‘হাসিতে তোমার পরিচয়’ – ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ

আর্জেন্টিনার মেয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, রবীন্দ্রনাথ ডাকতেন ‘বিজয়া’ বলে

রবীন্দ্রনাথ এক উপলব্ধির নাম। তাঁর শব্দগুলিই ব্রহ্ম— একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। শব্দের ম্যাজিকেই দেশ বিদেশের পাঠকের মন ছুঁয়ে গেছে রবীন্দ্রসাহিত্য। আবার কখনো তাঁরাও ছুঁয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথকে। কথা হয়ে, স্মৃতি হয়ে, ব্যথা হয়ে। এইভাবেই প্রবীণ রবীন্দ্রনাথের জীবনে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার এক মেয়ে — ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডাকতেন বিজয়া বলে। জীবনের শেষ প্রহরেও রবীন্দ্রনাথ এই বিদেশিনীকে মনে রেখেছিলেন। শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৩০ সালে। তারপর চিঠির পাতায়, স্মৃতিচারণের ছন্দে কোনোরকম প্রত্যাশা ছাড়াই ধরা ছিল তাঁদের বন্ধুত্ব। কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা সেই বন্ধুত্বের অন্তরায় হতে পারেনি। 

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছিলেন আর্জেন্টিনার বুদ্ধিজীবী এক লেখিকা। ল্যাটিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। বিখ্যাত পত্রিকা ‘সুর’-এর সম্পাদনা করতেন। ল্যাটিন আমেরিকার সব বিখ্যাত লেখক-লেখিকা লিখেছেন এই পত্রিকায়। ভিক্টোরিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউনেস্কোর সদস্য হয়েছিলেন। একবার আর্জেন্টিনার শাসক পেরনের প্রকাশ্য বিরোধিতার জন্য ১৯৫৩ সালে কারাবরণও করতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিনি আর্জেন্টিনার শিক্ষার উন্নয়নের জন্য দান করেছিলেন। ব্যক্তিত্বময়ী, বিদূষী এই নারীর কিন্তু তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। মূলত ফরাসী ভাষা জানতেন। ইংরেজি বলতেন ভাঙা ভাঙা। তবু দৃপ্ত এবং আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল এই নারী রবীন্দ্রনাথের মন জয় করে হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘বিজয়া’।

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ফরাসী অনুবাদ পড়ে প্রথম রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন ভিক্টোরিয়া। তখন তাঁর নিজের দাম্পত্যজীবন ভাঙনের পথে এবং আর  একটি সম্পর্ক তাঁকে দ্বিধাগ্রস্ত করে রেখেছে। এইসময় রবীন্দ্রনাথের কাব্য তাঁর কাছে মনের আরাম হয়ে এল। তখন থেকেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জাগত তাঁর মনে। সুযোগ হল ১৯২৪ সালে। রবীন্দ্রনাথ পেরু আর মেক্সিকো ভ্রমণের পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আসলে তিনি রওনা দিয়েছিলেন প্যারিসের পথে। প্রথমে সঙ্গে ছিলেন রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমাদেবী, নাতনি পুপে এবং শিল্পী সুরেন কর। মাঝপথে তাঁরা নেমে গেলেন ও রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনা যাবেন বলে উঠে পড়লেন  আন্ডেস জাহাজে। এবার তাঁর সঙ্গী হলেন এলমহার্স্ট। কিন্তু জাহাজে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিশ্রামের জন্য ওঠেন প্লাজা হোটেলে। এখানেই ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নিজে থেকে আসেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন La Nacion পত্রিকায় লিখছেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘La Algeria de leer a Rabindranath Tagore’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ পড়ার আনন্দ’। প্রথম দেখার অনুভূতি লিখে রেখেছেন ভিক্টোরিয়া নিজের ভাষায়। রবীন্দ্রনাথকে তিনি দেখেছেন মুগ্ধ হয়ে। নীরব, সুদূর, তুলনাহীন  বিনীত— এইরকমই ছিল তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের বিশেষণ। রবীন্দ্রনাথ প্রায় তাঁর বাবার বয়সী অথচ তাঁর সোনালি শরীরের স্নিগ্ধতা ম্লান হয় নি এতটুকু। অসুস্থ কবিকে নিজের দায়িত্বে তিনি নিয়ে গেলেন একটি বাড়িতে। সান ইসিদ্রোয় এই বাড়িটির নাম ছিল ‘মিরালরিও’। বাড়িটি ছিল কবির উপযুক্ত, অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। ওক গাছ, সবুজ ঘাস, নাম না জানা ফুল আর প্লাতা নদী! কবি এখানে ছিলেন রাজকীয় ভাবে। শোনা যায়, এই বিলাসবহুল বাড়ির ব্যয়ভার বহন করার জন্য ভিক্টোরিয়া নিজের হিরের অলঙ্কার পর্যন্ত বিক্রি করেছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত পরিচারিকাকে রেখেছিলেন কবির সেবাযত্নের জন্য। নিজে আসতেন নিত্যদিন রবীন্দ্রনাথের জীবনে নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে। এই সময় রবীন্দ্রনাথ যে কবিতাগুলি লিখেছিলেন সেগুলি যেন এক অনুরক্ত প্রেমিক কবির লেখা। ভাষার দূরত্ব তো ছিল ভিক্টোরিয়া আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। কিন্তু তা তাঁদের সখ্যকে প্রতিহত করতে পারেনি। বড়ো রহস্যময় এই সখ্য। কবির নিজের কাছেও ব্যাখ্যা ছিল না। শোনা যায়, এলমহার্স্টকে তিনি এই কবিতাগুলি রথীন্দ্রনাথ আর প্রতিমাদেবীকে পাঠাতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁরা নাকি কবিতাগুলি পড়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন। অথচ দেশে ফিরে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করলেন তাঁর বিজয়াকেই। চিঠিতে লিখলেন, ‘বাংলা কবিতার একটি বই তোমাকে পাঠাচ্ছি যেটা তোমায় নিজের হাতে তুলে দিতে পারলেই খুশি হতুম । বইখানা তোমায় উৎসর্গ করা। যদিও এর ভিতরে কী রয়েছে তা তুমি জানতে পারবে না। এই বইয়ের অনেক কবিতাই লেখা হয়েছিল সান ইসিদ্রোতে থাকার সময়’। সেবার ফেরার সময় ভিক্টোরিয়া জোর করে জাহাজের কেবিনের দরজা কাটিয়ে নিজের বাড়ির আরামকেদারা দিয়ে দিয়েছিলেন কবির সঙ্গে। প্রতিমা দেবীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ফিরে এসে প্রথমে সেই কেদারায় বসতেন না রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু শেষ বয়সে অসুস্থতার সময় দীর্ঘক্ষণ সেই কেদারায় বসে থাকতে দেখা গেছে তাঁকে।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোই রবীন্দ্রনাথের ভিতর থেকে  খুঁজে বের করেন আরেক রবীন্দ্রনাথকে। চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে। ভিক্টোরিয়া নির্দ্বিধায় রবীন্দ্রনাথের লেখার খাতা খুলে দেখতেন। এই সময় তিনি লক্ষ করেন রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় লেখার কাটাকুটিগুলি বিশেষ বিশেষ শৈল্পিক আকৃতি পায়। সেই থেকে তিনি রবীন্দ্রনাথকে বড়ো জায়গায় আঁকার কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ সত্যিই আঁকতে শুরু করেন। এই প্রসঙ্গে ভিক্টোরিয়া তাঁকে সাবধান করতেন। বলতেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যত ভুলভ্রান্তি থাকবে, ততই নাকি তিনি ছবি এঁকে মজা পাবেন। শেষে নিজে ইচ্ছে করেই কবিতায় ভুল করতে পারেন।

