়ির লোক চায় না এত পরিশ্রম করি। আমি লুকিয়ে বেরিয়ে পড়ি।’

এই সময় পুরনো রাজনৈতিক ভূমিকা ছেড়ে বেড়িয়ে এসে এসইউসিআই-তে যোগ দেন তরুণবাবু। বাম বিরোধী ভূমিকা নেন। ২০০৬-এর শেষের দিকে বুদ্ধিজীবী সংঘ তৈরি হয়, সভাপতি হয়েছিলেন তরুণ সান্যাল। সভাপতি হিসেবে অনেক জায়গায় লিখেছেন। মিটিং মিছিল করেছেন, প্রতিবাদপত্রে সই করেছেন। 

স্টুডেন্টস হলের এক সভায় উনি বলেছিলেন, ‘আমেরিকানরা যেভাবে সেসময় রেড ইন্ডিয়ানদের জমি ছিনিয়ে নিয়েছিল, এখন সিঙ্গুরে তাই হচ্ছে। তেমন হলে আমি ভাঙা পা নিয়ে সিঙ্গুরে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব।’

‘আমি একজন মার্কসবাদী হিসেবে এই তথাকথিত বামপন্থীদের বিরোধিতা করছি।’ – এই কথা প্রকাশ্যে বলার মতো দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন আমার স্যার, তরুণ সান্যাল। 
 

Developed by DXDasia