ঋত্বিক ঘটক: যন্ত্রণার স্বরলিপি

ছিন্নমূলের আত্মানুসন্ধান ঋত্বিককে তাড়িয়ে বেরিয়েছে

আমাদের নতুন বাড়ি, আমাদের ভাঙা পরিত্যক্ত প্লেনের রাজ্য, আমাদের এসব নিয়ে ভাবনা বুনতে গেলে সিনেমা সম্পর্কে আমার মতন ক-অক্ষরদের সম্বল শুধুই অনুভূতির বর্ণমালা। 'পথের পাঁচালী'-র সর্বজয়া করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকারে জানা যায় 'কত অজানারে' বলে একটি সিনেমার কথা, যার রিল নিজে হাতে নষ্ট করে ফেলেন ঋত্বিক। এই যন্ত্রণার শরিক হতে গেলে সিনেমার কারিগরী জ্ঞান লাগে না, তথাকথিত সিনেফাইল ও হতে হয়না, শুধু শিল্পীর অন্তরে একবার ঘাই মারতে হয় সন্ধানী মাছের মতন, যেখানে সময়ের ক্ষতচিহ্ন জমা হয়।

চারের দশক বঙ্গজীবনে এমন এক সময়, যার ঐতিহাসিকতা আমাদের ঋজু হতে শেখায়। বাঙালি তার সামন্ততান্ত্রিক রঙিন দুনিয়ার বাইরের এক জগৎকে চিনছে তখন। কলকাতা শহরে জুড়িগাড়ির দিন ফুরিয়ে গেল, রাস্তার ধারে শুধুই দুর্ভিক্ষের ফসল, কঙ্কাল জমা হচ্ছে সর্বত্র! বিজন ভট্টাচার্য 'নবান্ন' লিখেছিলেন এইসময়ের সমস্ত ক্লেদ এবং গ্লানিকে প্রত্যক্ষ করতে করতেই। তিনি বর্ণনা করেছিলেন অফিস যাওয়ার সময় কীভাবে দেখতে পেতেন কলকাতার মন্বন্তরকে। তৃপ্তি মিত্র বলেছিলেন কীভাবে তিনি মাকে শিশুর থেকে খাবার কেড়ে খেতে দেখেছেন। সলিল চৌধুরী বলেছেন পাঁচঘড়াতে নাইট স্কুলে পড়াতে গিয়ে স্তুপীকৃত কঙ্কাল দেখার কথা। সোমনাথ লাহিড়ীর লেখায় সেই মৃত্যুমুখী সময়ের জ্যান্ত ছবি উঠে আসে । সংবেদনশীল মন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। রক্তাক্ত হচ্ছিল। বিশ্বযুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে তখন কমিউনিজম অনেকের কাছেই আলোর দিশারী। এদেশেও প্রথমে 'ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ' ও পরে গণনাট্য সংঘ যখন তৈরি হল তখন শিল্পীরা কোথাও যেন দেখতে পাচ্ছিলেন আলো। এপ্রসঙ্গে বলা উচিত শিল্পীরা সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ, এই নোশন তখন রীতিমত চর্চিত। প্লেখানভ তার 'আর্ট অ্যান্ড সোশ্যাল লাইফ' বইতে বলেছিলেন কলাকৈবল্যবাদ আসলে এক সার্বিক নিরাশার ফল। শিল্পী এবং শিল্পের গ্রহীতা উভয়েই যখন সমাজে কোনো আশা করার মতন বিষয় খুঁজে পাননা, তখন বিশেষ কোনো রাজনৈতিক আদর্শই পারে দিকনির্দেশ করতে। লেনিনও বারংবার বলেছেন পার্টিজান সাহিত্যের কথা। ফ্লোবেয়রের সাহিত্যে পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ে হতাশা আছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা নেই- লুকাচ বলেছিলেন। ফলত সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার পক্ষে সওয়াল করা শুরু হল। ১৯৩৪ এ সোভিয়েতের পার্টি কংগ্রেসে গোর্কি বলেন সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার কথা। বাংলার শিল্পীরাও এই দশকে তাদের শিল্পের অভিমুখ তৈরি করছিলেন সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই। কিন্তু খুব শিগগিরি শিল্পীরা একথাও উপলব্ধি করেছিলেন যে শুধুই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে মাপকাঠি করে ভালো শিল্প তৈরি করা যায়না। এ প্রসঙ্গে রজার গারোদি এবং লুকাচের বিখ্যাত তর্কাতর্কি মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে।

