
যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়, ৬৫ সালেও ভাবছেন না।অথচ কিছু দিনের মধ্যেই স্কুল কলেজ পোড়ানো, লাইব্রেরি জ্বালানো সমর্থন করছেন চারুবাবু
যুক্তিটা হয়তো তত জোরালো নয়। তবু মিল একটা আছেই। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবর্ষে পকেট গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয়।পকেট গীতা তো সব বাড়িতেই থাকে। তার পর ক্লাস নাইন কী টেন-এ দেখলাম রেডবুক। তিনটি বইয়েরই প্রায় একই সাইজ। আসলে তিনটি বই-ই তো কারও না কারও কাছে ‘গীতা’।
এই তৃতীয় গীতা দিয়েই নকশালবাড়ির ৫০ বছরের হ্যাপি বার্থ ডে। নকশাল আন্দোলনের গোলডেন জুবিলি। বাঙালিকে রেডবুক পড়া শিখিয়েছেন চারু মজুমদার। এবং এখনও কলেজ স্ট্রিটে ৫০ টাকায় রেডবুক বিক্রি হয়। ৫০ বছর ধরে রেডবুকের এই টিকে থাকা কম কথা নয়।
এ এক অদ্ভুত মিল। একদা পরাধীন ভারতে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে দলে দলে ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা-পড়া ছেড়ে রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আবার দেখা গেল, স্বাধীন ভারতে একে বারে ভিন্ন মেরুর রাজনীতিবিদ চারু মজুমদারের ডাকে শত শত ছেলেমেয়ে লেখা পড়া ছেড়ে এসে ‘শহিদ’ হচ্ছে। প্রশ্ন জাগতেই পারে স্কুল কলেজের লেখাপড়া সম্পর্কে চারু মজুমদারে ধারণাটা ঠিক কী রকম ছিল। ১৯৬৫ সালে জেল থেকে চারু বাবুর স্ত্রী লীলা মজুমদারকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, তিনি এক জন সাধারণ বাবার মতোই সন্তানদের লেখা পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন, এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করলে খুশি হতেন। যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়, ৬৫ সালেও তিনি ভাবছেন না।অথচ কিছু দিনের মধ্যেই স্কুল কলেজ পোড়ানো, লাইব্রেরি জ্বালানো, পরীক্ষা ভন্ডুল তিনি সমর্থন করছেন। কেন এই পরিবর্তন, তার স্পষ্ট উত্তর মেলে না। চারু মজুমদার ক্যাডারদের বলতেন, লিখেওছিলেন, একটা খবরের কাগজ ভালো করে পড়লেই অনেকের সঙ্গে তর্ক করা যায়। বলতেন, রেডবুক পড়লেই কমিউনিস্ট হওয়া যায়।
ভারতের রাজনীতিতে একটা সশস্ত্র-ধারা বরাবরই ছিল। সেটা কখনও সেটা তিতুমির, কখনও সিপাই বিদ্রোহ, কখনও ক্ষুদিরাম-সূর্য্য সেন, কখনও, কখনও তেলেঙ্গানা কখনও চারু মজুমদার এবং এখন যেমন মাওবাদীরা। নকশালবাড়ি যখন ঘটছে তখনও গঙ্গার উপর ফরাক্কা ব্রিজ তৈরি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে চলছে যুক্তফ্রন্ট শাসন। বছর দুয়েক আগে গাইড সিনেমা রিলিজ করেছে। কিন্তু তখনও মুখে মুখে, পূজা প্যান্ডেলে ‘গাতা রহে মেরা দিল…’ শোনা যায়।
তখন লোকসভা আসন ছিল ৫২৩। তার মধ্যে ১৯৬২ সলে কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৫৮। আর ১৯৬৭ তে কংগ্রেসের আসন কমে হল ২৮৩। দেশে তখন ১৬টি রাজ্যের সব কটিতে কংগ্রেসের শাসন। সেই একচেটিয়া রাজত্ব ভেঙে পড়ল ১৯৬৭ সালে। অর্ধেক, মানে আটটি রাজ্যে কংগ্রেস পরাজিত। ১৯৬২ সালের শেষ থেকে ৬৪ সালের গোড়া পর্যন্ত দমদম সেন্ট্রাল জেলের কথা একটু বলে নেওয়া যাক। তখন চারু মজুমদার দমদম জেলে। ওই জেলে সে সময়ে আর যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন, মুজফফর আহমেদ, জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, মনোরঞ্জন রায়, গণেশ ঘোষের মতো নেতারা। নেতারা তখন জেলে রাজনীতির ক্লাস নিতেন। এক দিন এরকম এক ক্লাসে হরেকৃষ্ণ কোঙারকে চারু মজুমদার প্রশ্ন করে বসলেন, জমির অধিকার রক্ষার জন্য কৃষকদের সশস্ত্র করার ব্যাপারে পার্টি কী ভাবছে? কোঙার এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। সৌরেন বসুর লেখা বই থেকে এই তথ্য জানা যায়। তারপর জেল থেকে বেরিয়ে এক দিন শিলিগুড়ির পার্টি অফিসে ঢুকে চারু মজুমদার ডাঙ্গের ছবিটা দেওয়াল থেকে নামিয়ে লাথি মেরে ভেঙে ফেললেন। বললেন, শত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা না থাকলে বিপ্লবী হওয়া যায় না। ভোট বয়কটের নেতা চারু মজুমদার এক বার ভোটেও দাঁড়িয়েছিলেন। সেটা ১৯৬৩ সাল। শিলিগুড়ির বিধায়ক জগদীশ ভট্টাচার্য মারা গেলে ওই কেন্দ্রে সিপিআই চারু মজুমদারকে প্রার্থী করে। ভোট প্রচারেও চারুবাবু সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের কথাই বলেতেন। মাত্র ৩০০০ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। মানে জমানত জব্দ হয়েছিল। কিন্তু হেরে গিয়েও চারুবাবুর সমর্থনে শিলিগুড়িতে মিছিল হয়। চারুবাবু হেরে যাওয়ার ‘আনন্দে’ বলেছিলেন, যাক, এটা তো বোঝা গেল, তিন হাজার লোক সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে।
