
বর্তমানে বাংলাভাষায় কথা বলে সারা বিশ্বের প্রায় ২৪ কোটি মানুষ
ভাষা কাকে বলে? যে অর্থবোধক ধ্বনি উচ্চারণ করে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে তাকেই বলে ভাষা। এক্ষত্রে বাংলাভাষা হল একটি সুমিষ্ট ভাষা। যা আমাদের চিরদিনের সঙ্গী। তবে মাতৃভাষা আক্ষরিক অর্থ হল 'মায়ের ভাষা'। আমরা সবাই যখন এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করি তখন মা-ই আমাদের সঙ্গে প্রথম কথা বলেন। মা আমাদের সবাইকে পৃথিবীর আলোকে চিনতে শেখান। তাই মাতৃভাষাকে খুব সহজে আয়ত্ব করে নিই। এই মাতৃভাষা হল আমাদের চিরসঙ্গী। সুখে-দুঃখে, হাসি- কান্না সবসময় সাথী।
তবে এখানে আমাদের মাতৃভাষা যে বাংলা তার ইতিহাস জানতে হবে। আমাদের মাতৃভাষা জন্মরহস্য রয়েছে মাগধী অপভ্রংশের মধ্যে। এই 'মাগধী অপভ্রংশ' থেকেই বাংলার জন্ম। কিন্তু একটি ভুল ধারণাও রয়েছে আমাদের মধ্যে, কেউ কেউ বলেন সংস্কৃত হল বাংলাভাষার জননী। মানে সংস্কৃত থেকেই জন্ম হয়েছে বাংলাভাষার। কিন্তু এটি ভুল ধারণা। সংস্কৃত হল একটি প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা। তবে উনিশ শতকে বাংলাভাষার উল্লেখযোগ্য উত্তোরণ ঘটে। বহু মহাপুরুষ ও গুণবান ব্যাক্তিরা বাংলাভাষাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাভাষার অন্যতম রূপকার, গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ১৮৫৫ সালে বাংলা বর্ণের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটানোর জন্য ‘বর্ণপরিচয়’ বইখানি তুলে দিয়েছিলেন পাঠকের হাতে। আর আমাদের ছোটবেলায় সর্বপ্রথম বাংলা বর্ণকে চেনা, জানা, শেখা, উচ্চারণ করা ও লেখা সবকিছুই 'বর্ণপরিচয়' বইয়ের মাধ্যমে। 'অ' থেকে 'ঔ' আবার 'ক' থেকে ‘চন্দ্রবিন্দু’ পর্যন্ত শেখা। এছাড়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচিত 'কথামালা', 'আদর্শলিপি' ও 'ধারাপাত' প্রভৃতি এক অনন্য উদাহরণ। আবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের রচিত 'সহজপাঠ' বাংলার ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিল। সেই ছোটবেলায় প্রথম বাংলাভাষায় ছড়ার মাধ্যমে পড়া।
এর অনেক পরে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাভাষা নিয়ে একটি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আমাদের বঙ্গীয় সমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অন্বেষায় যে ভাষার চেতনার জাগরণ ঘটে, এরই সূত্র ধরে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে।
১৯৪৭ সাল ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করল। একটি হলো 'ভারত' আরেকটি হল 'পাকিস্তান'। আবার পাকিস্তানের দুটি ভাগ – পশ্চিম ও পূর্ব। এরপর ১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি করাচি শহরে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় অধিবেশনে একটি প্রস্তাব পেশ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের বৃহৎ সংখ্যক জনগণের মাতৃভাষা বাংলা, তাই এই প্রদেশের মাতৃভাষা যেন বাংলা রাখা হয়।
আরও পড়ুন
মুর্শিদাবাদের ছেলে ভাষা শহীদ আবুল বরকত
এর ফলে পাকিস্তানের প্রশাসকেরা অত্যন্ত সমস্যার সৃষ্টি করে। এই প্রশাসকেরা জানায়, পশ্চিম পাকিস্তানের মতোই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু থাকবে। বাংলা ভাষাকে কোনওভাবেই রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। এমনকি পাকিস্থানের স্রষ্টা মহম্মদ আলি জিন্না বাংলা ভাষাকে সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে মর্যাদা দেওয়ার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে জিন্না ঢাকা সফরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র -শিক্ষক সমাবেশে ঘোষণা করেন, "উর্দু ভাষা, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"। শুরু হল প্রতিবাদ ও আন্দোলন। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলাভাষার অধ্যাপক ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখলেন, "শিশুর মাতৃদুগ্ধের অধিকার যেমন কেউ কেড়ে নিতে পারে না, তেমনি মাতৃভাষার অধিকারও কেউ কেড়ে নিতে পারে না"। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন এক চরম পর্যায় পৌঁছে গেল। "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" ধ্বনিতে রাস্তায় নামলো ছাত্র-শিক্ষক সমাজ। সরকারি ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য ও অমান্য করে। বিনা প্ররোচনায় নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এর ফলে চারজন ছাত্র (রফিক, সালাম, জব্বর ও বরকত) রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। উত্তেজিত জনতা সংবাদপত্রের অফিস 'দ্য মর্নিং নিউজ’-এ আগুন ধরিয়ে দেয়। অবশেষে ভাষা শহিদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা মাতৃভাষা বিশ্বদরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সংগঠন 'ইউনেসকো' ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বলে ঘোষণা করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতিবছর এই দিনটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ৬৬ বছর পূর্ণ করবে।
একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ২৪ কোটি মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বিশ্বের চতুর্থতম স্থানে।
একনজরে বাংলাভাষা
১. ৩০টি দেশে ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ।
২. ৬টি দেশে রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলাভাষার চ্যানেল।
৩. ১০টি দেশের বেতারে বাংলাভাষায় অনুষ্ঠান।
৪. আরবে ৬টি দেশে বাংলা সংবাদপত্র।
৫. আমেরিকা, কানাডা সহ ইউরোপে ৮টি দেশে বাংলা সংবাদপত্র।
৬. অষ্ট্রেলিয়া দেশের সংসদে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাভাষা।