সতীনাথ ভাদুড়ী বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার কোনো ছকে ফেলা যাবে কি? ঋত্বিক নিজেই বলেছেন মানিকের লেখনী 'একটা তীক্ষ্ণতম ব্যাপার'। সেই তীক্ষ্ণতাকে কোনো সূত্রে বেঁধে ফেলা দুষ্কর। ঋত্বিক নিজেও তীক্ষ্ণ। আইজেনস্টাইনের 'স্ট্রাইক', 'ব্যাটলশিপ পোটেমকিন' দেখে তিনি সিনেমা বানাতে উৎসাহী হয়েছেন, সোভিয়েতের শিল্পের বাস্তবতা তাকে আকর্ষণ করেছে। কিন্তু 'সুবর্ণরেখা'-তে যে প্রত্যয় নিয়ে বিনু হেঁটে যায় নতুন বাড়ির দিকে ঈশ্বরের হাত ধরে, যে রাগ নিয়ে 'কোমল গান্ধার'-এ দোহাই আলিতে মুখর ট্রেন ছুটে চলে তা শুধুই বিপ্লবী বাস্তবতা? না কি ভেতরের যন্ত্রণার অনিবার্য আছড়ে পড়া।

ডি সিকার 'বাইসাইকেল থিভস' দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সত্যজিৎ। আমার সিনেমা দেখার অপটু মনন বারবার প্রশ্ন করেছে 'পথের পাঁচালী'-র শেষে অপুরা নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে রওনা দেয় যখন, তখন যে বাস্তুসাপ বেরিয়ে আসে তাদের ঘর থেকে, সেই বাস্তুসাপ কি জানত বিনুর নতুন বাড়ির খোঁজ? ছিন্নমূলের আত্মানুসন্ধান ঋত্বিককে তাড়িয়ে বেরিয়েছে। চারের দশকের ওই ক্রান্তিকালে আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গে তিনিও যে দায় কাঁধে নিয়েছিলেন তাকে আমৃত্যু ঝেড়ে ফেলতে পারেন নি। অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা যে আঘাত দিয়েছিল তাকে সম্বল করেই ঋত্বিক অতীতের দিকে চেয়েছেন। মার্কস তার গ্রিকশিল্প সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে পুরাণ, রিচুয়াল প্রভৃতির গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন। ফ্রয়েড, ইয়ুং পুরাণের মধ্যে মানবীয় আকাঙ্খা খুঁজেছিলেন। সলিলের গানে এক মলিন মেয়ে বলে ওঠেন, "আমি তো চাহিনি কিছুই, শুধু আপন নীড়ের ছায়া"; ব্যাক্তিক আকাঙ্খার এই ধূসর স্বর কি নীতা বা সীতা বা অনুসূয়ার মতন নারীদের লড়াইয়ের, হেরে যাওয়ার মূলে নেই? আকাঙ্খা ছাড়া আর কি ই বা আছে এদেশের নিঃসহায় মানুষের?

"আমার বক্তব্য হচ্ছে যে হাজার বছর ধরে আমার চাষি বসে আছে। আর তোমরা নেচেকুঁদে যাচ্ছ। সকলে নচ্ছার"- এই পবিত্র রাগ বেঁচে থাকে ঋত্বিকের অন্তরে। ঋত্বিক ঘটকের ছোটগল্প যারা পড়েছেন তারা জানেন, কি অদ্ভুত প্যাথোলজিকালি পাঠককে কষ্ট পাওয়ায় সেই গল্প। এই রাগ, পাঠক এবং দর্শকের কাছে এই চিৎকার পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঋত্বিক তার প্রয়োজনীয় ঔদ্ধত্য নিয়ে চিরকাল মেরুদন্ড সোজা রেখে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাসে বোমা হয়ে ওঠে হারবার্টের শরীর। হারবার্ট, যে মৃতের সহিত কথোপকথন চালাত এই অতিজীবিতের সংসারে, বিনু তাকে শেষমেষ এই অসভ্য পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়ার অস্ত্র তুলে দেয়। ঋত্বিক জানতেন তার বিনু এতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে? জানতেন হয়তো, অগোচরে।

ঋত্বিক রবীন্দ্রনাথের 'চতুরঙ্গ' নিয়ে সিনেমা বানাতে উৎসাহী ছিলেন। চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। বিষ্ণু দে নিজে সাহায্য করছিলেন তাকে। সেই সিনেমা শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। এই সম্ভাবনা নিয়ে আমার আফসোস থেকে যায় এই কারণেই যে ঋত্বিক কীভাবে পাঠ করতেন ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের এমন জটিল সমীকরণকে, রেনেসাঁর সংকটকে, আধ্যাত্মিক সংশয়ের আখ্যানকে। ঋত্বিক কে আমরা একমাত্রিক পাঠের আওতায় ফেলে দিয়েছি অনেকক্ষেত্রেই। ঋত্বিকের ভাবনা নিয়ে চর্চার অন্যতর আঙ্গিক আবিষ্কৃত হবে নিশ্চয় পরবর্তীতে, তার সমসময় বেঁচে থাকবে বহু উপেক্ষার গ্লানি নিয়ে।

Developed by DXDasia