মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাখালদাসের নাম

সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি কৃতিত্ব রেখেছেন

গ্রিক বিজয় স্তম্ভের খোঁজে সিন্ধু অঞ্চলে গিয়েছিলেন এক বাঙালি প্রত্নবিদ। বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু প্রাচীন জিনিসের সন্ধান পান, যাতে বেশ অবাকই হয়েছিলেন। হরপ্পায় দয়ারাম সাহানি সেসব দ্রব্য পেয়েছিলেন, সেগুলোর কথা মনে পড়ে তাঁর। ১৯২২ সালে তিনি সেখানে খননকার্য শুরু করেন। এভাবেই সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্র মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। 

অবশ্য তিনি একাই মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কর্তা কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। অনেকে বলেন, স্যার জন মার্শালও যৌথভাবে এই কৃতিত্বের ভাগীদার। পিকে মিশ্র ‘Rakhal Das Banerji: The Forgotten Archaeologist’ বইতে দাবি করেছেন, রাখালদাসের থেকে অন্যায্যভাবে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছিলেন মার্শাল। তাঁর মতে, ১৯২৪ সালের আগে মহেঞ্জোদারোর ব্যাপারে মার্শাল খুব একটা কিছু জানতেনও না। 

১৮৮৫ সালে রাখালদাসের জন্ম হয়েছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। বাবা মতিলাল ছিলেন আইনজীবী। অল্প বয়সেই রাখালদাসের বিয়ে হয়েছিল উত্তরপাড়ার জমিদার নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে কাঞ্চনমালার সঙ্গে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে সাম্মানিক-সহ স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রাখালদাস। ১৯১০ সালে ইতিহাসে এমএ সম্পূর্ণ করেন। কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর পেশাদারি জীবন শুরু হয়। নিজের দক্ষতায় পরের বছরই আর্কিওলজিকাল সার্ভের সহকারী তত্ত্বাবধায়কের পদ লাভ করলেন। তারপর আরও পদোন্নতি হয়েছিল। দেশের নানা প্রান্ত চষে বেড়াতেন ইতিহাসের নেশায়। ১৯২৬ সালে আর্কিওলজিকাল সার্ভে থেকে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন। ১৯২৮ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

মহেঞ্জোদারোয় প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ 

প্রাচীন হস্তলিপিবিদ্যা, উৎকীর্ণ লিপিবিদ্যা, মুদ্রাবিদ্যা, মূর্তিতত্ত্ব প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রের গবেষণায় অবদান রেখেছেন রাখালদাস। বাংলা এবং ইংরেজিতে বেশ কিছু গবেষণামূলক বই এবং প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর পরিচালনায় পাহাড়পুরে খননকার্য চলেছিল। মহাস্থানগড়, ঘোড়াঘাট প্রভৃতি অঞ্চলেও তিনি কাজ করেছেন। গবেষণার পাশাপাশি চালিয়ে যেতেন সাহিত্যচর্চাও। তাঁর লেখা ‘শশাঙ্ক’ ‘ধর্মপাল’, ‘ময়ূখ’ ‘ধ্রুব’-র মতো উপন্যাসগুলি আজও মুগ্ধ করে পাঠকদের। 

রাখালদাস ছিলেন ডায়বেটিসের রোগী। তারই মধ্যে বড়ো ছেলের অকাল মৃত্যু ভীষণ রকম মানসিক আঘাত দিয়েছিল তাঁকে। ১৯৩০ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। আধুনিক পদ্ধতিতে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ভিত্তি যাঁরা গড়ে দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে প্রথম সারিতেই।

তথ্যঋণ – অমিতাভ ভট্টাচার্য, সুদীপ জোয়ারদার। 

Developed by DXDasia