
রাঁচি, পুণা, দিল্লি যেখানেই থাকুন ঋত্বিকের অস্থিতিশীল জীবনে চিঠি লেখা কখনো বন্ধ হয়নি
ঋত্বিক তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘লক্ষ্মী’ নামে। কখনও — ‘ডাস ক্যাপিটাল’। এইসব নামেই চিঠি আসত কলকাতা, রাঁচি, পুণা, দিল্লি যেখানেই থাকুন, তাঁর অস্থিতিশীল জীবনে চিঠি লেখা কখনো বন্ধ হয়নি। প্রবল অর্থাভাবের মধ্যেও সুস্থ সুন্দর জীবন গড়ে তোলার হাজারো স্বপ্ন ও সুযোগ খুঁজে বেরিয়েছেন জীবনভর। এরই মাঝে প্রেম, বিবাহ অভিমান ঝগড়া ভালোবাসা সবই হৃদয়ের অন্তর্যোগে অকপটে প্রকাশ করেছেন একে অপরের কাছে। কিন্তু যে বিষয়টা সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং বিরল তা হল মানুষের কথা, সকলের কথা, জীবনের কথা। যে বিশ্বে মানুষ একবার প্রেমে পড়লে বহির্বিশ্বে তাকাবার ফুরসৎ পান না, একাকী নির্জনতা ডুব দিয়ে অপর সমস্থানিক মানুষটির আদত নাগাল পেতে চান; সেখানে ঋত্বিক প্রেমকাব্য সম্পূর্ণ উল্টো ধারার।
মানুষকে ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে জীবনের সারসত্য প্রেম আলিঙ্গন করবার যে আনন্দ তা তাঁর আদরের লক্ষ্মী জানতেন। তাই হয়তো চারিদিকের এতো হতাশার মধ্যেও একটি আপাতমস্তক অগোছালো উত্তাল জীবনকে সরল বিশ্বাসে আপনার বলে মেনে নিয়েছিলেন। আর এই মেনে নেওয়াটাই ঋত্বিকের কপালে বিপুল সৌভাগ্যের — ‘তোমাকে পাওয়াটা বড়ো ভীষণ ব্যাপার হয়ে গেছে আমার জীবনে। আমি এবার নিশ্চিত। আমি আর কিছু চাই না। নিজেকে বড় পূর্ণ লাগে যখন ভাবি, আমার চিন্তার সাথী একজন আছে, যে আমার সবচেয়ে উদ্ভট সবচেয়ে আজগুবী মনোভাবকেও পরম স্নেহের আলো দিয়ে বুঝতে পারে।’ অর্থাৎ এমন একজন মানুষ যার কাছে নির্দ্বিধায় মেলে দেওয়া যায় নিজেকে, মনের ভিতরকার আবেগ উচ্ছ্বাস অর্থহীন নিভে যায় না, যাকে ভালোবেসে জীবনের সব ধকল আনন্দময় হয়ে যায় — সুরমা তাই। নদীর মতো। ছায়ার মতো।
সাল ১৯৫৫, ‘ওঁরাও’ এর কাজ শেষ হয়েছে। রাঁচি থেকে প্রায় আড়াইশো মাইল পথের ক্লান্তি। হঠাৎ পায়ের ব্যথায় ভয়ানক জ্বরে পড়লেন। এমন অবস্থায় তাঁর সবচেয়ে চিন্তার ও অভিমানের বিষয় যা তা হল সুরমা দেবীর না লেখা চিঠি।
— ‘রাঁচিতে তো তুমি চিঠি দিলে না।
… এখানে কাজ আমার খুব ভালো হয়েছে। যদিও এমন তাড়াহুড়োতে ব্যাপারটির প্রতি প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধা দেখানো সম্ভব হয়নি, এবং যে বিপুল ঐশ্বর্যভাণ্ডারের মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম, তার সামান্যটুকুতেই তৃপ্ত থাকতে হল, তবু এদের দরকারের দিক থেকে এবং কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের দিক স্ট্যান্ডার্ড-এর দিক থেকে একেবারে প্রথম শ্রেণীর কাজ করা গেছে। এদের প্রাণের এইটুকু গভীরেও এঁরা এর আগে ঢোকেননি। কাজেই ছবিটি সম্মান পেতে বাধ্য। আনন্দদানের দিক থেকেও প্রচুর সম্পদ আছে। তোমাকে ফিরে গিয়ে বলব, এদের সব অপূর্ব নাচের কথা। আর কি সুন্দর এদের ছেলেমেয়েরা।
