
ব্রজেশ্বর, শ্যাম, ভোলানাথ, উমাচরণ, বিপিন, ফটিক, ঝগড়ু, নীলমণি – রবীন্দ্রনাথের প্রিয়েরা
জানালার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত একটি ছেলে। ঠিক যেন খাঁচার পাখি। জানালার ওইপারে মস্ত নীল আকাশ। এপারে লক্ষ্মণের গণ্ডি। পার হলে সাংঘাতিক কোনো এক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে তার জন্য। এই ভবিষ্যৎ বাণী অলঙ্ঘ্য বার্তার মতো আবর্তিত হত ঠাকুরবাড়ির ভৃত্যমহলে, যার পোশাকি নাম ছিল তোশাখানা। ধনী পরিবারের শিশুদের জন্য এই তোশাখানায় দিনযাপন নির্দিষ্ট ছিল। ব্যস্ত অভিভাবকদের সময় ছিল না তাদের দেখাশোনা করার। ঠাকুরবাড়ির প্রতিটি রত্নের শৈশব কেটেছে ভৃত্যতন্ত্রের অধীনে। তোশাখানার দক্ষিণদিকে বড়ো সেজে মিটমিটে রেড়ির তেলের আলোয় দেখা যেতো গণেশমার্কা ছবি আর কালীমায়ের পট। অভিজাত রবীন্দ্রনাথের জীবনে শৈশব থেকেই নিম্নবিত্ত কিছু মানুষের ভূমিকা অপরিসীম। আজ তাদের কথা বলি।
আসবাবহীন ঘরে মেঝের উপর ময়লা একটা মাদুর পাতা থাকত। মাদুর পাতা আসরের সর্দারের নাম ছিল ব্রজেশ্বর। কাঁচাপাকা চুল, গোঁফ, গম্ভীর মেজাজ, কড়া গলা আর চিবিয়ে চিবিয়ে কথা ছিল তার স্টাইল। একসময় গ্রামের পাঠশালার গুরুমশাই ছিল ব্রজেশ্বর। সেই গুরুগিরি চলত ঠাকুরবাড়ির শিশুগুলির উপর। তার খাবারের লোভ ছিল চাপা। খেতে দেওয়ার সময় একটি করে লুচি আলগোছে দুলিয়ে জিজ্ঞাসা করত, ‘‘আর দেব কি?’’ উত্তরটা নাবাচক হলেই খুশি হত। তার ফর্দ এড়িয়ে কলাপাতায় মোড়া মাখন পেলে ছোট্ট রবির পুলক হত খুব। ব্রজেশ্বরের কাছেই রবীন্দ্রনাথের প্রথম রামায়ণ শোনা। চাকরদের বড়ো কর্তার নাম যদি ছিল ব্রজেশ্বর, তাহলে ছোটোকর্তা ছিল শ্যাম। যশোরের পাড়াগেঁয়ে ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণে বেশ একটা জায়গা করে নিয়েছে। শ্যাম গল্প শোনাতো। রঘুডাকাত, বিশুডাকাতের গল্প তার থেকেই
যশোর জেলা থেকে আসা রবীন্দ্রনাথের আরও এক খাস চাকরের নাম ছিল উমাচরণ। সুদর্শন আর মিশুকে এই ভৃত্য ছিল রবি ঠাকুরের স্নেহধন্য। শিলাইদহে সাহিত্যসাধনায় মগ্ন রবীন্দ্রনাথ উমাচরণের প্রতি যথেষ্ট নজর রাখতেন। তাঁর উদ্যোগে উমাচরণদের মহা আনন্দে খাওয়া দাওয়া চলত। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ভোলানাথ ছিল আরেক ভৃত্য। তার গোঁফজোড়া ছিল দেখার মতো। রবীন্দ্রনাথের বিদেশ সফরের সঙ্গী ছিল ভোলানাথ। রবীন্দ্রনাথের প্রতি সাহেবসুবোদের আচরণ নিয়ে বেশ বক্তৃতা দিত ভোলানাথ। বিলেতফেরত ভৃত্য বলে কথা। রবীন্দ্রনাথকে দেখার জন্য লোকসমাগম, মেমসাহেবদের রবীন্দ্রনাথকে ‘যীশুখ্রিস্ট সম্বোধন — ভোলানাথের মনে প্রচ্ছন্ন গর্ব তৈরি করত, যা