
পূর্ণকুমারী দাসী ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটি শুরুই করলেন ‘তোমায়ে চিনি গো চিনি গো ওগো বিদেশিনী’ বলে
কলকাতায় তখন গান বলতে ওই দাশু রায়ের পাঁচালি, নিধুবাবুর টপ্পা, গড়ানহাটি কীর্তন কিম্বা বাগবাজারের পক্ষিদলের গান। এমন সময়, এক গণ্যমান্য ব্যক্তির নয়া গানের হদিশ মিলল শহরে। লোকে বলতে লাগল, ‘এ হল গিয়ে আমাদের জোড়াসাঁকোর রবিবাবুর গান’। গানের কথার এমন আবেদন এমন আবেগ, বহুকাল শোনা যায়নি বাংলা গানে। প্রেমের নিবেদন আত্মার সমর্পণ সবই যেন গিয়ে মিলেছে সেই ঈশ্বরের পায়ে। তাছাড়া গানের পরতে পরতে উপলব্ধি করা যায় নিজের মনের কথাও। দেখতে দেখতে এমন গান যখন নানা সূত্র ধরে অবিদ্যাপাড়ায় পা ফেলল তখন সেই রবিবাবুর গান নিয়ে বাঙালি বাঈজিদের উৎসাহের অন্ত নেই। সেই উৎসাহের ঢেউ এতই প্রবল যে, যেনতেন প্রকারেণ রবিবাবুর গান কণ্ঠে তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেল বাঈজিপাড়ায়।
দেখা গেল, গওহরজান, মুস্তারি বাঈদের মতো প্রথিতযশা অবাঙালি বাইজিরাও যেমন গাইছেন রবীন্দ্রনাথের গান, পাশাপাশি বাঙালি বাঈজিরাও থেমে রইলেন না সেদিন। বাঙালি বাঈদের মধ্যে পূর্ণকুমারী দাসী, কৃষ্ণভামিনী, মানদাসুন্দরী, বেদানা দাসীদের তখন আকাশছোঁয়া নাম। তাঁরাও সেদিন কণ্ঠে তুলে নিলেন রবিবাবুর গান। কিন্তু কোথায় যেন একটু কানে লাগে ওঁদের গান পরিবেশন। প্রবল তান কর্তব করেন কেউ তো কেউ আবার সুর বদলে ফেলেন। আবার প্রবল আবেগে কথাও অদলবদল করে ফেলেন অনেকে। আবেগ তো ছিলই, তার সঙ্গে এমন অদলবদলের কারণ ছিল কিছু বটতলা বাজারের প্রকাশিত গানের বই। যেমন বাংলা ১৩০৪-এ হরিচরণ প্রামাণিক প্রকাশ করলেন, কলিকাতার বেশ্যাসঙ্গীত।
এ-ধরনের নানাবিধ গানের বই যখন প্রকাশ পেতে লাগল, তার ভেতরে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ছাপা হল রবীন্দ্রনাথের গানও। বলতে গেলে এই ধরনের সংগীত গ্রন্থগুলি’ই তখন বাঙালি মহল্লার বাঈজিদের কাছে গান শেখা ও গান তোলার একমাত্র উপায়। অজস্র ভুল ছাপার কারণে গানের এবং গানের ওপরে ইচ্ছা মতন রাগরাগিণী-র নির্দেশিকা থাকায় প্রায় সকল রচয়িতার গানই নানা প্রকার বিচ্যুতিসহ গাওয়ার একটা সহজাত রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি আবেগের কারণে বিচ্যুতিও কমছিল না।
মানদাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, পূর্ণকুমারীরা সেদিন সঠিক মুদ্রিত পাঠ ও স্বরলিপি না পেয়ে আপন ভাবে নিজেদের ইচ্ছে মতো গান পরিবেশন করতে শুরু করেছিলেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের গানের সেদিন এক অন্য চেহারা। যেমন মানদাসুন্দরী দাসী যখন ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটি গাইছেন তখন ওই গানের ‘তোমায় যবে পাই দেখিতে’ কথা ক’টিকে তিনি আমূল বদলে দিয়ে গাইলেন “ওগো যদি তোমারে পাইগো দেখিতে”। এরকম আরেকটি ঘটনা দেখা গেল ১৯০৫-এ। ওই বছর পূর্ণকুমারী দাসী ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটি শুরুই করলেন ‘তোমায়ে চিনি গো চিনি গো ওগো বিদেশিনী’ বলে। আবার আরেকবার দেখা গেল ‘পুরানো সেই দিনের কথা’-কে গাইলেন ‘সেই পুরানো দিনের কথা’ বলে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছিল বাঙালি বাঈজিদের গানে। যেমন কৃষ্ণভামিনী দাসীর ‘ও যে মানে না মানা’ শুনলে মনে হবে যেন কোনও এক উস্তাদ বাঈজি কালোয়াতি গান পেশ করছেন। বেদানা দাসীর কণ্ঠে ‘আজ তোমারে দেখতে’ গানটিও পরিবেশনের ঢঙে সেদিন চটুল হয়ে উঠেছিল।
আসলে অনেকটাই নিজেদের গান শেখার কৌশল আর গান বোঝার ধারণা দিয়েই তাঁরা পেশ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান। গান পছন্দের তালিকাগুলিও ছিল – বাঈজিদের মানসভাবনা নির্ভর। আবার একই সঙ্গে গানের ভিতরের শব্দগুলিকে এমন ভাবে পালটে নিয়েছিলেন যাতে রবীন্দ্রনাথের গানের যে আধ্যাত্মিক চেতনা রয়েছে, তার মধ্যে পাওয়া গেল শৃঙ্গাররসের গন্ধ। সব থেকে বড় কথা ১৯০৫ সাল থেকে এভাবেই বাঈজিদের কণ্ঠে গানগুলি রেকর্ডবন্দিও হয়েছিল।
মূলত বাঈজিদের গান শুনতে গেলে বারমহল্লায় যাতায়াত করতে হত, তাঁদের গান এবার গ্রামোফোন রেকর্ডের হাত ধরে ঢুকে গেল বাড়ির অন্দর মহল্লায়। সেইখানে তখন রবিবাবুর গান নিয়ে বিপুল সংশয় দেখা দিল। অন্দর মহলের মেয়ে বউদের কাছে রবিবাবুর গানের সেদিন এক অন্য রকম আবেদন। এই ধারার অদল বদল ঘটতে সময় লেগেছিল আরও অনেক দিন। কিন্তু আজও এ-কথা কেউ বলেন না যে অবিদ্যাপাড়ার মেয়েদের গান পরিবেশনে সেদিন নিষ্ঠার বা ভক্তির কোনও গাফিলতি ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথের গানের ইতিহাসে এঁদের গাওয়া গানগুলিও ইতিহাসের খাতিরে মূল্যবান।
