‘রাধারমণ কেমন আছইন হাসন রাজা জানতে চায়’

বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
রাজবৈদ্য চক্ৰপাণি দত্তের অধস্তন পুরুষেরা শ্ৰীহট্টের প্রাচীন সভ্রান্ত বংশ। এই বংশের জনৈক প্রভাকর দত্ত ও কেশব দত্তের নামে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানার অন্তৰ্গত দুটি গ্রাম নামাঙ্কিত আছে। প্রভাকর দত্তের থেকে দ্বাদশ পুরুষে রাধারমণ দত্তের জন্ম, সুনামগঞ্জ মহকুমার জগন্নাথপুর থানার অধীন আতুয়াজন পরগনার কেশবপুর গ্রামের রাধামাধব দত্তের ঘরে, ১২৪০ বঙ্গাব্দে। মাতা সুবৰ্ণ দেবী। পিতৃদেব রাধামাধব পরম পণ্ডিত ও অশেষ গুণের অধিকারী ছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় তাঁর রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে জয়দেবের গীতগোবিন্দেরস-ছন্দটীকা, ভারত সাবিত্রী ও ভ্রমর গীতা। বাংলা রচনার মধ্যে কৃষ্ণলীলা কাব্য, পদ্মপুরাণ, সূর্যব্রতের গীত, গোবিন্দ ভোগের গানইত্যাদি উল্লেখ্য। বৈষ্ণব সহজিয়া ধর্মের প্রতিও তার অনুরাগ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। রাধারমণের কৈশোরেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়।

প্রথম জীবন থেকেই রাধারমণ তত্ত্বজিজ্ঞাসু ছিলেন। এই কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই তিনি শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি নানা মতের চর্চাচৰ্যা করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁর সন্তোষ বিধান হয়নি।

১২৭৫ বঙ্গাব্দে শ্ৰীহট্টের মৌলবীবাজার মহকুমার সদর থানার আদপাশা গ্রামে তিনি মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দের বংশে নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীর পাণিগ্রহণ করেন। রাধারমণের চার পুত্রের তিনজনের এবং স্ত্রী গুণময়ী দেবীর অকাল প্ৰয়াণে রাধারমণ সংসারে বিমনা হয়ে পড়েন এবং এরই কাছাকাছি সময়ে তঁর পঞ্চাশ বছর বয়সে মৌলবীবাজারের সন্নিকট ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্য গোস্বামীর অলৌকিক কার্যকলাপ ও সাধনার খবর পেয়ে তাঁর কাছে এসে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে তার সহজ সাধনার শুরু এবং তখনই গৃহত্যাগী হয়ে বাড়ির কাছেই নলুয়ার হাওরে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সরে যান। তাঁর গানেও এর সমর্থন মেলে,

‘অরণ্য জঙ্গলার মাঝে বাধিয়াছি ঘর
ভাই নাই বান্ধব নাই কে লইব খবর’

সেই আশ্রম তখন ভক্তবৃন্দে ভরে যায় এবং ভক্তবৃন্দ সহ রাধারমণ অহোরাত্র সংকীর্তনানন্দে মেতে থাকেন। ধ্যান মগ্ন সেইসব পরিবেশেই তাঁর গীতসমূহ রচিত হতে থাকে। শোনা যায় নিজে বড় গান লেখেননি স্বহস্তে, তিনি গীতসমূহ রচনা করে করেই গেয়ে যেতেন এবং ভক্তবৃন্দ তা মুখস্থ করে বা স্মৃতিতে ধরে বা লিখে রাখতেন। তাঁর গীতসমূহের সংখ্যা সহস্রাধিক’ বলে জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন। আমাদের ধারণা আরো অনেক অনেক বেশি গান তিনি রচনা করে গেছেন। যদিও রাধারমণের স্বগৃহে আমরা খুব বেশি সংখ্যক গান পাইনি, তবু কেশবপুর গ্রামেই এখনো প্রচুর অসংগৃহীত গান ছড়িয়ে আছে, নানা কারণে আমরা তাঁর অংশমাত্র সংগ্রহ করতে পেরেছি। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের অন্যত্রও হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দেশ বিভাজনের পর তাঁর ভক্তরা অনেকেই আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গে ও অন্যত্র সরে এসেছেন। তাঁদের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করা নানা কারণে কষ্টকর হয়ে পড়ায় আমাদের সংগ্ৰহ সংখ্যা আশানুরূপ হতে পারেনি, অথচ ঢাকার অধ্যক্ষ দেওয়ান আজরফ সাহেবের মাধ্যমে জানা গেছে যে সুনামগঞ্জের জামাইপাড়ার জনৈক শ্ৰীযুক্ত সতীশ রায়ের সংগ্রহেই একসময় সহস্রাধিক গানের সংগ্রহ ছিল। এও জানা যায় শ্ৰীযুক্ত সতীশ রায় কাছাড়ের শিলচরে এসে কিছুকাল বসবাসের পরই লোকান্তরিত হন এবং তঁর আত্মীয় স্বজনেরা কেউ সেই সংগৃহীত গীতরাশির কোনো হদিশ দিতে পারেননি।

