“আমাদের ধার্ম্মিক হওয়া মানে পরের ভিতর ভগবানকে খোঁজা, আমাদের দেশ-হিতৈষিতার মানে পরের কথামত চোখবুজে চেঁচানো”

উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
হিন্দুসমাজের একটা জাতি-বিশেষের সম্বন্ধে প্রবাদ আছে যে, তারা আশী বৎসর বয়সে সাবালক হয়। তার আগে তারা নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে ভাবতে পারে না, নিজেদের ইষ্টানিষ্ট বুঝতে পারে না।

ও-কথাটা ও-জাতি-বিশেষের সম্বন্ধে ঠিক খাটে কিনা জানিনে; কিন্তু সারা ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যে খুব বেশী করে’ খাটে, তাতে আর ভুল নেই। আমরা জাতি হিসেবে একেবারে সনাতন নাবালক। নিজের মাথা ঘামিয়ে ভাবতে হলে আমাদের মাথা ঘুরে যায়, নিজের হাত-পা বার করে’ কাজ করতে হলে আমাদের হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে যায়। সব কাজেই ওস্তাদ, গুরু বা নেতা না ধরলে আর আমাদের চলে না। ছেলেবেলায় সেই যে গুরুমশাই আমাদের মাথার উপর বেত ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করতে হুকুম দেন, সে হুকুম আমরা আজীবন তামিল করতে থাকি। চিরকালই আমাদের মাথার উপর সামাজিক, না-হয় পারিবারিক, না-হয় রাজনৈতিক, না-হয় আধ্যাত্মিক গুরুমশাই বেত ঘোরাতে থাকেন আর আমরা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তাঁদের শেখান পড়া মুখস্থ করে’ যাই। নিজের চোখ-কান দিয়ে দেখতে শুনতে আমাদের ভয় হয়, পাছে গুরুমশায়েরা যা বলে’ দিয়েছেন, তার উল্টো কিছু দেখতে শুনতে পাই, বাঁধা রাস্তা ছেড়ে আমরা একপা-ও চলিনে, পাছে ওস্তাদের কথা না শুনে জঙ্গলে হারিয়ে যাই।

আমাদের এ কর্ত্তাভজার দেশে কর্ত্তা ছাড়া আমাদের একদিনও কাটে না। সব কাজেই কর্ত্তার কাছা ধরে’ গুটি গুটি চলতে পারলেই আমাদের মনটা বেশ নিশ্চিন্ত থাকে, পরের কাঁধে ভর দিতে পারলেই আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। পঞ্চাশ বছরের বুড়ো তাঁর নাতনীর বয়সী একটি মেয়ের পাণিগ্রহণ করে’ ঘরে নিয়ে এলেন – তাঁর বুড়ি মায়ের হুকুম! বিদেশে গেলে জাত যাবে – সমাজের হুকুম! খেতে পাও না-পাও, জমীদারের ছেলে এসেচেন, নজর দাও – জমীদারের হুকুম! চোদ্দ-পুরুষে তোমার সঙ্গে যার কোনো বিরোধ নেই, লাঠি ঘাড়ে করে’ তাকে মারতে ছোট – রাজার হুকুম! গুরুপত্নীকে একখানা বেনারসী শাড়ি কিনে দিয়ে পরকালের একটা ব্যবস্থা কর – খোদ গুরুদেবের হুকুম! চারিদিকে শুধু হুকুম আর হুকুম!