এখানে মানুষের ছোঁয়াচ পেলাম প্রতিপদে। কত টুকরো ঘটনা যে ঘটে যায়, কত-পলকপাতের মধ্যে মনে গভীর রেখাপাত করে যায় এক-একটা মানুষ। কত বিত্তশালী মনে হয় নিজের দেশকে। মানুষের সম্পদে ধনী।
আপাততঃ এদের স্বাদ আমার অর্ধেক হয়ে আছে, কলকাতায় ফিরে তোমার সঙ্গে মিলে পুরো স্বাদ পাওয়া যাবে। এখন যে কথাটা বলার, হঠাৎ ভীষণ মন কেমন করতে আরম্ভ করল একা হোটেলে শুয়ে শুয়ে। আর সবাই একটু ফাঁক পেয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে। আমারও জ্বর অল্প অল্প সারছে। দূরে ত্রিকূট পাহাড় দেখা যাচ্ছে, ফাঁকা আন্দোলায়িত মাঠের ওপরে দামাল হাওয়া লাল-মহুয়া আর পলাশ গাছগুলোকে নেড়ে দিয়ে যাচ্ছে। আর হাওয়ায় ভেসে ভেসে যাচ্ছে খয়েরী হলুদ পাতা। আজ প্রথম বসন্তের হাওয়া দিচ্ছে হঠাৎ। আমার মনও কি এ এক টানে আকুল হয়ে উঠেছে…।’
সুরমা শিলং এর মেয়ে, ডাকনাম লক্ষ্মী। সেখানেই কেটেছে তাঁর যৌবন। মা’কে হারিয়েছেন শৈশবেই। শিলংয়ের রিলরং-এ তিনতলা বাড়ি তৈরি করেছিলেন তাঁর বাবা কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য। মা সুপ্রীতি দেবী। বাবার কাছ থেকেই তাঁর প্রথম আবৃত্তি ও সাহিত্যের হাতেখড়ি আর মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন দেশাত্মবোধ। মা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার পর মামাবাড়ি সিলেট থেকে ফিরে আসেন শিলং-এ। ভর্তি হন লেডি বিন কলেজে । এবং পরে ‘৪৯ এ জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। বাবার তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজের সহযোগিতায় ধরা পড়ে যান সাল ’৪৯-এ । তারপর দু’বছর জেলবন্দী থাকার পর চলে আসে কলকাতায়।
এইসময় ঋত্বিক ছিলেন আই.পি.টি.এর লেফট্ উইং মেম্বার। একদিকে তাঁর প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ রিলিজ না হওয়ার হতাশা। আরেকদিকে জীবনের অস্থিতিশীল অবস্থা, চারপাশ থেকে যেন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে তাঁকে। সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করবেন সে সম্ভাবনার লেশমাত্র উদ্দামতা নেই। মহানগরীর কংক্রিটে তপ্ত শলাকার মত আবদ্ধ, স্থিত। ঠিক এমন সময়ে জীবনের বিপরীতক্রমে যাকে পেলেন, তিনি সুরমা ভট্টাচার্য।
সাধনা রায়চৌধুরীর সূত্র ধরে দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ কফিহাউসের টেবিলে। শুরু হল তাদের মিঠে—কড়া সম্পর্কের অধ্যায়। জীবন ও রাজনীতির মধ্যে মন্দ্রমুগ্ধ কেটে যাচ্ছে প্রেম জ্ঞাপনের দিন। অন্ধকার দূরীভূত হয়ে একটু একটু আলো এসে পড়ছে স্বপ্নের মণিকোঠায়। অচিরেই প্রকাশমান তার দীপ্তিময় আলো। তারা নিজেরাই ঠিক করলেন বিবাহের দিন।
