“তোমারই দেওয়া প্রাণে …”

প্রিয় জনের বিচ্ছেদ বেদনা ভুলিয়ে দেয় তাঁর গান। রজনীকান্ত সেন। আজ তাঁর মৃত্যুদিন

আমার দাদু মানে ঠাকুর্দার জন্মদিন ছিল ৫ ই এপ্রিল। আমি অবশ্য অনেক দিন সেটা জানতামই না।  যখন আমার বছর বারো বয়স, একদিন দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার জন্মদিন কবে?" দাদু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে অস্পষ্ট গলায় বলল, "৫ ই এপ্রিল।

অস্পষ্ট গলা। খুব অস্পষ্ট। কিন্তু আমার কানে তা গমগমে আওয়াজ হয়ে এসে ধাক্কা মারল। তারিখটা। কী ভয়ঙ্কর সেই তারিখ! সেই দু:স্বপ্নের রাত। ৫ ই এপ্রিল। দাদু ঠাকুমা হারিয়েছিল একমাত্র দৌহিত্রকে। দাদাভাই। আমার পিসতুতো দাদা। আনন্দ।

আমি আর টুলটুল। আমরা মামাতো-পিসতুতো দুই বোন। বয়সের ফারাক মাত্র আটচল্লিশ দিন। দাদাভাই আমাদের থেকে সাত বছরের বড়। সেই ৫ই এপ্রিল তখনও আমাদের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি। সেই বছর আমাদের প্রথম ভাইফোঁটা দেওয়ার কথা ছিল। কালীপুজোর পর। হল না। তার আগেই ও চলে গেল। মাত্র ১১ বছর ৯ মাস বয়সে। না, রোগ বালাই ছিল না কিছু।

ওরা তখন পুণাতে। পিসেমশাই সামরিক হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। ছবির মতো বাংলো ক্যান্টনমেন্টে। এত ঝকঝকে সিঁড়ি আর বারান্দা যে সিঁদুর পড়লে কুড়িয়ে নেওয়া যায়। দাদাভাই ফিরেছিল স্কুল থেকে। ভাত খেয়ে বাইরে এসে বসেছিল বারান্দার ধাপিতে। কোত্থেকে একটা মস্ত বড় ফনা তোলা গোখরো সাপ এসে বিষদাঁত বসিয়ে দিল গোড়ালিতে। একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। পিসিমণি ছুটে এসেছিল বাইরে। হাসপাতাল, ডাক্তার, বিভ্রান্তি …যিনি ডাক্তার, ওর বয়স ভুলে পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য যে পরিমাণ ওষুধ দরকার, তাই ঢুকিয়ে দিলেন শরীরে। তালেগোলে ভুলেই গেলেন যে ওষুধ দেওয়ার আগে স্টমাক ওয়াশ করা হল না …ও বমি করতে গিয়ে শ্বাসনালীতে খাবার আটকে শেষ হয়ে গেল।;

দুটি নিতান্ত বালিকা। একজন কলকাতায়, অন্যজন পুণাতে। দুজনে আমরা এই সেদিনও ফোনে সেই দুপুরে আঁধার ঘনিয়ে আসা দিনটির কথা আলোচনা করেছি। কী ভয়ঙ্কর অভিঘাত ছিল। প্রত্যক্ষে.. একজনের কাছে। আর আমি? চোখ বুজে চোখ খুলে ছবির মতো দেখি …আজও কানের কাছে প্রতিটি শব্দ বেজে যায়। বেসুরে, বেতালে।

সেদিন আমার জ্বর হয়েছিল। আমার এক মাসি এসেছিল আমাকে দেখতে। আমি এক বিশ্ব -বায়্নাবাজ বাচ্চা তখন, অসুখ হলে বাড়তি মনোযোগ পাই। মাসিকে বাধ্য করেছিলাম রাতে থেকে যেতে। জ্বরের ঘোর অল্প অল্প, আমি শুয়ে পড়েছি, রান্নাঘরের পাট প্রায় চুকিয়ে ফেলেছে মা আর ঠাম্মা। আচমকা কড়া নাড়ল কেউ। তখন অত রাতে কেউ কারো বাড়ি আসে না। কে এল?

আমার পিসিমণির ছোট ননদ আর নন্দাই। ওদের তখন একটা কালো রঙের গাড়ি ছিল। আমি শুয়ে আছি। খাবার ঘরে আলো জ্বলল। সদর দরজা খুলে গেল হাট করে। তারপর আর্তস্বর। আমি শুনলাম, আনন্দ চলে গেছে মাসীমা। ;ছেলেটা চলে গেল। আমরা বেঁচে আছি কেন? আমি, আপনি, মা ….আমরা কেন চলে গেলাম না ?"

