বাংলা গদ্যের আদি লেখক রামরাম বসু

উইলিয়াম কেরী-র মুন্সি ছিলেন তিনি

আবু সাঈদ
বাংলা গদ্যসাহিত্যের আদি লেখকদের মধ্যে অন্যতম হলেন রামরাম বসু। নানা জনের তথ্য মতে, তিনি ১৭৫৭ সালে হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন; কিছু ইংরেজিও জানতেন। ইংরেজরা এদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার পর সর্বপ্রথম ব্যাপটিষ্ট মিশনারির হয়ে বাংলায় ধর্ম প্রচারের করার জন্য আসেন জন টমাস। টমাস ১৭৮৩ সালের ৮ মার্চ বাংলা শেখার জন্য রামরাম বসুকে তাঁর মুন্সি নিয়োগ করেন। পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তিনি মুন্সি ও সংস্কৃত ভাষার সহকারী শিক্ষকের চাকরি পান। তাঁর রচিত রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা মৌলিক গদ্যগ্রন্থ ও ছাপাখানায় মুদ্রিত প্রথম বই। বইটি ১৮০১ সালের জুলাই মাসে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এটি ১৮০১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় কয়েকটি খ্রিস্টধর্ম বিষয়ক বই লেখেন; লিপিমালা, রামায়ণ ও মহাভারত সম্পাদনা করেন ও উইলিয়াম কেরীকে বাইবেল অনুবাদে সহায়তা করেন।

জন টমাস ১৭৯২ সনে লিখে গিয়েছেন, তখন রামরামের বয়স হবে আনুমানিক ৩৫ বছর। ১৭৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টমাস ইংল্যান্ডে ফেরার আগ পর্যন্ত রামরাম তাঁর মুন্সি হিসেবে কাজ করেন। পরে ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে টমাস যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা, পাদ্রী, শিক্ষাবিদ; তখন আধুনিক বাংলা গদ্য ও অভিধানের প্রধান পরিকল্পনাকারী উইলিয়ম কেরী এবং তাঁর পরিবার নিয়ে বঙ্গদেশে ফিরে আসেন। তখন তাঁর সুপারিশে কেরী রামরামকে তাঁর বাংলা মুন্সি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এ থেকেই শুরু হয় কেরীর সঙ্গে রামরাম বসুর সম্পর্ক। দেশীয় লোকেদের মধ্যে খৃষ্টধর্ম প্রচারের কেরী রামরামকে তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী করে তুলেছিলেন। রামরামও যিশুর মাহাত্ম্য সম্পর্কে কবিতা, গান লিখে মিশনারীদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। রামরাম খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ না করলেও খ্রীষ্টধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে ভালো রকম জানতেন। তিনি ‘গসপেল মেসেঞ্জার’ নামে একটি পুস্তিকা সম্পাদনা করেন এবং হিন্দুধর্ম ও সমাজের কুপ্রথা ও ধর্মবিশ্বাসকে সমালোচনা করে মিশনারীদের জন্য পুস্তক প্রস্তুত করে দেন, একটি গানের বইও লিখে দেন।

‘কে আর তরিতে পারে
লর্ড জিজছ ক্রাইস্ট বিনা গো’।

মূল ইংরেজি গান ‘জিজাস, আই লাভ দাই চারমিং নেম’ ও ‘হি ডাইস! দি ফ্রেন্ড অব্ সিনারস্ ডাইস’-এর অনুসরণে ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে রামরাম বসু যথাক্রমে লেখেন ‘হে খ্রিস্ট যিশু মুকদিত’ ও ‘হে শুন পাতকিগণ’ শীর্ষক দু’টি গান। তা ছাড়াও শ্রীরামপুর মিশনের পাদ্রি ওয়ার্ডের অনুরোধে রামরাম বসু ‘খ্রিস্ট বিবরণামৃতং স্তবং’ অংশে যিশু খ্রিস্টের স্তবগান রচনা করে লেখেন,

‘দয়াতে যে গুণময়
অবতরি য়হোদয়
ত্রাণহেতু লভিল মরণ।’ 

এইভাবে রামরাম কেরীকে খৃষ্টধর্ম প্রচারে সহায়তা করেছিলেন, হিন্দু পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখা লিখেছিলেন। কেরী বা অন্য মিশনারীরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে রামরাম খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করবেন। কিন্তু তা হয়নি। শ্রীরামপুরের মিশনারীরা নানান চিঠিপত্র ও দলিলে যে সামান্য লেখা সেখান থেকে জানা যায়, ‘ব্রহ্মসমাজে’র যে ধারণা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রচার করেন, রামরাম বসুর মধ্যে সেই ধারণার বীজ দেখা দিয়েছিল।’

প্রথমবার ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত রামরাম কেরীর কাজ করেন, কিন্তু এক বিধবার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখার অভিযোগে কেরী তাঁকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেন। কেরী তাঁর কাছ থেকে সামান্য বাংলা শিখে দুর্বল জ্ঞান নিয়েই তাঁর সাহায্যে বাইবেল অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। ১৮০০ সালে উইলিয়ম ওয়ার্ড এবং যশুয়া মার্শম্যানকে সঙ্গে নিয়ে কেরী যখন শ্রীরামপুর মিশন এবং প্রেস গড়ে তোলেন, তখন দ্বিতীয়বারের জন্যে রামরাম কেরীর অধীনে কাজ করতে আরম্ভ করেন। এবারে তাঁর কাজ হয় খ্রিস্টধর্ম সংক্রান্ত সাহিত্য রচনা এবং অনুবাদ করা।

আরও পড়ুন
হাসন রাজার গান

১৮০১ সালের মে মাসে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে কেরীর অধীনে বাংলা বিভাগের সূচনা হলে, রামরাম সেখানে সহকারী মুন্সি হিসেবে নিযুক্ত হন। কলেজে নিযুক্ত হওয়ার মাত্র দুমাস পরেই ছাত্রদের পাঠ্যপু্স্তক হিসেবে তিনি বার ভুঁইয়াদের একজন – প্রতাপাদিত্যের জীবন নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এর নাম রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র। ১৮০১ সালের জুলাই মাসে গ্রন্থটি শ্রীরামপুর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের জন্যে তিনি কলেজের কাউন্সিল থেকে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। পরের বছর তিনি বিভিন্ন কাজের উপযোগী চিঠিপত্রের একটি আদর্শ সংকলন প্রকাশ করেন। এর নাম লিপিমালা। এ দুটি গ্রন্থ ছাড়া, তিনি গদ্যে-পদ্যে আরও কয়েকটি পুস্তিকা লিখেছিলেন, যেগুলিকে এক কথায় বলা যায়, খ্রিস্টীয় সাহিত্য। খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর কোনো ভালোবাসা ছিলো কিনা সন্দেহের বিষয়, কিন্তু তাঁকে আগাগোড়াই খ্রিস্টধর্মে শিগগিরই দীক্ষা নিতে যাচ্ছেন – এমন ভান করতে হত, যাতে তাঁর মুনিবরা খুশি থাকেন। ‘লিপিমালা’ গ্রন্থের ভূমিকায় রামরাম এক ‘পরম ব্রহ্মের’ উদ্দেশ্যে নতি জানিয়েছিলেন।

রামরাম বসু শুধু বাংলা গদ্যের অন্যতম জনকই ছিলেন না, তিনি সংস্কার মুক্ততার বিচারেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্মরণীয়।

(ঋণ – স্বপ্ন’৭১)

Developed by DXDasia