প্রভুভক্তিরই রূপান্তরিত রূপ মাত্র। রবি ঠাকুরের পুরাতন ভৃত্যদের তালিকা বেশ লম্বাই ছিল। আর একজন ছিল বেশ বুদ্ধিদীপ্ত, হিসেবি ভৃত্য। সেই জবরদস্ত ভৃত্যটির নাম ছিল বিপিন। তার লেখাপড়া থাকুক আর নাই থাকুক, সে রীতিমতো সেরেস্তায় বসা পাকা আমলাদের মতো ছিল। তার অম্ল মধুর ব্যক্তিত্বে সবাই ছিল মুগ্ধ। ছোটোদের গোলাপফুল দেওয়া থেকে শুরু করে বড়দের হই চই— সবকিছুতেই বিপিন। রবীন্দ্রনাথ তার অম্ল মধুর স্বভাব দেখে বলতেন, ‘বিপিনের সর্ব্বমত্যন্ত গর্হিতং।’ ‘ছিন্নপত্র’-এ প্রসন্ন নামে আর এক ভৃত্যের উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার নামের মতোই স্বভাবটাও ছিল শান্ত ও সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহে। প্রকাণ্ড পদ্মার চরে কখনো সপরিবারে, কখনো একলা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। একবার মৃণালিনীদেবী আর বলেন্দ্রনাথ অনেক দূরের চরে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। রাত গভীর হতেও তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রসন্ন সেবার প্রবল উদ্যমে খুঁজে বেরিয়েছে মৃণালিনী আর বলেন্দ্রনাথকে, ভীত সন্ত্রস্ত রবীন্দ্রনাথের ভরসা হয়ে। তার ‘ছোটোমা’ ডাক নির্জন নিশীথিনীর বুক চিরে উদাস প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছিল। অনেকক্ষণ পর বলেন্দ্রনাথ আর মৃণালিনীকে সারা পায়ে কাদা মেখে ফিরে এল প্রসন্ন। বলল, ‘ছোটোমা আর বলুবাবু রাস্তা ভুলে কালকেপুরের চরের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। আমি আর গফুর না থাকলে তাঁরা পাবনা জেলার কোন এক প্রান্তে চলে যেতেন।’ অন্ধকার রাতে প্রিয়জনকে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। মৃণালিনীর খুব পছন্দের ভৃত্য ছিল প্রসন্ন। তাঁর মুখ দেখে নাকি প্রসন্ন বুঝতে পারত তাঁর ইচ্ছে অনিচ্ছে।
ফটিক শেখ ছিল শিলাইদহের লোক। সুপুরুষ, গৌরবর্ণের মানুষটির মুখে ছিল দাড়ি। রবীন্দ্রনাথের বাবুর্চি ছিল ফটিক। মৃণালিনী দেবীর কাছে রান্না শিখে সে ওস্তাদ রাঁধুনে হয়ে উঠেছিল। বাবুর্চি হওয়ার পর তার পদবী হয়ে ফরাস। ফটিক ফরাস খুব বুদ্ধিমান আর রসিক ছিল। রবি ঠাকুরের খাস বাবুর্চি হওয়ার অহংকারে সকলের সঙ্গে উদ্ধত ব্যবহার করত আবার বিরাট পরিবার প্রতিপালনের স্বার্থে উপরি উপার্জনের বাঁকা পথও বের করত। প্রায়ই কুঠিবাড়ির ঘি, ময়দা, মিষ্টি কম পড়ে যেত। ফটিক ধরা পড়লে রবীন্দ্রনাথ কঠিনে কোমলে মিলিয়ে শাসন করতেন। কখনো বলতেন, ফটিকের বড়ো পরিবার, কম মাইনের কথা। জিনিসপত্রের কড়াকড়ি হিসেব নিতে বারণ করতেন। কিন্তু ফটিক প্রজাদের থেকে ঘুষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাদের দেখা করতে দিত। একবার এই কথা শুনে প্রবল রেগে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ফটিককে বলেছিলেন তার হাতে আর খাবেন না। মৃদু এই তিরস্কারে ফটিকের পরিবর্তন হয়েছিল। মামলাতেও জড়িয়ে পড়ত ফটিক। কিন্তু বাবুর্চি হিসেবে ছিল সেরা। সাহেবরাও খুশি ছিল তার উপর। রবীন্দ্রনাথের স্নেহ-কঠিন ব্যক্তিত্বের স্পর্শে ফটিকের স্বভাব পরিবর্তন হয়েছিল।
ঝগড়ু বেহারা ছিল জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবি ঠাকুরের খাস চাকর। রবীন্দ্রনাথ কালে ভদ্রে যেতেন জোড়াসাঁকোয়। কাজেই ঝগড়ুর সেই অর্থে ঝাড়পোঁছ ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। বসে বসেই মাইনে নিত বলা যায়। ঝগড়ু একটি রামছাগল পুষত। ঝগড়ু আর তার রামছাগল— দুই-ই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয়। রবীন্দ্রনাথের ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূও ঝগড়ু বেহারাকে সম্মান করে চলত। ঝগড়ু বলত, রবীন্দ্রনাথের মতো শোকতাপ অন্য কেউ এত পাননি। কিন্তু ঝগড়ু রবীন্দ্রনাথকে কখনও কাঁদতে দেখেনি। বৃদ্ধ বয়সে আরাম না করে যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর জন্য সারা পৃথিবী ছুটে বেড়াচ্ছেন, এ ছিল ঝগড়ুর কাছে এক বিস্ময়। শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ঝগড়ু প্রবল শোকে ভেঙে পড়েছিল। ঝগড়ুর থেকে ঠাকুরবাড়ির অনেক পুরোনো গল্প জানা যেত। রবীন্দ্রনাথের ছড়ায় ঝগড়ু অমর হয়ে আছে—
‘এক যে ছিল বাঘ
তার গায়ে কালো দাগ,
তাই বেজায় হল রাগ
ঝগড়ুকে তাই বললে হেঁকে—
যা এখুনি প্রাগ।’
রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে নীলমণি নামের এক ভৃত্য ছিল তাঁর সঙ্গী। বনফুলের স্মৃতিচারণাতেও নীলমণির কথা আছে। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে অনুসারে তাঁকে যত্ন করে গুছিয়ে খেতে দিত নীলমণি। দীর্ঘজীবনে অনেক ভৃত্যের সেবা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাদের মধ্যে অনেকেই তাঁর আত্মীয়ের মতো হয়ে যায়। তাদের প্রতি নিজের মনোভাব ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতায় লিখে রেখেছেন তিনি। কবিতায় মনিবের সেবা করে প্রাণ বিসর্জন দেয় যে কেষ্টা নামের ভৃত্য, তার নামের আড়ালে সকলের জমায়েত আছে— ব্রজেশ্বর, শ্যাম, ভোলানাথ, উমাচরণ, বিপিন, ফটিক, ঝগড়ু, নীলমণি আরো অনেকে। ‘পুরাতন ভৃত্য’-দের সঙ্গে রবি ঠাকুরের ছিল মায়ার টান।
সহায়ক গ্রন্থঃ
ছেলেবেলা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সহজ মানুষ রবীন্দ্রনাথ, শ্রী শচীন্দ্র অধিকারী।

