যেভাবে প্রজাতান্ত্রিক হল আমাদের দেশ

আজ ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবস

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ঘোষণা করা হয়েছে, এই দেশ একটি ‘সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’। ভারত সম্পূর্ণ স্বাধীন, বাইরের কোনো শক্তি এই দেশকে শাসন করে না, কারো অনুগত নয় আমাদের দেশ। সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার আমাদের দেশে প্রচলিত। গণতন্ত্রের ভিত্তি এখানে সুদৃঢ়। এদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই, সব ধর্মই রাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কিছু সমাজতান্ত্রিক আর্দশকে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা হয়েছে সংবিধানে। কোনো রাজা বা রানি বংশানুক্রমিকভাবে আমাদের দেশ শাসন করেন না। শাসন ব্যবস্থার সবথেকে উঁচু পদে আছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে এই পদ লাভ করেন না, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁকে নির্বাচন করেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এই কারণে ভারতকে বলা হয় ‘প্রজাতন্ত্র’। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি যোগ করা হয়েছে ১৯৭৬ সালে, ৪২তম সংশোধনের মাধ্যমে। পরে যোগ করা হলেও, শব্দগুলি সংবিধানের মূল দর্শনের বিরোধী তো নয়ই, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্বাধীনতার আগে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার আমাদের দেশে একটি ক্যাবিনেট মিশন পাঠায়। এই ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবেই গঠিত হয় গণপরিষদ। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, গণপরিষদের সদস্যসংখ্যা হবে ৩৮৯ জন। তার মধ্যে ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশগুলি থেকে ২৯২ জন আসবেন। সেই আসনগুলি ভাগ করা হয়েছিল সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে।

কঠোর সংগ্রাম করে আমাদের দেশ প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে। বহু মানুষের আত্মত্যাগ এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছে আমাদের। যে কোনো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সংবিধান দরকার।  ভারতের সংবিধান হল পৃথিবীর বৃহত্তম লিখিত সংবিধান। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মহান আদর্শ ও চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের সংবিধানে। এটির সৃষ্টি করেছে ভারতের গণপরিষদ। স্বাধীনতার আগে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার আমাদের দেশে একটি ক্যাবিনেট মিশন পাঠায়। এই ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবেই গঠিত হয় গণপরিষদ। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, গণপরিষদের সদস্যসংখ্যা হবে ৩৮৯ জন। তার মধ্যে ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশগুলি থেকে ২৯২ জন আসবেন। সেই আসনগুলি ভাগ করা হয়েছিল সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে। চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশগুলির থেকেও সদস্যদের আসার কথা ছিল। আর ঠিক হয়েছিল, দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে আসবেন অনধিক ৯৩ জন সদস্য। ১৯৪৬ সালের জুলাই-আগস্ট গণপরিষদের জন্য নির্বাচন হয়। ভোট দিয়েছিলেন প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যরা। দেশীয় রাজারাও তাঁদের প্রতিনিধি পাঠান। এরপর দেশভাগ হয়, জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এর ফলে ভারতীয় গণপরিষদের সদস্যসংখ্যাও কমে হয়ে যায় ৩০৮। ভারত তখন স্বাধীন, ফলে গণপরিষদও হয়ে উঠেছিল একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান।

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সালে ৯ ডিসেম্বর, নতুন দিল্লির ‘কনস্টিটিউশন হল’-এ। সচ্চিদানন্দ সিংহকে গণপরিষদে অস্থায়ী সভাপতি বা চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল প্রথমে, তারপর ১১ ডিসেম্বর পরিষদের স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৩ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু ভারতীয় সংবিধানের ‘উদ্দেশ্যসমূহ সংক্রান্ত প্রস্তাব’ উত্থাপন করেছিলেন, যেখানে ভারতকে ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রস্তাবগুলি অনুমোদিত হয় ২২ ডিসেম্বর।

ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ

খসড়া সংবিধান তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালের ২৯ আগস্ট তৈরি হয় একটি খসড়া কমিটি। ড. বিআর আম্বেদকর ছিলেন তার সভাপতি। সংবিধানের খসড়া তৈরি শেষ হয় ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। জনগণের মত নেওয়া জন্য সেই খসড়া দেশের সব প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে পেশ করা হল খসড়া সংবিধান। জনগণকেও মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই খসড়া নিয়ে প্রচুর সমালোচনা, প্রস্তাব, মন্তব্য, সুপারিশ এসেছিল, সেগুলির বিচার-বিবেচনার জন্য তৈরি হয়েছিল একটি কমিটি। অবশেষে চূড়ান্ত খসড়া পেশ করা হয় গণপরিষদে। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত হল। তাতে স্বাক্ষর করলেন গণপরিষদের সভাপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ অধিবেশন বসে। ওই অধিবেশনে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।

ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হল ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে। ওই তারিখটি প্রত্যেক বছর সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে সারা দেশে পালিত হয়। এখানে বলা দরকার, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলাকালীন ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সংবিধান রচনা ছাড়াও জাতীয় পতাকা গ্রহণ, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ – এরকম আরও বেশ কিছু কাজ করেছে আমাদের গণপরিষদ।

_____

প্রতিবেদন ও গবেষণা: শ্রেয়ণ

Developed by DXDasia