বৈভব ও মৃত্যু একই বিন্দুতে যে! আরও কারণ, আমাদের ওপর ধর্মের এস্টাব্লিশমেন্ট চাপানো নেই

কিঙ্করদাই বলি, কারণ রামকিঙ্কর বললে লোকটাকে পর-পর মনে হয়। সেই কতদিন আগেকার কথা, আর্ট কলেজ শেষ করে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গেছি। কিঙ্করদার কাছে বেড়াতে যাব সেটা একটা বিশেষ আকর্ষণ। কারণ লোকটা পালিশ করা নয়, মাটির দেওয়াল জল দিয়ে নিকিয়ে দিলেই যেন শুদ্ধ হয়ে যায়। সুন্দর হয়ে যায়। আমরা দুজনে ছিলাম। কিঙ্করদার ঘরে ভয়ে ভয়ে ঢুকেছি। একগাদা কাগজ নিয়ে বসে আছেন। কিছু কিছু খেলাচ্ছলে আঁকছেন, আবার চুপ করে বসে থাকছেন। ইতিমধ্যেই আমাদের দেখে বলে উঠলেন, ‘আয় বস। এই কে আছিস দু-মুঠো মুড়ি দিয়ে যা।’ সঙ্গে সঙ্গে এক মহিলা এসে আমাদের মুড়ি দিয়ে গেলেন। ছোট কুনকের মতো একটা জায়গায় ভরতি মুড়ি আর গুড়। ‘খা খা, আমি ছবি আঁকি’, বলেই বোতলের শেষটুকু গলায় ঢেলে দিলেন। তখন প্রায় বারোটা, সাড়ে বারোটা। অনেক সময় ধরে দেখে কোনও কথা না বললে শেষে বললাম, ‘কিঙ্করদা, একটু ঘুরে আসি।’ ‘আয়’।

বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুরে, এদিক-ওদিক দেখে-শুনে যখন আমাদের ফিরে আসার পালা, সে সময়ে মনে হল একবার দেখা করে যাই। আবার এলাম। দেখলাম সমানে এঁকে যাচ্ছেন, তবে ঘর আরও নোংরা। আরও এলোমেলো। বোতলের মাত্রা বেশি। অর্থাৎ দুটি বোতল খালি। তিনটে শেষ হতে চলেছে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মাথা চুলকে বললাম, ‘কিঙ্করদা অত মদ খাচ্ছেন কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব, ‘তাহলে কি তোর পোঁদ খাব।’ মাথা নীচু করে বেরিয়ে আসতে হল। ইচ্ছে ছিল দুটো ড্রয়িং নেব। তা আর হল না।

এই হল কিঙ্করদা। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া খুব কম লোকই এই লোকটাকে বুঝতে পেরেছিল। গরিব ও শয়তান হবার জন্য এই সেদিনও মানুষ কত মূর্খ হয় তার একটা নমুনা দিই। মন্ত্রী মহোদয় শ্রীমান যতীন চক্রবর্তী মহাশয়কে ঘটনাচক্রানুসারে ওঁর ব্যাপারে আসতে হয়েছিল। সেই মন্ত্রী মহোদয়ের বিশেষ কথাবার্তা, যা উনি বিদেশে থাকাকালীন রামকিঙ্করের ভাস্কর্য সম্বন্ধে বলেছিলেন, তা হয়তো পৃথিবীতে সভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে আর কোনও মন্ত্রী মহোদয় বলেননি। রামকিঙ্করের করা সেই মূর্তিটির আসল দিল্লির ললিতকলা ভবনে এখনও আছে। সে যাক। কিঙ্করদার বিষয়ে কিছু লিখতে হলে যে কথাটি বলা উচিত সে কথায় এবার আসি।

আমাদের দেশীয় ঘ্রাণ ছেড়ে পারস্য, চিন, জাপান ও শেষ সময়ে ইউরোপীয় পূর্ব-সমকালীন বা উত্তর-সমকালীনতার প্রভাবে আমরা যখন দলিত হয়ে নড়বড়ে হয়ে আছি, সে সময়ে কিঙ্করদা নিজের বিচ্ছুরণে এমন একটা জায়গায় এসেছিলেন যা বিশেষ ভারতীয়। সমকালীনতা, পূর্ব-সমকালীনতা বা উত্তর-সমকালীনতা সবই একাকার হয়ে ভারতীয় আত্মায় তাঁর মূর্তিকলার যে উত্তরণ তা অদ্বিতীয়। আর সেজন্যই কিঙ্করদা।

