
বাংলার ভোজসভায় সর্বপ্রথম বাংলা ‘মেনুকার্ড’-এর জন্ম দিয়েছিলেন প্রজ্ঞাই
রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশতম জন্মদিন। অতিথি-অভ্যাগতদের ভিড়। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রয়েছে খাবার-দাবারের আয়োজন। ঠাকুরবাড়ির নিমন্ত্রণ বলে কথা, তার ওপর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসব। পদ-নির্বাচনে রুচি ও যত্নের ছাপ তাই অবধারিত। বিশেষ কোনও মেনুও তো প্রয়োজন এমন দিনে। হেমেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে প্রজ্ঞাদেবী কবিগুরুর জন্য বানালেন একটা বিশেষ ধরনের বরফি। ফুলকপি, খোয়া ক্ষীর, বাদাম, কিশমিশ, জাফরানপাতা, সোনা রুপোর তবক দিয়ে তৈরি এই বরফির নাম তিনি দিয়েছিলেন— ‘কবিসম্বর্ধনা বরফি’। যেমন নাম, তেমনই স্বাদ। খেয়ে তারিফ করেছিলেন সবাই। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও নাকি বুঝতে পারেননি, বরফি তৈরি হয়েছে ফুলকপি দিয়ে।
এমন সব আশ্চর্য খাবার বানিয়ে অনায়াসে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারতেন প্রজ্ঞাদেবী। শুধু নতুন নতুন খাবার তৈরিই নয়, তাদের নামও দিতেন বেশ রসিয়ে। এইভাবে কত নতুন ‘শ্রুতিমধুর’ ও সুস্বাদু খাবারের সন্ধানই যে তিনি দিয়ে গেছেন রসনাপ্রিয় বাঙালিদের। তবে, প্রজ্ঞাদেবীকে নিছক রন্ধনপটীয়সী বললে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। তাঁকে বরং বলা যেতেই পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রথম রন্ধন-গবেষিকা। রান্না নিয়ে রীতিমতো বইও লিখেছিলেন তিনি। তিন খণ্ডের ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ তখন রাখা থাকত যে কোনও রুচিশীল গৃহস্থের ঘরেই।
প্রজ্ঞাদেবীর রান্নার বইয়ের সূচীপত্র
রান্নাঘরের অদ্ভুত সব শব্দ তাঁর বইতে সাজিয়ে দিয়েছেন প্রজ্ঞা। যেমন, ফোড়ন ফাটার শব্দ ‘চুটপূট’, কাঁচাটে বিস্বাদ গন্ধ ‘হালসে’, ডাল রাঁধবার চওড়া মুখ হাঁড়ি ‘তিজেল হাঁড়ি’, ফোড়ন দেওয়া মানে ‘ছুঁকা’ ইত্যাদি। লিস্টি শেষ হওয়ার নয়। কচি আমের মুখচলতি নাম নাকি ছিল ‘কড়ুই আম’, আবার কচি লেবুকে লোকে বলত ‘কড়াই লেবু’। উচ্চারণের বৈষম্য কবেই বা যুক্তিবোধকে ব্রহ্মা বলে ভেবেছে! প্রজ্ঞাদেবী তুচ্ছাতিতুচ্ছ শব্দকেও বড় যত্নে তুলে এনেছিলেন তাদের দৈনিক আটপৌরতা-সমেতই। তাঁর বইতে ঠাঁই পেয়েছিল তৎকালীন হেঁশেলের নিজের ভাষা, বাংলার গৃহবধূদের নিজস্ব ‘সোশিওলেক্ট’। সঙ্গে ছিল রকমারি বাসন-কোসন, রান্নাঘরের নানা পদের নানা উপাচার, পরিভাষা। নিছক রন্ধনশিল্প নয়, তার সঙ্গে গার্হস্থ্যবিজ্ঞান, এমনকি লোকসংস্কৃতি চর্চাতেও তাই প্রজ্ঞার ভূমিকা ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
আসলে, ঠাকুরবাড়ির মেয়ে তো। একটা বিশেষ চোখ ও মানসিক গড়নের সূত্রপাত হয়ে গেছিল ওখানেই। বাবা হেমেন্দ্রকুমার নিজেও রান্না নিয়ে চর্চা করতে ভালোবাসতেন। বাকিটা প্রজ্ঞার নিজস্ব প্রেম ও গবেষণা। তাই, ‘বিনা পেঁয়াজে পেঁয়াজের গন্ধ করা’ থেকে শুরু করে বাসি-তাজা মাছ চেনার উপায়ের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় নানাকিছুর শুলুক সন্ধান তিনি বড় সহজে বুঝিয়ে দেন গৃহিণীদের। “গঙ্গা হইতে সদ্য ধরা ইলিশ মাছটি দেখিবে নৌকোর মতো বাঁকা, যত বেলা বাড়িবে ক্রমশ সোজা হইতে থাকিবে”। সামান্য, কিন্তু বড়ই নিবিড় এই পর্যবেক্ষণ। কবিরাজির শিক্ষেও কম-বেশি ছিল প্রজ্ঞার। নানা পথ্য, আলুইয়ের বড়ি তৈয়ারির নানা নির্দেশ থেকে তা স্পষ্ট।