এটা ঠিক, নকশালবাড়ির আন্দোলন যে ভাবে জন্ম নিয়েছিল, সেটা ছিল ভাগচাষি বা বর্গাদার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কৃষকদের লড়াই। বিপ্লব চিন্তা থেকে ওই ঘটনা সেদিন নকশালবাড়িতে ঘটেনি। চারু মজুমদার ওই লড়াইকে বিপ্লবী যুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর মাথায় ছিল গণফৌজ, লং মার্চ, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা। তাঁর বিপ্লবী তত্ত্বের সমর্থনে শত শত মধ্যবিত্ত যুবক এগিয়ে এসেছিল। তাঁরা গ্রামে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতও ছিল। কোথাও কোথাও যুদ্ধ হয়েও ছিল। তবে তাতে ফল দেয়নি। পুলিশের বন্দুকের সামনে পিঁপড়ের মতো প্রাণ গেছে তাঁদের। একের পর এক গণহত্যা ঘটিয়ে শেষ করা হয়েছিল ওই বিদ্রোহকে।
চারু মজুমদারে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্লোগান ছিল, বন্দুকের নলই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস এবং ৭০ এর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন। প্রথম স্লোগানটা এখনও সঠিক। আর দ্বিতীয়টা হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু নকশালবাড়ি থেকেও গেছে। থেকে গেছে বলেই বিজেপি নেতা অমিত শাহ নকশালবাড়িতে গিয়ে গরিব চাষির ঘরে কলা পাতায় ডাল ভাত খান শুধু প্রচার পাওয়ার লোভে। অমিত শাহ হয়তো জানেন না, ১৯৬৭ সালের ১৭ জুলাই অটলবিহারী বাজপেয়ী সংসদীয় দলের সদস্য হিসেবে নকশালবাড়ি এসেছিলেন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে। অটলবিহারী সেদিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, কৃষকদের সমস্যাকে ভুলে গেলে চলবে না। কৃষকদের বিক্ষো্ভ আন্দোলনকে উড়িয়ে দেননি তিনি।
বলা হয়, এবং ঠিকই বলা হয়, চারু মজুমদার ভুল করেছিলেন। এখানেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। কেউ কী খুঁজতে যায় নেহেরু বা বাজপেয়ী বা বিধান রায় বা জ্যোতি বসু কী কী ভুল করেছিলেন? চারু মজুমদারকে নিয়ে এখনও বিচার বিশ্লেষণ চলে। এবং চলবে। ভুল যে করেছিলেন তা আরও বোঝা যায় যখন দেখা যায়, একশো ভাগ সৎ নেতা জঙ্গল সাঁওতালের স্মরণ সভায় মাত্র ১৫-২০ জন লোক হয় না। বা, কানু সান্যালকে আত্মহত্যা করতে হয় হতাশায়।
৭০-এর দশকের তিতুমির, চারু মজুমদারে নেতৃত্বে এই যে এত বড় একটা আন্দোলন, এত মৃত্যু, এত হতাশা আমাদের কী কিছু দিয়ে গেল? হ্যাঁ দিয়ে গেল। আমাদের ভাবনাকে অনেকটা গণমুখী করে গেল। সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় আনল বিরাট পরিবর্তন। স্বাস্থ্য আন্দোলনের উপরেও ছায়া ফেলল বিরাটভাবে। রোগীদের স্বার্থে, ২৪ ঘণ্টা এক্সরে ইসিজি চালুর রাখার জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন হয়েছিল তারই প্রভাবে। জনস্বার্থ, মানবাধিকার, এই সব বিষয় সাংবাদিকতায় খুব বড় করে এল তার পর থেকেই।
চারু মজুমদার গরিব মানুষকে বড়লোকের পিঠের চামড়ায় তৈরি জুতো পরাতে চেয়েছিলেন।এসব তো কথার কথা। আসলে তো তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সাম্যের দাবিতে। এই দাবি অনেক পুরোনো। প্যারি কমিউন থেকে শুরু করে আজও, এই দাবির সমর্থনে মিছিলর ডাক দিলে লোকের অভাব হবে না। সংকট যা তা তত্ত্বের, নেতৃত্বের।
ঋণ স্বীকার
এবং অন্যকথা, নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর সংখ্যা
লাল তমসুক, অমর ভট্টাচার্য
মা মাটি মানুষ সাপ্তাহিকে প্রকাশিত দেবাশিস ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ, ৫০ বছরের কথা
চারু মজুমদারের রচনাবলী