সুরমা দেবীর পিতা কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যকে লিখছেন ঋত্বিকের মাতা ইন্দুবালা দেবী —
গতকাল মহাশয়ের ২.৪.১৯৫৫ তারিখের চিঠি পাইয়া খুব আপ্যায়িত হইলাম। আমরা সিলেট থাকাকালীন আপনি ছাত্র ছিলেন এই সব কথায় পূর্বের অনেক স্মৃতিই মনে পড়িল ।… আমার ছেলের সাথে আপনার কন্যার বিবাহের প্রস্তাবে আমার তো আনন্দিত হওয়াই উচিত । কিন্তু যেখানে আপনি কন্যা দিবেন তাদের সমস্ত অবস্থাটা জেনে অগ্রসর হওয়া ভালো।
ঋত্বিক কনিষ্ঠ, এর উপরে আমার আরও চারটি পুত্র আছে: মণীশ চন্দ্র, সুধীশ চন্দ্র, আশীষ চন্দ্র, লোকেশ চন্দ্র … উপস্থিত ঋত্বিকের কোন স্থায়ী চাকরি নাই, সংসারে প্রবেশ করতে গেলেই অর্থের আবশ্যক অনিবার্য। এই কন্যা এবং পুত্র এরা নিজেরাই বিবাহ ঠিক করেছে সেতো আনন্দেরই কথা, শুধু নিজেদের অবস্থা সম্বন্ধে এরা কতখানি সচেতন তা জানি না । আপনার একটিমাত্র কন্যা এবং আজ আপনার স্ত্রী বেঁচে নাই এই জন্য আমাকে এইসব কথা বলিতে হইল।’
৮ই মে, ১৯৫৫ বিবাহের দিন স্থির হল। বিবাহের কিছুদিন পরেই বম্বে ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে শুরু হল তাঁর জীবনের আরেক পর্ব। তারপর অনেক ভুল ত্রুটি অভাব দারিদ্র সত্ত্বেও যে জিনিসটার একতিল অভাব ছিল না, তা হল — লক্ষ্মীর প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা। সম্মান। এবং প্রেম।

ঋত্বিক-সুরমার বাসি বিয়ের ছবি
ঋত্বিক তাঁর চিঠিগুলোতে তাঁদের সম্পর্ককে চির অমলিন রেখে গেছেন। জানিয়ে গেছেন কত কত ভালোবাসা। আবেগ৷ প্রতিশ্রুতি। যার প্রতিটি অক্ষর আজও কী জীবন্ত!
বিবাহের একমাস আগে লিখছেন (১৩.৪.১৯৫৫/ কলকাতা) —
‘….কর্ণ জন্মেছিলেন সহজাত কবচকুণ্ডল নিয়ে, তুমি জন্মেছ সহজাত শুচিতা নিয়ে। ঝর্ণার ধারা যেখান দিয়ে বয়, সব ক্লেদ ধুয়ে নিয়ে যায়, তাই বলে কি সেই ধূসরতার এতটুকু তার নিজের গায়ে লাগে? তোমাকে flatter করতে আমার বয়ে গেছে, কিন্তু আমি যে বারবার লক্ষ্য করেছি, তোমার শুভ্র চরিত্রের স্নিগ্ধতা নিয়ে বহু ক্লেদের মধ্যে দিয়ে — তুমি পার হয়ে যাচ্ছ, অথচ কোনো ইনহাবিটেশন নেই, কোনো সংস্কার নেই। অসীম এক আস্থা সব-কিছুর ওপর আরোপ করে সব-কিছুকে দায়িত্বশীল করে তোলা তোমার স্বভাব এর আসল রহস্য। তুমি মানুষটি শরৎকালের মত। চিরকালের শিশু অথচ চিরগভীর।
… প্রকৃতির প্রতি আমার মনোভাব বদলে যাচ্ছে। আগে উপলব্ধি করার দিকে গভীর অনুভবের দিকে মন ঝুঁকত, এখন খালি আহরণ করার দিকে হয়েছে ঝোঁক। তাইতো ঘুরলাম অনবদ্য প্রকৃতির মাঝখানটিতে। কিন্তু খালি জমাবার দিকে টান এবার আমার, যাতে করে জমিয়ে নিয়ে আর-সবার কাছে তুলে ধরতে পারি, তাই ভেবে মৌমাছির মতো পুঁজি করার চেষ্টা, জানি না এটা ভালো কিনা। কিন্তু শুধু উপলব্ধিতে আর প্রাপ্তি নেই, একটা জিজ্ঞাসা, একটা সন্ধিৎসা আমার খালি নুড়ি কুড়োবার মনোবৃত্তিতে পৌঁছে দিচ্ছে।