আরও পড়ুন
চির’সবুজ’ প্রমথ চৌধুরী
তবে, বাংলার ভোজসভায় প্রজ্ঞার সবচাইতে বড় অবদান বোধহয় বাংলায় ‘মেনুকার্ড’-এর জন্ম দেওয়া। তাঁর নিজের ভাষায় ‘ক্রমণী’। বিলেতের ভোজসভায় মেনুকার্ডের চল তখন ভালোই। প্রজ্ঞা ঠিক করলেন বাংলার ধাঁচেও মেনুকার্ড বানাবেন। ছাপা যদি ব্যয়বহুল হয়, কুছ পরোয়া নেহি। হাতে সুন্দর করে লিখে দেওয়ালে টাঙিয়ে দিলেই হল। এরফলে, প্রজ্ঞার হাতে যে যে ক্রমণী জন্ম নিল, সেগুলি নিছক তৎকালীন ঠাকুরবাড়ির ভোজের ঐতিহাসিক নথিমাত্র নয়, ঘোরতর শিল্পের সামগ্রী। একটা নিরামিষ ক্রমণীর দিকে চোখ বোলালেই কারণটা স্পষ্ট হবে–
‘জাফরাণী ভুনি খিচুড়ি
ধুঁধুল পোড়া শিম বরবটি ভাতে
পাকা আম ভাতে
পটলের নোনা মালপোয়া
পাকা কাঁঠালের ভূতি ভাজা
কাঁকরোল ভাজা
ভাত
অড়হর ডালের খাজা
লাউয়ের ডালনা
বেগুন ও বড়ির সুরুয়া
ছোলার ডালের ধোঁকা
বেগুনের দোল্মা
আলুবখরা বা আমচুর দিয়ে মুগের ডাল
পাকা পটলের ঝুরঝুরে অম্বল
ঘোলের কাঁঢ়ি
রামমোহন দোল্মা পোলাও
নীচুর পায়স
নারিকেলের বরফি।’
এ যেন আস্ত মুক্তক কবিতা। নিরামিষ মেনুও যে কেমন সরস হয়ে উঠতে পারে জাদুছোঁয়ায়, তার প্রমাণ এখানে। কত খাবার আমাদের আর চেখে দেখার সুযোগই হবে না এ জন্মে। পটলের ঝুরঝুরে অম্বল, ঘোলের কাঁঢ়ি, নীচুর পায়স, পটলের মালপোয়া, কাঁঠালের ভূতি ভাজা—কেউ কখনও খেয়ে দেখেছেন এইসব? অনেক পদের আবিষ্কর্ত্রী প্রজ্ঞা নিজেই। শুধু পদ নয়, পদের নামও তাঁর রসিক মস্তিষ্কপ্রসূত। যেমন, ‘রামমোহন দোল্মা পোলাও’? নতুন পদ বানালে তাতে জুড়ে দিতেন প্রিয়জন বা বিখ্যাতজনেদের নাম। আগেই বলা ‘কবিসম্বর্ধনা বরফি’ ছাড়াও ‘দ্বারকানাথ ফির্নিপোলাও’ এই তালিকার মধ্যে পড়ে। নিজের অকালমৃতা মেয়ের নামও প্রজ্ঞা জুড়ে দিয়েছিলেন নতুন পদের সঙ্গে—সুরভি পায়েস।
শুধু নানা পদ নয়, নানাধরনের পানসাজা ও মশলা তৈরিতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন প্রজ্ঞা। প্রায় বারো রকমের পান সাজার কথা লিখেছেন নিজের বইতেই। এরমধ্যে মিঠা পান পোলাও তাঁরই আবিষ্কার। তাছাড়া, নানাজাতের চুন-খয়ের, মশলা তৈরির গোপন রেসিপি তো রয়েছেই।
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের ক’জনের কথাই বা আমরা মনে রেখেছি? জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, কাদম্বরী দেবী, স্বর্ণকুমারী, ইন্দিরা, সরলাদেবীর মতো কয়েকজন আজও আলোচিত হন। কখনও নিজগুণে, কখনও বিতর্কের চাহিদায়। এদের ভিড়ে কোথায় চাপা পড়ে গেছে প্রজ্ঞার নাম। স্বামী আধুনিক অহমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া। যাঁকে নাকি বিয়ের দিন দেখেই ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন প্রজ্ঞা। কারণ, আগে কোনওদিন না দেখা লক্ষ্মীনাথকেই নাকি স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনি। লক্ষ্মীনাথও নাকি প্রজ্ঞাসুন্দরীর ছবি দেখেই এক কথায় রাজি হয়ে গেছিলেন বিয়েতে। বেজায় মজার গপ্পো সেইসব। কিন্তু, প্রজ্ঞা তো স্বামীর মতো বিখ্যাত লেখক নন। তাছাড়া, এরই সঙ্গে আছে ঠাকুরবাড়ির সর্বগ্রাসী সম্মোহক আলো। তার তলায় প্রজ্ঞাদেবীর হদিশ খোঁজার প্রয়োজন বিশেষ উপলব্ধি করেনি সময়। অথচ, তিনি আমাদের যেটুকু দেওয়ার দিয়ে গেছেন। সেই উনিশ শতকীয় ঘেরাটোপের মধ্যে থেকেই। রন্ধনশিল্প তো ভূমিকা মাত্র, তলায় রয়েছে নারীভাষা, গার্হস্থ্যের ভাষা, লোকসংস্কৃতির এক আশ্চর্য জগৎ। প্রজ্ঞাকে ভুলে যাওয়া আর যাই হোক গৌরবের বিষয় না।
