
১৯৩৮ সালে, সুরেল বাংলোয় দিন পনেরো ছিলেন বিশ্বকবি
আজ যে মংপুর রবীন্দ্র ভবন ঘিরে সর্বত্র আলোচনা সেই রবীন্দ্র ভবনে যাওয়ার আগে কবি প্রথম মংপু থেকে চার কিলোমিটার দূরে এবং ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সুরেল বাংলোতে প্রথম এসে উঠেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৮ সাল। কিন্তু ওই বাংলোর আশপাশটা প্রায় সময়ই কুয়াশায় ঢাকা থাকে। আর এর মধ্যে থাকতে থাকতেই কবির শুরু হয়েছিল সর্দি কাশি। মংপুর সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেশনের চিফ কেমিস্ট ডঃ মনমোহন সেনের স্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবী রোজ তাঁদের কোয়ার্টার(বর্তমান রবীন্দ্র ভবন) থেকে পায়ে হেঁটে কবির জন্য খাবার নিয়ে যেতেন সুরেল বাংলোতে। মৈত্রেয়ী দেবী বার কয়েক কবিকে তাদের কোয়ার্টারে অতিথি হিসাবে থাকবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সুরেল বাংলোর চারপাশের মন ভোলানো পরিবেশ কবিকে সেখানেই থাকবার জন্য আটকে রাখছিল। প্রায় জনমানবহীন নিস্তব্ধ পরিবেশ কবিকে তাঁর চিন্তনে আরও সমৃদ্ধ করলেও কবি বুঝতে পারেন, রোজ এতটা দূর পায়ে হেঁটে তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসা মৈত্রেয়ী দেবীর পক্ষেও কষ্টকর। শেষে কবি মৈত্রেয়ী দেবীর কোয়ার্টারে থাকবার সিদ্ধান্ত নেন। মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে তাদের কোয়ার্টার ও কবি নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন। কিন্তু সুরেল বাংলো নিয়ে বিশেষ কিছু লেখা নেই। ফলে সুরেল বাংলোতে কবি কী কী করেছেন, তার বিশদ তথ্য নেই। তবে জানা যায়, কবি সেখানে পনের দিন ছিলেন। সেই বাংলোর সামনে বিরাট দুটি পাইন গাছ আছে। সেই গাছের নিচে বসে কবিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করতে দেখেছেন স্থানীয়রা। সেই পাইন গাছ দুটি আজও আছে।
জায়গাটির নাম কীভাবে ‘সুরেল’ হল, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, স্থানীয় নেপালি আদিবাসীদের কারো কারো পদবি সুরেল। তার থেকে ওই নাম সুরেল দেওয়া হয়। আবার কারো মতে, শান্তিনিকেতনের সুরেলরা তৈরি করেছেন ওই বাংলো। পাহাড়কে উপভোগ করার সুন্দর পরিবেশ রয়েছে এই সুরেল বাংলো থেকে। এক পাশ দিয়ে সুন্দর ভাবে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। আরেক পাশ দিয়ে সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকা এবং জলপাইগুড়ি জেলা এবং কালিম্পং দেখা যায়।
আরও পড়ুন
মংপুতে রবীন্দ্রনাথ
ম্যালেরিয়া ঠেকাতে কুইনাইন প্রস্তুতের জন্য ১৮৬০ সালে ব্রিটিশরা মংপুতে সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেশন তৈরি করেন। আর তাদের সময় থেকেই সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেশনের অধীনে তৈরি হয় এই সুরেল বাংলো। এক সময় সোনাদা স্টেশনে জিনিসপত্র নামানো হলে বাক্সের মধ্যে তা ভরে বাক্সা রোড হয়ে হাঁটা পথে শ্রমিকরা মংপু ও সুরেল বাংলো পর্যন্ত যেত। যেহেতু বাক্স করে মালপত্র পায়ে হাঁটা পথে নিয়ে আসা হত, তাই নাম বাক্সা রোড।
ওই বাংলোর আরও একটি বিশেষত্ব হল, ৫২ দরজা। নেপালের রাজার ভক্তপুর প্যালেস বিখ্যাত ছিল ৫১ দরজার জন্য। কিন্তু ৫২ দরজার জন্য সুরেল বাংলো সেই সময় পাহাড়িয়াদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। আশির দশকে দার্জিলিং পাহাড়ের অশান্ত আন্দোলনের সময় অবশ্য এই বাংলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই সময় আগুনে সব পুড়ে যায়। এমনকি রবি ঠাকুরের ব্যবহার করা সব সামগ্রীও পুড়ে যায়। তারপর থেকে ঐতিহাসিক সেই বাংলো ধ্বংসস্তুপের মতই পড়ে থাকত। এখন আবার রাজ্য হেরিটেজ কমিশন তার দিকে নজর দিয়েছে। খবর হল, আবার সেই ৫২ দরজার মতো করে সাজিয়ে তোলা হবে এই বাংলো।
