বাকশক্তি হারিয়েও কলম থামাননি রজনীকান্ত

‘শিশুকাল হইতে সাহিত্য ভাল বাসিতাম ও আমার চিত্ত তাই লইয়াই জীবিত ছিল’

মোহাম্মদ জুলফিকার
বি.এল পরীক্ষা দেবার আগে থেকেই রজনীকান্ত সেনের কবিতা ও গান রাজশাহীর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রাজশাহীর সুরেশ চন্দ্র সাহা’র মাসিক “উৎসাহ” পত্রিকায় রজনীকান্তের পর পর কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়। যদিও তিনি কলেজ জীবন থেকেই কবিতা ও সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। ওকালতি পেশায় গেলেও গানের নেশা, কবিতা ও রসব্যঙ্গ কাব্য লেখা তাঁর নেশা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর ভাষায়, ‘‘আমি আইন ব্যবসায়ী, কিন্তু ব্যবসায় করিতে পারি নাই। শিশুকাল হইতে সাহিত্য ভাল বাসিতাম ও আমার চিত্ত তাই লইয়াই জীবিত ছিল।”
রাজশাহীতে এ সময় ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র সাথে রজনীকান্তের সখ্যতা গড়ে উঠে। আবগারি বিভাগের পরিদর্শকরূপে কবি ও নাট্যকার ডি.এল রায় রাজশাহীতে আসলে তিনি তার সাথেও পরিচিত হন। ভারতবর্ষ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা হয় এবং সকলে মিলে একটি সাহিত্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। সে সময় উক্ত চারজন সঙ্গীত ও সাহিত্য রসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে রাজশাহীতে সব সময় উৎসব অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো। বিশেষত রজনীকান্তের স্বভাবসুলভ সঙ্গীতকুশলতা ও রসরসিকতা রাজশাহীর সভা-সমিতির অতি আকর্ষণীয় বিষয় ছিল।

জলধর সেন লিখেছেন, ‘‘এক রবিবারে রাজশাহীর লাইব্রেরীতে কিসের যেন একটি সভা হইবার কথা ছিল। রজনী বেলা প্রায় তিনটার সময় অক্ষয়ের বাসায় আসিল। অক্ষয় বলিল, ‘রজনী ভায়া খালি হাতে সভায় যাইবে। একটা গান বাঁধিয়া লও না।’ রজনী যে গান গাইতে, বাঁধিতে পারিত, তাহা আমি জানিতাম না। আমি জানিতাম, সে গান গাইতেই পারে। আমি বলিলাম, এক ঘন্টা পরে সভা হইবে, এখন কি আর গান বাঁধিবার সময় আছে?’ অক্ষয় বলিল, রজনী একটু বসিলেই গান বাঁধিতে পারে।’ রজনী অক্ষয়কে বড় ভক্তি করিত। সে তখন একখানা চেয়ার টানিয়া অল্পক্ষণের জন্য চুপ করিয়া বসিয়া থাকিল। তাহার পরেই কাগজ টানিয়া লইয়া একটা গান লিখিয়া ফেলিল। আমি তো অবাক! গানটা চাহিয়া লইয়া পড়িয়া দেখি, অতি সুন্দর হইয়াছে।” গানটি এখন সর্বজন পরিচিত “তব চরণ-নিম্নে উৎসবময়ী শ্যাম ধরণী সরসা।’’ এমনই মেধাবী ছিলেন রজনীকান্ত। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে গান লিখে ও সেই গানে সুর দিয়ে গান গেয়ে আসর মাত করার জুড়ি ছিল না তাঁর।

বাস্তবে রজনীকান্ত সেন উকিল হলেও আইন ব্যবসায় মনোযোগ না দিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়েই মেতে থাকতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কুমার শরৎকুমারকে লেখা এ চিঠিতে বলেছেন, “কুমার, আমি আইন ব্যবসায়ী, কিন্তু আমি ব্যবসায় করিতে পারি নাই। কোন দুর্লঙ্ঘ্য অদৃষ্ট আমাকে ঐ ব্যবসার সহিত বাঁধিয়া দিয়াছিল; কিন্তু আমার চিত্ত উহাতে প্রবেশ লাভ করিতে পারে নাই। আমি শিশুকাল হইতে সাহিত্য ভালবাসিতাম, কবিতার পূজা করিতাম, কল্পনার আরাধনা করিতাম, আমার চিত্ত তাই লইয়াই জীবিত ছিল। সুতরাং আইনের ব্যবসায় আমাকে সাময়িক উদরান্ন দিয়াছে, কিন্তু সঞ্চয়ের জন্য অর্থ দেয় নাই।”

