
তারই মধ্যে চালিয়ে গিয়েছেন সাহিত্যচর্চা
নেশায় ভূপর্যটক, মননে কমিউনিস্ট। নাম লিখিয়েছেন বিপ্লবী দলে, রাজনীতি করেছেন সক্রিয়ভাবে, বিশ্বযুদ্ধের সৈন্যদলে যোগ দিয়ে দেশে দেশে ঘুরেছেন, তারপর সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বভ্রমণে। এমনই ডানপিটে ছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। তারই মধ্যে লিখেছেন একের পর এক বই।
বাংলাদেশের এখনকার হবিগঞ্জ জেলায় বানিয়াচং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রামনাথ। ভর্তি হয়েছিলেন গ্রামেরই হরিশ্চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাবার মৃত্যু হওয়ায় অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। এরই মধ্যে রাজনীতিতে যোগ দেন। অনুশীলন সমিতির সুশীল সেনের শাখায় সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবন শুরু করেন হবিগঞ্জের জাতীয় ভাণ্ডার সমিতির ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়ে। সেখানেই তিনি সাইকেল চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। তারপর অন্য একটি কাজে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বিপ্লবী কার্যকলাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারালেন।
তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কাজী নজরুল ইসলামের মতো অনেক দুঃসাহসী বাঙালি মিত্রপক্ষের হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আধুনিক সমরবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠা, যাতে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। রামনাথও ছিলেন তাঁদেরই একজন। বাঙালির পল্টনের হয়ে মেসোপটেমিয়া পাড়ি দিলেন তিনি। কিছুদিন পরই অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল। কিন্তু অদম্য জেদ তাঁর। আবার সৈন্যদলে যোগ দেন।
১৯২৪ সালে তিনি গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। সেখানকার কুইন স্ট্রিট থেকে প্রথমবারের জন্য সাইকেল নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হলেন ১৯৩১ সালে। সঙ্গে ছিল কেবল দু’টো চাদর, এক জোড়া চটি আর সাইকেল মেরামতির বাক্স। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চিন, জাপান, কানাডা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর ফিরে যান। তারপর মায়ানমার, উত্তরপূর্ব ভারতেও যান। ১৯৩৪ সালে নিজের গ্রাম বানিয়াচংয়ে ফিরলে বিপুল সংবর্ধনায় ভূষিত করা হয় তাঁকে। সেই বছরই দ্বিতীয়বার বিশ্বভ্রমণে বের হন। আফগানিস্তান, ইরাক, জার্মানি, হল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি নানা দেশে ভ্রমণ করেন। কলকাতায় ফিরে এসে লেখা শুরু করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ নিতে ১৯৩৭ সালে যখন তিনি শান্তিনিকেতন যান, কবিগুরু জানিয়েছিলেন, তিনিও ‘দেশ’ পত্রিকায় রামনাথের লেখা পড়েছেন।
১৯৩৮ সালে তিনি আফ্রিকা অভিযানে বের হলেন। মুম্বাই থেকে জাহাজে মোম্বাসা পৌঁছন, তারপর সাইকেলে কেনিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশ ঘুরে অবশেষে জাহাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। দেশে যখন ফেরেন, ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। দেশভাগের পর রামনাথ নিজের গ্রাম বানিয়াচংয়েই থেকে গিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে নিজের প্রকাশনা সংস্থা খোলেন। একের পর এক বই লিখে প্রকাশ করতে থাকেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০টি বই লিখেছিলেন। ‘বেদুইনের দেশে’, ‘জুজুৎসু জাপান’, ‘তরুণ তুর্কি’, ‘অন্ধকারের আফ্রিকা’, ‘আফগানিস্তান ভ্রমণ’ প্রভৃতি বই খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘অন্ধকারের আফ্রিকা’য় তিনি লিখেছেন, “উপন্যাস যেমন মানুষকে নেশাক্ত করে, পর্যটকও তেমনি মানুষকে মাতিয়ে তুলতে পারে”।
তাঁর শেষ জীবন অবশ্য কলকাতাতেই কেটেছে। ১৯৫৫ সালে এই মহানগরেই প্রয়াত হন ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস।
তথ্যঋণ – স্বাতী ভট্টাচার্য, আশরাফুজ্জামান।
