
‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ শুনতে ভালোবাসতেন বাবা। চারু মজুমদারকে নিয়ে স্মৃতিচারণায় ছেলে অভিজিৎ মজুমদার
তখন ৬৭ সাল পেরিয়েছে। জন্ম হয়েছে নকশালবাড়ি আন্দোলনের। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে চারু মজুমদারের নাম। সমাজতন্ত্রের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি এক প্রকার হিরো অন্যদিকে পুলিশের খাতায় তিনি ওয়ান্টেড। নকশাল সন্ত্রাসের জন্মদাতা হিসাবে তাকে খুঁজছে পুলিশ। তিনি তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। আর সেই সময়ই তার বাবা চারু মজুমদারের সঙ্গে দুবার দেখা করেন কিশোর অভিজিৎ। একবার পুরীতে। সত্তর সাল। পুরীতে চারুবাবুর দলের সেন্ট্রাল কমিটির গোপন বৈঠক চলছে। পুলিশ তাকে খুঁজছে। আর তখনই মায়ের হাত ধরে বাবার সঙ্গে দেখা করতে পুরীতে হাজির অভিজিৎ মজুমদার।
অভিজিৎবাবু এখন কলেজের অধ্যাপক। তাছাড়া সিপিআইএমএল দলের জেলা সম্পাদক। তখন তিনি তো ছোট। গরমের ছুটি চলছে। এক মাস ছিলেন পুরীতে। সময় কাটিয়েছেন পুরীর সমুদ্র সৈকতে। আর সেই সময়ই সুযোগ বুঝে বাবার সঙ্গে একটু করে দেখা করা। চারুবাবু তাঁর কাজের ফাঁকেই কিশোর অভিজিৎ-এর হাত ধরে সমুদ্রের পাশ দিয়ে হেঁটেছেন। সত্তর সালেই ভাইজ্যাকে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা বাবার সঙ্গে দেখা করেছেন অভিজিৎবাবু। তখন শ্রীকাকুলামের লড়াই শুরু হয়েছে। বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অভিজিৎবাবু বলেন, ‘পুরীর সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম। বাবা গান শুনতে ভালোবাসতেন। তার পছন্দের তালিকায় ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতও।‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ বা ‘যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি’ বারবার শুনতে চাইতেন। প্রিয় শিল্পী ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস।আমার মেজদি ভালো গান গায়।বাবা আমার কাছে হিন্দি গান শুনতে চাইতেন। হিন্দি গান মানে ওটা অপসংস্কৃতি এমনটা বলতেন না বাবা। কোনও সিদ্ধান্ত তিনি চাপিয়ে দিতেন না। তাছাড়া হিন্দি গান শুনতে চাইলেন মানে বাবা আপডেট থাকার চেষ্টা করতেন। আমি একটা হিন্দি গানের দুচার লাইন গাইলাম। তা শুনেই বাবা বুঝে নিলেন, পুরো নার্ভ। বাবার মনের উদারতাও ছিলো বিরাট। শিলিশুড়ির প্রাচীন সাংস্কৃতিক ক্লাব মিত্র সম্মিলনীতে এক সময় নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন চারুবাবু। তিনি সেইসময় অনেককেই আবৃত্তি শেখাতেন। তিনি একসময় মিত্র সম্মিলনীর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন।
তার বাবার স্মৃতি চারণায় অভিজিৎবাবু বলছিলেন, বাবার কাছে আমায় অঙ্ক শেখার সুযোগ হত। বেশিরভাগ সময়ইতো বাবা জেলে কাটিয়েছেন। একবার জেল থেকে বেরিয়েছেন, একবার প্রবেশ করেছেন। তার মধ্যেই অঙ্ক শেখানোর পাশাপাশি বাংলা বানান শেখাতেন বাবা। অঙ্ক বা বানান ভুল করলে বকতেন, মারতেনও। আবার ভালোওবেসেছেন। বাবাকে দেখার জন্য মায়ের হাত ধরে কখনও ছুটেছি প্রেসিডেন্সি জেল, কখনও দমদম সেন্ট্রাল জেল। সেখানে দেখেছি পুলিশকর্মীরা অপরিসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বাবাকে। বাবা তো উপার্জনই করতেন না। তাঁর কাছে পয়সা কি চাইব। অভিমান থাকলেও আমাদের কিন্তু সম্মান ছিল। শহরে মাথা উঁচু করে চলতাম বাবার জন্যই।
বাবাকে দেখেছি অনেক ছোট ছোট কাজের বেশি মূল্য ছিল তাঁর কাছে। আমাদের পুরনো মাটির বাড়ির সামনে বৃষ্টি হলে জল জমতো। বাবা কিন্তু অসুস্থ হলেও নিজে হাতে কোদাল নিয়ে নর্দমা পরিষ্কার করতেন। যাতে উঠোনে জল জমে না থাকে। সময় হলে ঘরে রান্নাও করে দিতেন বাবা। বাবার একটা বিশেষ সাংস্কৃতিক দিক ছিল। সেই সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রতিদিন দুপুরে হিন্দুস্থান ক্ল্যাসিক্যাল হত। বাবা তার বড় সমঝদার ছিলেন। তিনি পালা করে তা শুনতেন। তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীতের বড় ভক্ত ছিলেন। কাজেই যারা বলেন, আমার বাবা চাকু বা বন্দুক নিয়ে থাকতেন, সবসময় ভয় ধরানো একটি লোক, ব্যাপারটা আদৌ তা নয়।
