
কীভাবে এই পাঠ তাঁকে কবি হবার পথে ঠেলে দিয়েছিল হাজার মাইল
এক দেহাতি মানুষ মাথায় গুড়ের নাগরি নিয়ে হাঁটাপথে কোথায় যাচ্ছিল কে জানে! নাগরির ওপর মধুমক্ষির ঝাঁক, যেন প্রখর রোদে তার মাথার ওপর একখানি উড়ন্ত আর জীবন্ত ছাতা। তারও ওপর দহনভাণ্ড স্বয়ং সূর্য। কিছু পরেই গুড় গলতে লাগলো। আর স্বেদকণিকার সঙ্গে মিশে নেমে এলো মানুষটির মুখে ঠোঁটে। তার জিভ সচল হয়ে চেটে নিতে লাগলো, আত্মস্থ করতে লাগলো সেই সুমিষ্ট, দাহদমনকারী অমৃত আস্বাদ।
টেগোর কা দ্য গার্ডেনার পড়না মোস্ট সিগনিফিক্যান্ট টার্নিং পয়েন্ট হ্যায় মেরা লাইফ মে – গুণগ্রাহীর আমদরবারে নজরানা পেশ করতে গিয়ে একসময় এটাই জানিয়েছিলেন গুলজার, কবি হিসেবে তাঁর ওপর এই দুরতিক্রম্য প্রভাবের কথা স্বীকার করেছিলেন অকপটে। ওপরের গল্পটিও তাঁরই বলা। জানালেন পার্টিশনের পর এদেশে এসে কীভাবে কবিকে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন স্থানীয় এক লাইব্রেরি থেকে চুরি করা বইটির পাতায় আর কীভাবে সেই পাঠ তাঁকে কবি হবার পথে ঠেলে দিয়েছিল হাজার মাইল।
টেগোর কা দ্য গার্ডেনার পড়না মোস্ট সিগনিফিক্যান্ট টার্নিং পয়েন্ট হ্যায় মেরা লাইফ মে – গুণগ্রাহীর আমদরবারে নজরানা পেশ করতে গিয়ে একসময় এটাই জানিয়েছিলেন গুলজার, কবি হিসেবে তাঁর ওপর এই দুরতিক্রম্য প্রভাবের কথা স্বীকার করেছিলেন অকপটে।
গুরুঋণ স্বীকার করেই থেমে থাকেননি গুলজার। প্রকাশ করেছেন তাঁর দীর্ঘ পাঁচ বছরের শ্রমের ফসল হিন্দুস্থানিতে রবীন্দ্র কাব্যের অনুবাদ – বাগবান এবং নিন্দিয়া চোর। অনুবাদের কাজ অত সহজ নয়, তা অকপটে স্বীকারও করেছেন তিনি। অনুবাদ তো শুধু অন্য ভাষায় শব্দের মানে ধরে দেওয়া নয়, প্রত্যেকটি ভাষার সঙ্গে মাখো মাখো জড়িয়ে থাকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি, তাকে তুলে ধরাও বটে। প্লেটোর মতোই তিনি কবিতাকে মূল বাংলা থেকে ত্রিস্তরীয় দূরত্বে দেখেছেন। কারণ পশ্চিমীদের বোধগম্য করতেই হবে, অনুবাদ তো তাদের জন্যই। 'পনঘট ' বললে যে নদীতীর ভাসে চোখে, সাহেবি অবস্থান তার থেকে অনেক আলোকবর্ষ দূরে। ফলে এ ইমেজ দুচ্ছাই। এভাবেই অনুবাদের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া রবীন্দ্রকাব্যের মূলস্বাদকে আস্বাদনের জন্য নিজের বাংলা-প্রীতির কথায় বারবার জোর দেন তিনি।
প্রথম গুরু বিমল রায়, গুরুর গুরু রবীন্দ্রনাথ, আছেন সলিল চৌধুরী, শচীনকর্তা, পঞ্চম, এমনকী বাংলা-প্রীতির প্রাবল্যে 'এক বংগালিন কো সাদি কর বয়ঠা থা ম্যায় নে'। যখন কেউ পড়বে, যেন মনে না হয় অনুবাদ, কবিতাই শুধু এক, অনুভূতিময় আর মূল সংস্কৃতির অনুসারী। এক একটি শব্দও ভারী গুরুত্বের সেখানে, কারণ প্রত্যেকটি শব্দের গায়ে আছে ঢাকাই পরোটার মতো অজস্র অর্থের পরত। সঠিক পরতটির ছায়া এনে দেবার কাজে জগতের সেরা ডিকশনারিও বেকার। ওটি বেছে নিতে হবে কবি-অনুবাদককেই।
গুলজার বেছেছেন রবীন্দ্রনাথের শিশুকাব্যগুলিকে। তার কারণ, শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর কবির দখল, তার অপূর্ব প্রকাশ আর গুরুত্বপূর্ণ এই বোধ যে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়েই ছড়িয়ে আছে এই জঁরের প্রতি অবজ্ঞা। বাংলা, মালয়ালম এবং মারাঠি ছাড়া আর অল্প ভাষাতেই এইরকম প্রচেষ্টা রয়েছে। সবাই মুখে মুখে যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে সে ভাষাও এই ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ লবডঙ্কা।
গুলজারের নজরে যে রবি, সে চির তরুণ, হঠাৎ গেয়ে ওঠে ইংরেজি গানের কলি, প্রাণোচ্ছল, সুন্দর, স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁকে ভালোবেসে ফেলা যায়, গুরুদেব বলে গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠতে হয় না।
টেগোর কো পড়তে হুয়ে হম ইস ভুল মে রহতে হ্যায় কি টেগোর দাড়ি কে সাথ হি পয়দা হুয়ে থে – হাসতে হাসতে কত জায়গায় এসব বলেছেন দাদাসাহেব ফালকে প্রাপ্ত কবি গুলজার। রবীন্দ্রনাথের লেখা রোমান্টিক কবিতা, শিশুকাব্য, অনাদরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যেন। গীতাঞ্জলি কবির অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে কোলাকুলি, যে অভিজ্ঞতা তিনি প্রতীচ্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন শুধু সেইগুলির সচেতন প্রকাশ। গুলজারের নজরে যে রবি, সে চির তরুণ, হঠাৎ গেয়ে ওঠে ইংরেজি গানের কলি, প্রাণোচ্ছল, সুন্দর, স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁকে ভালোবেসে ফেলা যায়, গুরুদেব বলে গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠতে হয় না। গুলজারের একটি সহজ সুন্দর অনুবাদে প্রমাণ হয় একথা:
উয়ো দোনো বহনে কিঁউ হাসতি হ্যায় যব
ভি পানি ভরনে আতি হ্যায়
উয়ো দো বহনে হ্যায় যো যব ভি আতি হ্যায়,
হাসতি হুয়ে আতি হ্যায় ঘাট পে
ক্যা উয়ো জানতি হ্যায় পেড় কি আড় সে কোই
উনকো দেখ রহা হ্যায়।
বিশ্বভারতীর ওপর ক্ষুব্ধ গুলজার। বহুদিন কুক্ষিগত হয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলার বাইরের মানুষ তাঁকে চিনতে পারেনি। এখন অচলায়তনের বাইরে কবিকে নিজের মতো করে চেনা অনেক সহজ। সোরগোল পড়ে যেতে পারে গুলজারের রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধীয় মন্তব্যে। তাঁর মতে আধুনিক ভঙ্গিতে গাওয়া এইসব গানও ফেলে দেবার মতো নয় মোটেই। বরং তা ঐ অচলায়তন ভাঙারই আর এক ইঙ্গিত।