১৯৩০ সালে প্যারিসের ‘কাপ মার্টিন’-এ ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আবার দেখা হয়। নিজের কিছু ছবি নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে করে। ভিক্টোরিয়া সেই ছবিগুলির এক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। বিখ্যাত পিগ্যাল গ্যালারিতে এই প্রদর্শনী চলেছিল। ভিক্টোরিয়া সেই ছবির খ্যাতি দেখে একটি ক্যাটালগের উপর লিখে রেখেছিলেন ‘This exhibition is my work’। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর শেষ দেখা ১৯৩০-এর ১১ মে প্যারিসের gare du nord রেলওয়ে স্টেশনে। রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়াকে তাঁর সঙ্গে অক্সফোর্ড যেতে বলেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে ভিক্টোরিয়া যেতে পারেননি। 

এরপর সামনাসামনি দেখা না হলেও পরস্পরের পত্রে উষ্ণতা পৌঁছে গেছে পরস্পরের কাছে।রবীন্দ্রনাথ অনেকবার তাঁকে শান্তিনিকেতন আসতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু  ভিক্টোরিয়ার আসা হয়নি আর। ওকাম্পোর কথা মনে হলেই নিশ্চিত কবির মন চলে যেতো সান ইসিদ্রোর বাগানটিতে। স্পষ্ট মনে পড়ত বিচিত্র লাল, নীল ফুলের উৎসব আর বিরাট সেই নদীর উপর নিরন্তর রঙের খেলা, নির্জন অলিন্দে বসে কবির সেই চেয়ে থাকা।

সময় সব স্মৃতি আবছা করে দিয়েছে। মানুষগুলিও নেই আর। শুধু কবিতার অক্ষর এই বন্ধুত্বকে অমরতা দিয়েছে, দিয়ে চলেছে—

‘হে বিদেশী ফুল, যবে আমি পুছিলাম
‘কী তোমার নাম’
হাসিয়া দুলালে মাথা, বুঝিলাম তবে 
নামেতে কী হবে। 
আর কিছু নয়।
হাসিতে তোমার পরিচয়।’

সহায়ক গ্রন্থঃ

পূরবী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবিমানসী, জগদীশ ভট্টাচার্য (প্রথম খণ্ড)
উপলব্ধির উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, কবিতা চন্দ (প্রবন্ধ)

Developed by DXDasia