অপর দেশের লোকে হুকুম পেলেই আগে জিজ্ঞাসা করে – কেন? কিন্তু আমাদের দেশে সে-কথা জিজ্ঞাসা করতে যাওয়া ভীষণ বেয়াদবি। মুখটি খুলেছ কি তোমার জন্যে হয় ঐহিক না-হয় পারত্রিক নরকের বন্দোবস্ত। সমাজপতির কথার উপর কথা কইবার দুঃসাহস যদি কারো হয়, তো তার ধোপা-নাপিত বন্ধ, রাজার কথার উপর কথা কইলে পুলিশের ডাণ্ডা, আর গুরুজীর উপর কথা কইলে রৌরব নরক। কাজেকাজেই ছেলেবেলা থেকেই ভয়ে ডরে আমাদের আত্মাপুরুষ দেহ-পিঞ্জরে নিতান্ত আড়ষ্ট হয়েই দিন কাটান, কবে এই ভব-কারাগার থেকে তাঁর ছুটি হবে, এই ভাবনায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকেন। সংসারটা যে দুঃখময়, এ তত্ত্বকথা তাই সব দেশের লোকের চেয়ে আমাদের দেশের লোকই এত ভাল করে’ বুঝেছে। আর ভাবগ্রাহী জনার্দ্দনও আমাদের অন্তরের ভাবের দিকে চেয়ে আমাদের ঘাড়ে দুঃখের উপর দুঃখ চাপাচ্ছেন।

আমাদের লেখাপড়া শেখা মানে কতকগুলো পরের ভাবা কথা মুখস্থ করা, আমাদের সামাজিক হওয়া মানে কতকগুলো বাঁধাধরা বিধিনিষেধ মানা, আমাদের ধার্ম্মিক হওয়া মানে পরের ভিতর ভগবানকে খোঁজা, আমাদের দেশ-হিতৈষিতার মানে পরের কথামত চোখবুজে চেঁচান। সন্ন্যাসীর কর্ম্মত্যাগ উচিত কেন? – শঙ্করাচার্য্য বলে’ গেছেন বলে’। কর্ম্মত্যাগ করা উচিত নয় কেন? – বিবেকানন্দ বলে’ গেছেন বলে’। মা-বাপের শ্রাদ্ধ করতে হবে কেন? – মনু, যাজ্ঞবল্ক্য বলে’ গেছেন বলে’। আর করতে হবে না কেন? – মিল, বেন্থাম বলেননি বলে’। ইংরেজী শিক্ষা ভাল – যেহেতু রবিঠাকুর তা বলেছেন; আর ইংরেজী শিক্ষা মন্দ – যেহেতু গান্ধী মহারাজ তা বলেছেন।

এই যে পরমুখাপেক্ষিতা, এই যে নিজের উপর অবিশ্বাস, এ একেবারে আমাদের হাড়মাসের সঙ্গে জড়ান। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হলে আমাদের যেন মাথায় বজ্রপাত হয়। এ যে শুধু সাধারণ লোকের মনোভাব তা নয়, যাঁরা দেশের স্বাধীনতা চান, তাঁদেরও অবস্থা এর চেয়ে বড় বেশী আশাপ্রদ নয়। গত দু’ মাসের মধ্যে অন্ততঃ এক শ’ কলেজের ছেলেকে বলতে শুনেছি যে, ৩১এ ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের স্বরাজ হবে, কেননা দেশের নেতারা তা বলেছেন। যাঁরা আত্মাকে নিত্যমুক্ত, সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বশক্তিমান বলে’ বিশ্বাস করেন, তাঁরাও ঐ পরের মুখের দিকে চেয়ে বসে’ আছেন। আজ যদি কোনো জটাজুটধারী মহাপুরুষ হিমালয় থেকে নেমে এসে বলেন যে, তিনমাস উর্দ্ধমুখ হয়ে হাঁ করে’ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হবে, তা’হলে এই কলকাতার মধ্যে তাঁর দশ হাজার চেলা জুটতে তিন দিনও দেরী হবে না!

আসল কথা হচ্ছে চারিদিকের পেষণে আমাদের মনগুলো একেবারে অসাড়, পঙ্গু হয়ে গেছে! মনকে সতেজ করে’ এই চিরকেলে নাবালকত্ব না ঘোচাতে পারলে আমাদের ইহকালেও মুক্তি নেই, পরকালেও মুক্তি নেই। সব কথা ছেড়ে এই কথাটা আমাদের আজ শিখতে হবে যে, দাস হয়ে যে থাকতে চায়, ভগবানও তাকে মুক্ত করতে পারেন না।

(১৩২৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীন মানুষ’ গ্রন্থের অংশবিশেষ)

Developed by DXDasia