
“প্রবল গরমেও জানালা বন্ধ করতে দিতেন না” বাবাকে নিয়ে মীরাদেবীর ‘স্মৃতিকথা’
মীরাদেবী রবীন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে (Rabindranath’s Youngest Daughter)। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে মীরাদেবী (Mira Devi) একটা সময়ের পর শান্তিনিকেতনেই থাকতেন। নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে মানসিক দূরত্বের কারণে তাঁরা একসঙ্গে থাকতে পারেননি। মনের কষ্টের কথা সেভাবে কাউকে বলতেন না মীরাদেবী। রবীন্দ্রনাথ আগলে রেখেছিলেন ছোটো মেয়েকে। মীরাদেবীর লেখা ‘স্মৃতিকথা’ (Smritikatha) থেকে রবীন্দ্রনাথের স্নেহপ্রবণ পিতৃহৃদয়ের কথা জানা যায়। মেয়ের কলমে বাবার অবয়ব স্পষ্ট হয়।
মীরাদেবী প্রথমবার শান্তিনিকেতন (Santiniketan) যাওয়ার গল্প বলেছিলেন। ট্রেনে চড়ে অবধি এক আশ্চর্য উদ্দীপনা অনুভব করছিলেন ছোট্ট মীরা। স্টেশনের বাইরে তাঁদের জন্য একটি বড়ো আয়তনের বাসের মতো দেখতে গোযান দাঁড়িয়েছিল। ভিতরে অনেকটা বসার জায়গা। গাড়িটা টেনে নিয়ে গিয়েছিল চারটে হৃষ্টপুষ্ট বলদ। শান্তিনিকেতনে দোতলার একটি ঘর, বাবা, মা, ভাই, বকুলগাছতলায় খেলার জায়গা, শিশিরভেজা শিউলিফুলের গন্ধ—এইসব নস্টালজিয়া মীরাদেবীর লেখা স্মৃতিকথায় রয়েছে।
ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের অনেক কথা জানা যায় মীরাদেবীর কথন থেকে। রবীন্দ্রনাথের ছিল সিঁড়ির শখ। তাঁর যেকোনো বাড়িতেই অন্তত দুটো করে সিঁড়ি থাকতই। লেখক রবীন্দ্রনাথকেও কাছ থেকে দেখেছেন মীরাদেবী। সেই যে সকালবেলায় লিখতে বসতেন রবীন্দ্রনাথ, একমাত্র স্নানাহারের সময় ছাড়া উঠতেন না। লেখা তাঁর কাছে তপস্যা ছিল। তখন শান্তিনিকেতনে গ্রীষ্মকালে গরম লু বইত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রবল গরমেও জানালা বন্ধ করতে দিতেন না। এই সূত্রে মীরা দেবী মজা করে লিখছেন ,‘বাবা জন্মেছেন বৈশাখের খররৌদ্রে। তাই বোধহয় রোদকে ভয় কয়তেন না। সূর্যের সঙ্গে তাঁর মিতালি ছিল।’ মীরাদেবী মাতৃহীন সেই ছেলেবেলাতেই। ব্যস্ত বাবা রবীন্দ্রনাথ কিন্তু মেয়ের মুখ দেখেই বুঝে যেতেন মেয়ে মনে ব্যথা পেয়েছে। মীরাদেবী লিখছেন, ‘বাবার কাছে এত স্নেহ পেয়েছি যে মা’র অভাব কোনোদিন বোধ করিনি।’

মীরা দেবী লিখেছেন, ‘বাবা আমাদের মায়ের অভাব বুঝতে দেননি, আবার অতিরিক্ত আদর দিয়ে নষ্টও করেননি।’
মীরাদেবী রবীন্দ্রনাথকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমন ভয়ও পেতেন। তিনি বকতেন না। কিন্তু সন্তানরা কোনো অন্যায় করলে তাঁর দিকে তাকাতে পারতেন না। মীরাদেবী অনেকসময় বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরতেন। ভয়ে বাবাকে কিছু বলেননি। রবীন্দ্রনাথ দেখেই বুঝতেন। আদা দিয়ে চা খেতে বলতেন। নিজের লেখাপড়া সামলেও মেয়েকে পড়াতে বসাতেন। গোল্ডেন ট্রেজারি থেকে বেছে বেছে কবিতা শোনাতেন। মুখস্থ করিয়ে দিতেন। লিখে লিখে মুখস্থ করার কথা বলতেন। বয়সের তুলনায় একটু শক্ত বিষয় পড়াতে পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ। কারণ এইসব শক্ত বিষয় ছেলেমানুষকেও ভাবতে শেখায়। এইভাবে টেনিসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা, সোরাব ও রুস্তমের কাহিনি, এনক আর্ডেন ইত্যাদি সাহিত্য পড়া হল মীরার। বায়রনের কবিতা পড়তে অত ভালো লাগত না মীরার, এনশেন্ট হিস্ট্রি পড়তে ভালো লাগত। তাঁর লেখার থেকে শিক্ষক রবীন্দ্রনাথের কথাও জানা যায়। বিদ্যালয়ের কাজকর্মের নিয়মিত খোঁজ নিতেন রবীন্দ্রনাথ। রাত্তিরে ছেলেরা শোয়ার পর তাদের ঘর একবার ঘুরে দেখে আসতেন সবাই ঠিকমতো মশারি গুঁজেছে কীনা। ছাত্রদের কারো অসুখ করলে নিজে গিয়ে ওষুধ খাইয়ে আসতেন। মীরাদেবীর নিজেরও ওষুধ খাওয়ার অনীহা ছিল। সুধাকান্তের উপর দায়িত্ব থাকত মীরাকে ওষুধ খাওয়ানোর। জ্বর হলে রবীন্দ্রনাথ এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। মীরা দেবী লিখেছেন, ‘বাবা আমাদের মায়ের অভাব বুঝতে দেননি, আবার অতিরিক্ত আদর দিয়ে নষ্টও করেননি।’
ছেলেমেয়ের সঙ্গে মজাদার ইনডোর গেম খেলতেন রবীন্দ্রনাথ। গল্প লেখার খেলা! রান্নার বিষয়েও রবীন্দ্রনাথের নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করার স্মৃতিচারণ করার কথা বলেছিলেন মীরা। একবার ঘিয়ের বদলে ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে আটা মেখে খাইয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মীরাদেবীর স্মৃতিচরণায় অনেকেই এসেছেন—শাক্ত চাষী রবি সিংহ, গৌর ও শ্যাম নামের দুই গাইয়ে এবং রোগা ছিপছিপে এক ডাকাত যে পরে গৃহী হয়ে গিয়েছিল এবং রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমারের কথা এবং তাঁর স্ত্রী সুধাদেবীর কথাও। কিন্তু সব স্মৃতির চেয়ে মধুর ছিল তাঁর বাবার কথা!
সহায়ক বই
স্মৃতিকথা, মীরা দেবী