আরও পড়ুন
হাসন রাজার গান

শ্ৰীহট্ট বা তার সন্নিহিত অঞ্চলে বাংলা তথা ভারতীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের পদাবলি কিছু কিছু গীত হলেও হাটে, ঘাটে, মাঠে এবং ভজনালয়সমূহে সর্বত্রই রাধারমণের গীতসমূহের বিশেষ প্রচলন। এছাড়া এই অঞ্চলের হিন্দু মুসলমান সাধারণ মানুষের মধ্যে ওই গান সমান জনপ্রিয়। তাঁর গানের ক্ষুদ্র-বৃহৎ যে তিনটি সংকলন এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে সেই সংকলন সবকটিরই সম্পাদনা গুণগ্ৰাহী মুসলমানদের হাতে। প্রথমটি, রাধারমণ সংগীত, সম্পাদক, মোহাম্মদ আসরাফ হোসেন, সাহিত্যরত্ন, ভানুগাছ, শ্ৰীহট্ট, (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ), দ্বিতীয়টি “ভাইবে রাধারমণ বলে’ (১৯৭৭) সম্পাদনা–হাসন পছন্দ মুহম্মদ আবদুল হাই, সুনামগঞ্জ শ্ৰীহট্ট এবং তৃতীয় গ্রন্থ রাধারমণ সংগীত (১৯৮১) সংগ্ৰহঃ চৌধুরী গোলাম আকবর, সাহিত্য ভূষণ, প্রকাশক মদনমোহন কলেজ প্রকাশন সংস্থা, শ্ৰীহট্ট। শ্ৰীহট্টের অপর উল্লেখ্য রবীন্দ্রসমাদৃত লোককবি হাসন রাজাও (গ্রন্থ হাসন উদাস) রাধারমণের সমসাময়িক। কথিত আছে তাঁরা দুজনেই দুজনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, হাসন রাজার একটি গানে নাকি রাধারমণ প্রসঙ্গ রয়েছে, ‘রাধারমণ কেমন আছইন হাসন রাজা জানতে চায়’ কিন্তু রাধারমণের কোনো গানে আমরা এযাবৎ হাসন রাজা প্রসঙ্গ পাইনি।

রাধারমণের গুরু রঘুনাথের সম্বন্ধে নানা অলৌকিক কাহিনী শ্ৰীহট্টের জনশ্রুতিতে রয়েছে, রাধারমণ সম্বন্ধেও কিছু কিছু কিংবদন্তি রয়েছে, রাধারমণের পৌত্র শ্ৰীযুক্ত রাধারঞ্জন দত্ত পুরকায়স্থের মৌলবীবাজার সন্নিকট ভুজবল গ্রামের বাড়িতে সাক্ষাৎ আলাপে যা আমাদের গোচর হয়েছিল।

১৩২২ বঙ্গাব্দের ২৬শে কার্তিক শুক্রবার শুক্লা ষষ্ঠী। তিথিতে এই কবিসাধকের দেহান্ত হয়। কেশবপুর গ্রামে তাঁর সমাধিতে এখনো প্রতি সন্ধ্যায় প্ৰদীপ জ্বলিয়ে কীর্তন করে তাঁর ভক্ত সাধকেরা গুরু রাধারমণের স্মৃতি রক্ষা করে চলেছেন এবং সেই গ্রামেই সম্প্রতি একটি স্মৃতিরক্ষা কমিটি করে স্থানীয় জনসাধারণ দ্বারা কবির রচনাবলীর উপর গবেষণা কাৰ্য চালাবার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

( ঋণ – বাউলকবি রাধারমণ গীতি সংগ্রহ, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী সম্পাদিত)

Developed by DXDasia