….তোমার পাইনবনের মধ্যে দিয়ে সাঁ সাঁ করে হাওয়া বয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি, অনেক স্বাদ, অনেক অনুভূতি। … শিলং-এ গিয়ে দু-তিনটি দিন যেন সুধায় ভরে থাকে। যেন আমার প্রথম শিলং দেখা, মায়ের শিলং দেখা, তোমার শিলং দেখা — একেবারে অদ্ভুত আনন্দরসে ভর্তি হয়ে সারাজীবন গানের প্রথম কলির মত ঘুরে ঘুরে সামনে টেনে আনে আমার ভালোবাসার আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়াকে।
আজ দোল। ঘরে চুপ করে বসে আছি। এবার দোল আমার এমন করেই কেটে গেল। এবার শুধু আমার হাতে থাকল বর্ষা। আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। তার দিকে চেয়ে বসে থাকা।

সপরিবারে
২৬.৪. ১৯৫৫ — তোমার চিঠিতে ওখানকার প্রাকৃতিক বর্ণনা দাও না কেন? আরো বড়ো করে দাও। তাই নিয়ে ঝগড়া করি বটে, কিন্তু খারাপ লাগে না পড়তে। আর তোমার মনের ছোঁয়া তার থেকেই পাই। আশ্চর্য জেনো, সাংসারিক হিসেবের আর দৈনন্দিন চিন্তার কথা যখন লেখ তুমি, তখন জমে জমে না। যখনই তুমি অবান্তর কথায় চলে যাও তোমার মনটা তখন বেরিয়ে আসতে থাকে। তোমার এই ডেপথ-কে আরও বাড়াতে হবে, নইলে মুক্তিকামী মানুষদের পুরো কাজে তুমি আসবে না।
কলকাতার মধ্যেই শান্তির নীড় গড়া যায়, এ বিষয়ে আমি একমত। তার জন্য দরকার ইকোনমিক স্টেবিলিটি। সেটা যতদিন না গড়া যায়, ততদিন কিন্তু বড়ো কম হবে।
৫.৫. ১৯৫৫ — এমন বাঁদরের গলায় শেষে মুক্তোর মালা পড়ল, অশেষ দুর্গতি করে ছাড়বে মেয়েটার। উদ্বেগ ও আর আশঙ্কা, সিকিউরিটি নেই তো জীবনে কোনো। যা ধারণ করে থাকে তাই যদি ধর্ম হয় তবে তুমি আমার ধর্ম। ভালোবাসতে হলে চাই ক্লাসিকাল আপ্রৌচ, নীরবে ভালোবাসার সাধনা করা — সে করা কি কোনোদিন হয়ে উঠবে নিকট ভবিষ্যতে!
‘নাগরিক’-এ একটা ডায়লগ লিখেছিলাম। নায়ক নায়িকাকে বলছে, ‘ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরে কালো দীঘিতে অবগাহন করার মত শান্তি তোমার সান্নিধ্যে।’ সীনটা এখন বই-এ নেই। যখন লিখেছিলাম কল্পনায় কি তুমি ছিলে? — না; কারণ সে কল্পনা যে বাস্তবে এমন লিটারাল ট্রুথ হয়ে উঠবে, প্রতি পদক্ষেপে সত্তাকে নাড়া দেবে, অনুভূতি জাগাবে, তা বুঝিনি সেদিন। কমিউনিস্টদের কমিউনিজম চাওয়ার মত আর কি! কল্পনায় সত্যকে পেয়েছিলাম সেদিন। আজ বাস্তবে পাচ্ছি।
আমার শ্রীমতী,
ভালবাসা, ভালবাসা, প্রাণভরে ভালবাসা।
আর কিছু আপনাকে লেখার নেই।
নমস্কার মশায়।
আপনারই একমাত্র
ঋত্বিক।
পুণা, ২৪.৮.১৯৬৫
তথ্যঋণ —
রীণা চক্রবর্তী(ঋত্বিক ঘটকের দিদি সম্প্রীতি দেবীর মেয়ে)-র অপ্রকাশিত লেখা।
সুরমা ঘটক — ঋত্বিকঃ An autobiography of Ritwik
ঋত্বিকের লেখা চিঠি।
ছবি-ঋণঃ নবরূপা ভট্টাচার্য (সুরমা ঘটকের আত্মীয়)