ভারতীয়তা বলতে যদি রূপবদ্ধ আঙ্গিক হয়, ভারতীয়তা বলতে যদি রূপবদ্ধ আঙ্গিক হয়, ভারতীয়তা বলতে যদি লালিত্য ও রূপের রেখাসমৃদ্ধ ও একমাত্র অলংকরণ হয়, তাহলে সে ছবি, ছবি হবে কেন? সমকালীনতায় ইউরোপ যা আমাদের দেখিয়েছে সেদিক দিয়ে বলা যায় ইউরোপের কাছে আমরা বিশেষ ঋণী। ধরা যাক অবনীন্দ্রনাথের ছবির কথা, শাজাহানের দুঃখ কিংবা ভারতমাতার দুঃখ, সে দুঃখ বা সুখ বা অনুভূতি আমাদের যত না আঘাত দেবে তার থেকে ইউরোপের সমকালীন ছবি আমাদের বোধকে অনেক বেশি নাড়া দেবে। কীভাবে দেবে? তা পরে বলছি। আবার ইউরোপীয় ধরনে আমরা যদি দেশীয় মানুষজন ও পরিবেশের ছবি আঁকি তাতে শুধু ইউরোপীয় অনুকরণ হয়ে যাবে। আমরা কি স্রষ্টা হিসেবে জ্যাকেট (পোশাক) পাল্টিয়ে বিদেশিদের নকল করব? শুধুমাত্র তাই হবে আমাদের মতো গরিব দেশে স্বীকার্য? নিশ্চয়ই না।

গরিব দেশের বিশেষ চরিত্র থাকে। বিশেষ করে যে দেশগুলো কলোনিয়াল। তাঁদের কাছে প্রযুক্তি থেকে শিল্পকলা এসবের যে বিরাট চাপ তা সমাজে পড়তে বাধ্য। প্রযুক্তির লেনদেন নিয়ে যে বিত্তশালী লোকগুলো সরকার ও শাসনের মধ্য দিয়ে সমাজ ও দেশকে শোষণ করে তাঁদের মধ্যে প্রযুক্তির যুক্তিবদ্ধতার ফাঁকে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব এসে পড়বেই। আসতে বাধ্য। আমরা আজ সেই দোষে দুষ্ট হয়ে পীড়িত হয়ে আছি। একমাত্র কিঙ্করদা এর ব্যতিক্রম। এই যে ব্যতিক্রমতা, তা কিন্তু সচেতনভাবে নয়। প্রকৃতির আবেশের মধ্যে যে স্বকীয় রূপ নির্ভয়ে থাকে, যে আওয়াজ, যে গান, যে কলা, যে নৃত্য, যা সাবলীল, তা কে শেখায়? বরঞ্চ পালিশ করতে গেলে তা খারাপ হয়ে যাবে। কিঙ্করদাও তাই খারাপ হননি।

ওই শান্তিনিকেতনেই অনেকে তাকে সহ্য করেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পাখির ডানার মতো আগলে রাখতেন। তারও কারণ আছে। একটাই কারণ যা হতে পারে তা হল, রবীন্দ্রনাথ শিল্পী হিসেবে মহান। অবনীবাবুরা যে সময়ে শিবদুর্গার ছবি আঁকছেন, সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের সমকালীনতায় দংশিত হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। তিনি ছবি আঁকতে জানতেন? না। তাহলে? তিনি ছবির আত্মাটাকে ধরেছিলেন, যে আত্মা, যে নমনীয়তার ঘর্ষণ প্রাচ্যে আছে। যা ইউরোপে নেই। আর সেজন্যই রবীন্দ্রনাথের ছবি অনেকের চেয়ে ছবি হয়ে আছে। বাকি যাঁরা, তাঁরা হচ্ছে এস্টাব্লিশমেন্ট।

হয়তো আমার কথা অনেকের বোধগম্য হচ্ছে না, তাহলেও আমি যে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি তা আমাদের সময়ে সব থেকে বেশি গ্রাহ্য হওয়া উচিত। মিত্রাক্ষর ছন্দ থেকে কেন অমিত্রাক্ষর-মিত্রাক্ষর ছন্দ হবে, কোন্‌ অবচেতন মনে এ তাগিদ জন্মায়, কেন জন্মায়, এসব ভাবতে হবে। ছবিতেও তাই। লালিত ললিত রেখা, এবড়ো-খেবড়ো রেখা, সরু-মোটা রেখা, হতাশার রেখা এসব কেন থাকবে? কারণ সমকালীনতাই যে সুখ-দুঃখে ভরা। বৈভব ও মৃত্যু একই বিন্দুতে যে! আরও কারণ, আমাদের ওপর ধর্মের এস্টাব্লিশমেন্ট চাপানো নেই। বোদলেয়র যেমন প্রথম বলেছিলেন, নরকেও ফুল ফোটে, তার আগে শুধু স্বর্গে ফুল ফুটত।

গরিব দেশে প্রযুক্তির আমদানি বিশেষে সমাজব্যবস্থা পাল্টাতে বাধ্য। সুতরাং তাতে যদি দেশের সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটিয়ে দিতে আমরাও শিল্পী হুসেন কিংবা দিল্লির পরাধীন যে তখ্‌তগুলো আছে তাদের অনুসরণ করি তাহলে আমরা নিঃশেষ হয়ে যাব। যা হতে চলেছে, যেমন ধরা যাক খাজুরাহ কিংবা কোনারক মন্দিরের ঘোড়া। সে ঘোড়ার আদল মুছিয়ে দিয়ে ইংরেজরা তাঁদের মতো ঘোড়া আঁকতে আমাদের শিখিয়ে দিল। আজও আমরা তা ভুলতে পারছি না। দোষটা কার? আমাদের। সেদিক থেকে কিঙ্করদা ঈশ্বর।

(প্রকাশ দাস সম্পাদিত ‘রামকিঙ্কর – অন্তরে বাহিরে’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)

Developed by DXDasia