
সাম্য অসাম্যর বোধ নিয়ে রথের দড়িতে টান — ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
রথের তলায় স্নানযাত্রার মেলা বসেছে। সকলের মধ্যে একটুকরো রোদের মতো ঝলমল করছে সেই মেয়েটার হাসি, যে একপয়সায় একটি বাঁশি কিনেছে। অথচ সকাল থেকে বাদলা দিন! ঠাকুরবাড়ির ঠেলাঠেলি, অঝোর বাদলের মধ্যে ম্লানমুখে চেয়ে আছে যে ছেলে তার কষ্ট মন ছুঁয়ে যায়। একটি রাঙা লাঠি কিনতে না পারার কষ্ট যেন জড়িয়ে আছে রথের চাকায়। রবীন্দ্রনাথ রথের আবহে এই যে সুখ ও দুঃখের ছবি এঁকে দিলেন, সেই ছবিতে শৈশবের রোদ বাদল লুকিয়ে থাকে। এই বৈষম্যের ধারণাই রবীন্দ্রনাথের রথ ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সমাজ বদলের ইঙ্গিত রথের চাকার ঘর্ঘর শব্দের মধ্যে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবিতায়, গানে রথের প্রয়োগ রয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রথ নতুন তাৎপর্যে ভাষারূপ পেয়েছে ‘কালের যাত্রা’য়। আজকের কথকতা হোক রবি ঠাকুর ও রথ নিয়ে।
১৩৩৯ সালের ভাদ্রমাসে ‘কালের যাত্রা’ প্রকাশিত হয়েছিল। বিশ্বভারতী প্রকাশনা, প্রকাশক ছিলেন জগদানন্দ রায়। এই বইয়ের দুটি অংশ— রথের রশি আর কবির দীক্ষা। ৩১ ভাদ্র ছিল কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। তাঁর জন্মদিনে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল টাউন হলে। রবীন্দ্রনাথ এই বই শরৎচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন। উৎসবে যেতে পারেননি বলে এক আশীর্বাদসূচক লেখা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বইটির সঙ্গে। লিখেছিলেন, ‘তোমার জন্মদিন উপলক্ষে ‘কালের যাত্রা’। নামের একটি বই তোমাকে উৎসর্গ করেছি। আশা করি, আমার এ দান তোমার অযোগ্য হয়নি। বিষয়টি এই— রথযাত্রা উৎসবে হঠাৎ সবাই দেখতে পেলে, মহাকালের রথ অচল। মানবসমাজের সবচেয়ে বড় দুর্গতি এই গতিহীনতা। মানুষে মানুষে যে সম্বন্ধ বন্ধন দেশে দেশে যুগে যুগে প্রসারিত, সেই বন্ধনই এই রথ টানবার রশি। সেই বন্ধনে অনেক গ্রন্থি পড়ে গিয়ে মানব সম্বন্ধ অসত্য ও অসমান হয়ে গিয়েছে, তাই চলছে না রথ। এই সম্বন্ধের অসত্য এতকাল যাদের পীড়িত করেছে, অবমানিত করেছে, মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, আজ মহাকাল তাদেররই আহ্বান করেছেন তাদের রথের বাহনরূপে। তাদের অসম্মান ঘুচলে তবেই সম্বন্ধের অসাম্য দূর হয়ে রথ সম্মুখের দিকে চলবে। কালের রথযাত্রার বাধা দূর করিবার মহামন্ত্র তোমার প্রবল লেখনীর মুখে সার্থক হোক, এই আশীর্ব্বাদ সহ তোমার দীর্ঘজীবন কামনা করি।’
এই সাম্য অসাম্যর বোধ নিয়ে যে রথের দড়িতে টান দেওয়ার আখ্যান— অনেকেই ভেবেছিলেন এ হল রবীন্দ্রনাথের ১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের প্রভাবে লেখা। কিন্তু এই লেখা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। ১৯২৩ সালে ‘রথযাত্রা’ নামে একটি লেখা প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে সেইটিই ‘রথের রশি’ নামে ‘কালের যাত্রা’র অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘মাসিক বসুমতী’-তে ‘শিবের ভিক্ষা’ ‘কবির দীক্ষা’ নামে সংযোজিত হয়। এই লেখার সংরূপ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পত্রিকার সূচিপত্রে ‘শিবের ভিক্ষা’-র কবিতা হিসেবে উল্লেখ ছিল। প্রমথনাথ বিশির লেখা ‘রথযাত্রা’ নামের একটি রচনা পড়ে উৎসাহ পেয় এই দুটি সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘রথযাত্রা’-র সূচনায় একথা উল্লেখও করেছিলেন, ‘আমার স্নেহাস্পদ ছাত্র শ্রীমান প্রমথনাথ বিশীর কোনো রচনা থেকে এই নাট্যদৃশ্যের ভাবটি আমার মনে আসিয়াছিল।’ এই সূত্রে প্রমথনাথ বিশীরও স্মৃতিচারণ মনে করা যাক।
বিশ্বভারতীর কয়েকজন ছাত্র একবার সুপুর গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, উঁচু একটা খড়ের চালা ঘরের মধ্যে ভারি একটা রথ দাঁড়িয়ে আছে। সকলে দড়ি ধরে টানছে। কিন্তু রথ নড়ে না, চড়েও না। তাঁরাও হাত লাগালেন। তবু রথ অনড়। গাঁয়ের সকলে বলাবলি করতে লাগল, অমঙ্গলের কথা! এমন সময় সকলে দেখল ধানের কলের কাজ শেষ কর একদল সাঁওতাল নরনারী আসছে। তখন প্রমথনাথের মনে হল, তাদের দিয়েই রথের দড়ি টানালে কেমন হয়! সাঁওতালরা যেই হাসতে হাসতে রথের দড়ি ধরে টান দিল, অমনি রথ ঘড়ঘড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পথ ধরে ছুটল। প্রমথনাথ এই বিষয় নিয়েই লিখলেন ‘রথযাত্রা’। প্রবাসীতে প্রকাশিতও হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে। পরে এই ভাবনার ভিত্তিতেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘রথের রশি’।
‘কালের যাত্রা’-র দুটি রচনাতেই জনতা চরিত্র বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। শেক্সপিয়রের নাটকের বা গ্রিক নাটকের কোরাসদের ভূমিকার কথা অনেকে বলেন। রবীন্দ্রনাথের নাটকে জনতা চরিত্রগুলি খুব স্বাভাবিক ছন্দেই আসে যায়। শুধু পুরুতের হাতে আর রথের রশি আটকা পরে থাকে না। তা ছুঁয়ে যায় অগণিত সাধারণ মানুষ। ঈশ্বরের রথ সাধারণ সামান্য মানুষের স্পর্শকে কখনো বিমুখ করে না। রবি ঠাকুরের রথভাবনা এই এক জাগরণের কথা বলে।
এর আগেও ‘লিপিকা’র ‘রথযাত্রা’ কথিকায় একই বার্তা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাজা ও রানি বিরাট বাহিনী নিয়ে চললেন রথ দেখতে। সঙ্গে দলে দলে যোগ দিচ্ছে সকলে। একজন ছাড়া! রাস্তার ধারে সে দুঃখীর বাড়ি। মন্ত্রী তাকে হাঁক পারতেই সে জানিয়ে দেয় রাজার পথ আর তার পথ এক নয়। সকলে চিন্তায় পড়ে। তার কি রথদর্শন হবে না? সে বলে, ঠাকুর রথে চড়ে তার দুয়ারেই তো আসেন। মন্ত্রী অবিশ্বাসের হাসি তে ভুবন ভরিয়ে রথের চিহ্ণ দেখতে চায়। দুঃখী বলে, তাঁর রথের চিহ্ণ পড়ে না। কারণ তিনি আসেন পুষ্পকরথে। মন্ত্রী সে রথ দেখতে চায়। দুঃখী দেখিয়ে দিলে, তার দুয়ারের দুইপাশে দুটি সূর্যমুখী ফুটে আছে।
রবীন্দ্রভাবনায় রথের চাকায় সুখী মানুষ আর দুঃখীমানুষ উভয়ের ছবিই আঁকা। ব্রাহ্মণের স্পর্শের সঙ্গে যখন শূদ্রের খেটে খাওয়া হাতের ছোঁয়া মিলে যায় , তখনই রথ ঘর থেকে এগিয়ে চলে পথে। সাম্যের মন্ত্র আবহ তৈরি করে।