আমি তখন মৃত্যুকে চিনিই না। চলে যাওয়া মানে কী, বুঝি না। কী হয়েছে ..জানি না। সবাই অমন করছে কেন? দাদাভাই চলে গেল? কোথায় গেল? আমরা ভাইফোঁটা দেব না? সিঁটিয়ে বসে আছি খাটে। আমার খুব শীত করছে। আমার খুব গরম লাগছে। সব্বাই চলে গেল গাড়ি করে। ওই রাত্তিরে। পিসির শ্বশুরবাড়ি লেক ভিউ রোডে। কলকাতার সব নিকটজন ওখানে। ওখানে ফোন আছে। ফোনে যোগাযোগ, ফোনে কথা। আমাদের বাড়িতে তো ফোনই নেই। আমি আর মাসি বাড়িতে শুধু। মাসি শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে রেখেছে বুকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি একগুঁয়ের মতো বকেই যাচ্ছি, কোথায় চলে গেল বল না! ও তো ছোট ছেলে, বেশি বড় নয়। কোথায় গেল? যদি ছেলেধরা ধরে নিয়ে যায়?"

আমাদের বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। সব আলো নিভে গেছে।

তারপর বাবা গিয়ে ফিরেও এল পুণা থেকে। কয়েক মাস পরে আমরা গেলাম। বাবা -মা-আমি। সবাই আছি আমরা পুণার বাড়িতে। আসলে যেন কেউ নেই! আমরা দুটো বাচ্চা মেয়ে ঘুরঘুর করি দিনভর। এ ঘর ও ঘর। সামনের ওই বারান্দা। দাদাভাই এখানে বসেছিল না? আমরাও বসি ওখানেই। ঝকঝকে তকতকে। সাপটা এই না-শীতেও ভরপেট খেয়ে কোন অন্ধকারে শীতঘুমে। পেছনের বারান্দায় দড়ির দোলনাতে দুলি সারা দুপুর। প্লেটে করে শুকনো হরলিক্স নিয়ে চেটে খাই। দাঁতে জড়িয়ে যায়। পাঁচিলের ওপারে দূরে রেসকোর্স। সবুজ মখমল। দুপুরে ঘোড়ারা বিশ্রাম নেয়। আমাদের দুজনের চোখে ঘুম নেই।

সন্ধেবেলা যাই দিলীপ রায়ের আশ্রমে। হরিকৃষ্ণ মন্দির। গান হয়। আমরা চুপটি করে বসে থাকি দাদাজির কোলের কাছে। আশ্চর্য! আমরা কেমন শান্ত হয়ে গেছি! একটি বারো বছরেরও কম বয়সের কিশোর তার অদৃশ্য উপস্থিতি বা দৃশ্যমান অনুপস্থিতি দিয়ে আমাদের চঞ্চলতায় লাগাম পরিয়ে রাখে। ঠিক যেমনভাবে সে ছুটিছাটায় কলকাতায় এলে আমাদের পিপারমেন্ট লজেন্স দিয়ে বশ করে রাখত। এই লেখা লিখতে লিখতে সেই লজেন্সের মোড়ক খুলছি মনে মনে। কোম্পানির নাম মনে নেই। সাদা একটু পেটমোটা লম্বাটে লজেন্স। স্বচ্ছ কাগজে সবুজ রঙে কোম্পানির নাম লেখা।

আর…ওই পুণার বাড়িতে আমার প্রথম কান্তকবিকে চেনা শুরু। তাঁর গান দিয়ে। অদ্ভুত নীরক্ত মুখে এক সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা রিক্ততা সর্বাঙ্গে জড়িয়ে পিসিমণি বসে থাকত ঠাকুরঘরে। তার মোমের মতো ফর্সা মুখ, গোলাপি গাল, পরনে কী সাধারণ একটা ইস্ত্রিবিহীন সুতির শাড়ি! কপালে চেনা টিপ নেই, ঠোঁটে হাসি হারিয়ে গেছে, শরীর রুপটানবিহীন, আভরণশূন্য। তার দিন আর রাত্রির কোনো ফারাক নেই যেন। পৃথিবী চলছে নিজস্ব নিয়মে, শুধু তার জীবনযাপনের ঝিরঝিরে রুপোলি নদীটি থমকে গেছে।

ঠাকুরঘরে বসে আছে পিসিমণি। আর একটি গান ঘুরেফিরে ঘুরেফিরে বেজে যাচ্ছে বৈঠকখানা ঘরের রেকর্ড প্লেয়ারে। রজনীকান্তর গান। তখন সে গানের শুধু সুর চিনেছিলাম, বাণী বুঝিনি, বুঝিনি তার অর্থ আর আর্তি। এটুকু শুধু অনুভব করেছিলাম, কোথাও না কোথাও এই গান পিসিমণির হাত ধরে থাকে খুব আদর করে। কখনো না কখনো এই গান পিসিমণিকে দাদাভাইয়ের কাছে হয়তো পৌঁছিয়েও দেয়!

ছবি রয়ে গেছে অজস্র। সাদা-কালোয়। সাদা -কালোই তো! সে তো রঙিন বয়স রঙিন জীবন ছুঁতেই পারেনি! আমরা চুলের আনাচে কানাচে রুপোলি তার খুঁজি। সে রয়েই গেছে ঝকঝকে চোখে, খুব সামান্য প্রায় চোখে না পড়া ঠোঁট টেপা হাসিতে। আটকে রয়েছে এগারো বছর ন'মাস বয়সের পলকা কাঁচা বাঁশের কঞ্চির খাঁচায়।

আমরা …আমরা দু'জন এখন আর ভাইফোঁটা দিই না। কাউকেই।

 

Developed by DXDasia