
বুকারু বুঝিয়ে দিল মোবাইল গেম নয়, বাচ্চাদের ভালো লাগে ‘বাতাস বাড়ি’
বুকারু উৎসব(Bookaroo lit fest) হয়ে গেল ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে । এই প্রথম বুকারু এল কলকাতায়। এই দলের ডিরেক্টর স্বাতী রায় কলকাতায় নয়, থাকেন দিল্লীতে। কয়েকবছর ধরে বুকারু ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের বই ভালো লাগানোর বা বইয়ের প্রতি ভালবাসা জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টায় নিজেদের বেঁধে রেখেছে। এই দলের শিশুপ্রেমিক মানুষেরা নানা ভাবনায় এই উৎসব পরিচালনা করেন। কখনও দিল্লী, কখনও গোয়া, কখনও বা ব্যাঙ্গালুরুতে। প্রতিটি জায়গাতেই এসে হাজির হন ইংরেজি, হিন্দি ভাষার অনেক শিশুকাহিনির রূপকারেরা। সঙ্গে থাকেন অলংকরণ শিল্পি(illustrator), গল্প বলার জাদুকরেরা(story teller)।
ভারতীয় জাদুঘরে অনেকবারই গিয়েছি ইতিহাস খুঁজতে, কিন্তু গত ৫ ও ৬ই নম্ভেবর গিয়ে দেখলাম অন্য এক রূপ।অন্য রূপে সেজে উঠেছিল ভারতীয় জাদুঘর।চারিদিকে রঙের মেলা । রংবেরংএর কাপড় দিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট গল্পশোনার মণ্ডপ, তৈরি হয়েছে অনেকে মিলে পুতুল তৈরির এক রঙিন মঞ্চ।মাঠের এক দিকে চলেছে কাহানি বলার বা শোনার প্রস্তুতি, কোথাও বা চলেছে ‘আই স্পাই আর্ট’ (চোখ বেঁধে স্পর্শ করে অনুভবের সাহায্যে বলতে হবে শিল্পের মাধ্যম কী?)।
এগারোটা বাজতেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এসে হাজির। কেউ কোনও স্কুলের সাথে কেউ বা বাবা,মাযের হাত ধরে।বিস্ময় ভরা চোখে দেখছে চারিদিক। কোথাও গল্প বলা হচ্ছে, কোথাও চলছে নাটকের ঝালাপালা। কোথাও বা পাখি কথা বলছে কলকাতার নানা কিছু নিয়ে।প্রতিটি শিশুর মধ্যে যে একজন ‘হিরো’ থাকে, তারা যে সবাই মনের ডানা মেলে হারিয়ে যেতে চায়, তা নিয়েও চলেছে এক মজার আসর।এই সব নিয়ে জেন আর জিট এমন সুন্দর ভাবে পরিবেশন করলেন যে বয়স্ক মানুষেরাও বোধহয় দ্বিতীয় শৈশব খুঁজে পেল। কোথাও শিশুরা আঁকছে, কখনও স্বপ্নের ডালা সাজাচ্ছে, কোথাও বা ছোটরা হুগলী নদীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে কী কী দেখেছে তারা তাই এঁকে চলেছে বিরাট ক্যানভাস বা স্মার্ট বোর্ডে। সব বাচ্চারাই নিজেদের মতো এঁকে চলেছে। আরেক দিকে চলেছে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের রচনা নিয়ে গল্প বলার আসর।
দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে নিজেদের ছোটবেলায় ফিরে যাচ্ছিলাম। ছোটবেলায় গল্প শোনার জন্য রবিবারের অপেক্ষায় থাকতাম। আকাশবাণী(রেডিও)তে শুনতাম ইন্দিরাদেবীর শিশু মহল আর গল্প দাদুর আসর। সারা সপ্তাহের বকা হোমওয়ার্ক সব ভুলে যেতাম শুনতে শুনতে। বড় আনন্দ পেতাম। কিন্তু যেই বুকারুর রাজ্যে ঢুকে পড়লাম মনে হল এ তো আরও মজার, আরও আনন্দের। বই এখানে গানের মতো। বাচ্চারা যেন বই-র তালে তালে নিজেদের মেলে ধরেছে। এই ফেস্টের মজা হল কোন ফলাফল নেই, পুরস্কারও নেই। আছে শুধু আনন্দ আর মজা। এই মেলায় ছোটদের দেখতে দেখতে মনে হল কেন বলা হয় আজকালকার বাচ্চারা বই পড়ে না? ভালবাসে না? শুধুই ঘরে বসে ইলেকট্রনিক গেমস খেলে!
শিশু মন শব্দের সঙ্গে ভাব জমায়। আমরা বড়রা সেটা অনুভব করি না অনেক সময়। তাই হয়েত ইলেকট্রনিক খেলনা হাতে তুলে দিই। আসলে ওরা শুধু শব্দ শোনে না, শিশুরা শব্দের জাল বোনে মনে মনে।কল্পনা তখন ডানা মেলে ওড়ে। মনে মনে ছবিও এঁকে নেয় তারা । এরই মধ্যে তারা খুঁজে পায় এক সুর, শুনতে পায় কোনও না কোনও ছন্দ। আবার এই ছন্দই তারা শোনে ছড়ায়, কবিতায় গল্পে। তাই ওদের ‘কাকেশ্বর কুচকুচে’ নাম ভাল লাগে। ভালো লাগে লীলা মজুমদারের ‘বাতাস বাড়ি’।বুকারুর সদস্যরা আবার মনে করিয়ে দিলেন সে কথা, রঙিন মনকে বই দিয়ে, গল্প দিয়ে কী ভাবে ভরিয়ে তোলা যায়া।
সব শিশুর মনের ভিতরেই একটা লুকানো জগৎ থাকে। সেখানে নদী বয়, পাখি ডাকে, হাওয়া ওঠে, বিস্তীর্ণ আকাশ সব কিছু ঢেকে রাখে, আরো কত কিছুই না ঘটে সে জগতে। সেখানে প্রবেশের দরজার তালা খোলার চাবি অনুসন্ধান করে চলেছে বুকারু। আর সে কাজে অনেকটাই তারা ইতিমধ্যেই সফল।
বুকারু ওয়েব সাইট — www.bookaroo.in
