রোহিঙ্গা বিতর্কের মিয়ানমার থেকে একদা ফিরত না বাঙালিরা

সেই রেঙ্গুন, সেই বাঙালি, আজকের রোহিঙ্গারা

একটা সময় ছিল যখন মিয়ানমার বলতেই বোঝাত সুচির গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন। আর এখন, মিয়ানমার বলতে বোঝায় শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত সু চির নির্দয় আচরণ রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, হত্য করা হচ্ছে। ৬০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি বৌদ্ধ সংখ্যাগুরুদের এই নিপীড়নে নিন্দিত হচ্ছে সু চির দেশ। কিন্তু সু চি নির্বিকার। ইতিমধ্যেই হস্তক্ষেপ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। সু চির কাছে সুশাসনের আবেদন জানিয়েছেন আর নোবেল প্রাপ্ত, মালালা ইউসুফজাই। কিন্তু এটা একদা বর্মা, রেঙ্গুন, বর্তমানের মিয়ানমারের সংস্কৃতি নয়। একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ছেলেরা রেঙ্গুন গেলে  আর ফিরত না। এই না ফেরা নিয়ে রচনা করা হত বিচ্ছেদের গানও।

বাংলার লোকগানের দুর্লভ সমাজভিত্তিক গান- প্রকাশ করে মা-ছেলের বিচ্ছেদ বেদনার আর্তিপ্রকাশ করে মা-

প্রায় গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত ছিল ‘রঙ্গুম-রঙ্গিলা’-র কথা। লোকে বলত বহতা কর্ণফুলীর স্রোতে মিশে থাকে বাংলার মা বোনের রঙ্গুমি কষ্ট। বিষয়টা আসলে কী?

গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাটের গানে রয়ে গিয়েছে মা-বোনের জীবনের কথা ও গাঁথা। রয়ে গিয়েছে আর্তি। স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষার গল্প। যে সব গল্পের প্রত্যেকটি শব্দ মর্মস্পর্শী। আবার কোনও গানে বিচ্ছেদের করুণ সুর। এমনই এক ধরনের মেঠো গানের বিষয় হল ‘রঙ্গুম’। মায় প্রায় গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত ছিল ‘রঙ্গুম-রঙ্গিলা’-র কথা। লোকে বলত বহতা কর্ণফুলীর স্রোতে মিশে থাকে বাংলার মা বোনের রঙ্গুমি কষ্ট। বিষয়টা আসলে কী?

তখন পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলা। বাংলার ছেলেরা নানা জাতীয় জিনিসের ব্যবসার তাগিদে তখন পাড়ি দিচ্ছে বার্মা-রেঙ্গুন দেশে। আজকে যে দেশের নাম মায়ানমার। আমরা জানি বার্মা-রেঙ্গুন যাওয়ার গল্প লিখে গিয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও। এই রেঙ্গুনকেই বাংলার মা-বোনেরা বলতেন ‘রঙ্গুম’। তাঁদের কাছে রঙ্গুম মানেই হল রহস্যে মোড়া এক রঙিন দেশ। যে দেশে বাংলার ছেলেরা একবার গেলে আর ঘরে ফেরে না। ঘরের ছেলে যাতে ‘রঙ্গুম’ না যায় তাই তাঁরা থানে মানত করতেন আর সঙ্গে ব্রত পালন করতেন। তাঁদের মনে থাকত চাপা ভয়। তাঁরা জানতেন ওই দেশের মেয়েরা জাদু জানে, ঠোঁটের ডগায় ফুল নিয়ে, চোখের ইশারায় বাংলার ছেলেদের ঘায়েল করে। তাই ছেলে আর ঘরে ফেরে না। এই কারণেই মায়ের আকুতি থাকত ছেলের কাছে। ছেলেকে মা বলতেন বা অঙ্গীকার করতেন ভালো হালের গরু দেবেন, সুন্দরী কন্যার সাথে বিয়ে দেবেন, সব করবেন। কিন্তু ছেলে যেন ‘রঙ্গিলা’-র দেশে না যায়।

এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল রঙ্গুম রঙ্গিলার গান। বাংলার লোকগানের বিস্তৃত তালিকায় এই গান নেই। ভাটিয়ালি, জারি, সারি, বাউল, বিচ্ছেদির তালিকায় এ গান স্থান পায় না। কিন্তু কেউ কেউ গাইতেন এই দুর্লভ সমাজভিত্তিক গান। তাঁদেরই একজন অনামা মহম্মদ হারুন। যাঁর সাল ঠিকুজি অধরা। তিরিশের দশকে এমন একটি দুর্লভ গান  মহম্মদ হারুনের কণ্ঠে ধরা হয়েছিল এইচ.এম.ভি-র রেকর্ডে। ৭৮ ঘূর্ণনেরই রেকর্ড এটি। কিন্তু আকারে ছোট। আর লেবেলের রং কমলা। রেকর্ডের গানটি এক কথায় সমাজের এক বিশেষ দলিল। বলতে গেলে, মা আর পুতের বিচ্ছেদ বেদনার আর্তি এই গান।

Developed by DXDasia