১৯০২ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘‘বাণী”-কাব্য অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এটি মূলত গানের বই। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘‘কল্যাণী’’ কাব্য প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে। এটিও ছোট-বড় গানের সংকলন। কবির তৃতীয় গ্রন্থ “অমৃত” নীতিকবিতা প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। আটচল্লিশটি কবিতা এতে সংকলিত হয়েছে। পরোপকার কবিতাটি এই গ্রন্থে রয়েছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী দেশাত্মবোধের জোয়ার সৃষ্টি হলে বিদেশী পণ্য বর্জনের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলন গড়ে উঠে। কবি রজনীকান্ত এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিদেশী মিহি কাপড়ের পরিবর্তে বাঙালীর জন্য দেশীয় কলে মোটা কাপড় তৈরি শুরু হল। আর রজনীকান্ত সেন দেশীয় পণ্যকে জনগণ চিত্তে স্থান করে দিতে বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করে গাইলেন তাঁর বিখ্যাত গান –

‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নেরে ভাই ;
দীন-দুঃখিনী মা যে তোদের
তার বেশী আর সাধ্য নাই।’’

আরও গাইলেন –

‘ভিক্ষার চালে কাজ নাই, সে বড় অপমান,
মোটা হোক, সে সোনা মোদের মায়ের ক্ষেতের ধান।’’

মুহূর্তেই রজনীকান্তের নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। কবির এই গান বাঙালির ঘরে ঘরে সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হতে লাগল। বাংলার বিখ্যাত মনীষীরা অকুণ্ঠচিত্তে রজনীকান্তের দেশাত্মবোধের মহিমা বর্ণনা করে পত্র-পত্রিকায় তাদের মন্তব্য প্রকাশ করলেন।

রাজশাহীতে অবস্থানকালে কবির তৃতীয় পুত্র ভূপেন্দ্রনাথ কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। পরের বছর কবি আবার শোকে পড়লেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভাঙাবাড়িতে অবস্থানকালে কবির প্রথম কন্যা শতদলবাসিনী এবং দ্বিতীয় পুত্র জ্ঞানেন্দ্র রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। জ্ঞানেন্দ্র সুস্থ হয়ে উঠলেও কন্যা শতদলবাসিনী মারা যায়। কবি রজনীকান্ত পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে লিখেছেন

‘আমি অকৃতী অধম বলেও তো
কিছু কম করে মোরে দাওনি।
যা’ দিয়েছ তার অযোগ্য ভাবিয়া
কেড়েও তো কিছু নাও নি।’

অথচ ভাগ্যের পরিহাস এমনই, কবি যখন সারা বাংলায় গৌরবের শিখরে আসীন তখনই তিনি আক্রান্ত হলেন কালব্যাধি ক্যান্সারে। তবুও তিনি থেমে যাননি। ব্যাধি অগ্রাহ্য করে গান লিখেছেন ও গান গেয়েছেন সভা-সমিতিতে। তাঁর নিজ হাতে লেখা ডাইরিতে তিনি বলেছেন, ‘‘হঠাৎ হাসতে হাসতে গলায় ঘা হল। তাই নিয়ে রঙ্গপুরে গিয়ে তিনদিন গান করতে হল, তারপর থেকে এই দশা।”

শেষ পর্যন্ত রুগ্ন অবস্থায় কবিকে কলকাতা, কাশীতে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু কোন ফল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোগাক্রান্ত কবি রজনীকান্তকে দেখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখেছিলেন, “প্রীতিপূর্বক নমস্কারপূর্বক নিবেদন, সেদিন আপনার রোগশয্যার পাশে বসিয়া মানবাত্মার একটি জ্যোতির্ময় প্রকাশ দেখিয়া আসিয়াছি। শরীর হার মানিয়াছে, কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে, কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে ম্লান করিতে পারে নাই। আপনি যে গানটি পাঠাইয়াছেন, তাহা শিরোধার্য করিয়া লইলাম।”

কবি রোগশয্যায় মেডিকেলে থেকেও বহু গীতি কবিতা লিখেছেন। রোগশয্যায় তিনি পুত্র শচীনের বিবাহ সম্পন্ন করেন। তাঁর মহাপ্রয়াণের পর আরো পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯১০ সালে “আনন্দময়ী”। এটি আগমনী ও বিজয়া সঙ্গীতের সংকলন। ওই বছরই প্রকাশিত হয় “বিশ্রাম” ও “অভয়া” (কাব্য)। “সদ্ভাব কুসুম” (নীতি কবিতা) ১৯১৩ সালে এবং “শেষ দান” (কাব্য) প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। শেষ দান কাব্যটি কবির জীবনের শেষ কাব্য। এই কাব্যের কবিতাগুলো কবি হাসপাতালের রোগ শয্যায় নির্বাক জীবনে লেখেন।

(ঋণ – দৈনিক ইত্তেফাক)

Developed by DXDasia