কোচবিহারের রাসমেলার ইতিহাস

বৈষ্ণব গুরু শঙ্কর দেব প্রথম কোচবিহারে মদনমোহন বিগ্রহ স্থাপন করেন

বাবা মদনমোহনের পুজো ও যজ্ঞের মধ্য দিয়েই শুরু হল উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম রাস মেলা। প্রতিবারের মত এবারও কোচবিহারের এই রাস উৎসবে জমা হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু এই মেলা নিয়ে আছে পুরনো গল্প-গাথা।

১৮৮৯ সালে বর্তমান স্থানে মদনমোহন মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ১৮৯০ সালের ২১ মার্চ এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। কোচবিহারের এই রাসমেলা প্রায় ১২৮ বছরের পুরনো। জনশ্রুতি আছে এই মেলা প্রথম শুরু করেন মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ, ১৮১২ সালে কোচবিহারের ভেটাগুড়িতে। পরবর্তীকালে এই মেলার স্থান পরিবর্তন হয়।

কোচবিহারের এই মদনমোহন মন্দিরে পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। একেক কক্ষে একেক দেবীর বিগ্রহ। পূর্ব প্রান্তে জয়তারা। পশ্চিম প্রান্তে কালী বিগ্রহ। আরেক পাশে ভবানী বিগ্রহ। অন্যদিকে নাটমন্দির। নাটমন্দিরে দুর্গাপুজো বা জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। মন্দিরের পাশেই পুষ্করিণী বৈরাগীদীঘি। আগে এই পুকুরেই সেবাইত বা ভক্তরা স্নান করতেন। তাঁদের জন্য থাকত বিশেষ তাঁবুর ব্যবস্থা। এখন তাঁদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আনন্দময়ী ধর্মশালা। মন্দিরে মূল বিগ্রহের কক্ষ হল মদনমোহনের। বিগ্রহটি রুপোর তৈরি। চাদোলাতে রাখা হয়েছে বাবা মদনমোহনকে। সেই চাদোলার চারদিকে চারটে কোণ। বিগ্রহ বলতে দুটি- একটি বড় মদনমোহন, আরেকটি ছোট মদনমোহন মন্দির। ছোট মদনমোহন অন্তরালেই থাকে। একবারই তিনি জেগে ওঠেন। সেটা হল এই রাস উৎসবের রাস পূর্ণিমার সময়।

এখন মদনমোহন মন্দির দেবোত্তর ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত। আর রাস মেলা পরিচালিত হয় কোচবিহারের পুরসভার মাধ্যমে। তবে কোচবিহার জেলায় এই মদনমোহন মন্দির আরও আছে। যেমন দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জ ও তুফানগঞ্জ। পুজো সেসব স্থানেও হয়। কিন্তু পুজো ঘিরে এত বড় মেলার আয়োজন হয় এই মন্দির ঘিরেই।

কিন্তু মদনমোহনের ভাবনা কিভাবে ছড়াল কোচবিহারে। কথিত আছে, ১৭৮৩ থেকে ১৮৩৬ পর্যন্ত কোচবিহারে রাজত্ব করতেন হরেন্দ্রনারায়ণ। তারপর ১৮৪৭ পর্যন্ত রাজত্বকাল ছিল শিবেন্দ্রনারায়ণের। ১৮৬৩ পর্যন্ত নরেন্দ্রনারায়ণ ও শেষে ১৯১১ পর্যন্ত নৃপেন্দ্রনারায়ণ। এই রাজাদের সময়ই অসম থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছিলেন বৈষ্ণব গুরু শঙ্কর দেব। গবেষক রঞ্জিত দেবের কথায়, শ্রী কৃষ্ণের সঙ্গে রাধারানি বলে কিছু নেই। একই অঙ্গে তার দুই রূপ। তিনিই পুরুষ, আবার তিনিই প্রকৃতি। কৃষ্ণের এই অদ্বৈত রূপ প্রচার করায় শঙ্করদেব চরম বিরোধিতায় পড়েন। তখন তিনি অসম অঞ্চল ছেড়ে কোচবিহারে এসে প্রচার কাজ শুরু করেন। আর সেই সময়ই তাঁর ভাবনা থেকে কোচবিহারে মদনমোহন বিগ্রহের মূল ভাবনা এসেছে।

রাজবংশের আদি দেবতা হলেন মদনমোহন। বছর পুরনো এই মেলা মদনমোহনের পুজো ও যজ্ঞ দিয়ে মেলা শুরু হয়। পনেরো দিন ধরে চলে এই মেলা। একসময় রাজারা পুজো দিয়ে রাসচক্র ঘোরাতেন। এখন রাজারা নেই। তাঁর পরিবর্তে দেবোত্তর ট্রাস্টের সভাপতি হিসাবে জেলা শাসকেরা পুজো দিয়ে রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা করেন। এখানকার মানুষদের বিশ্বাস এই পুজো করা হয় জেলার মঙ্গলকামনার জন্য।

প্রতিবছরের মত রাস উৎসব ও মেলায় ভুটান, অসম থেকে অনেক মানুষ আসেন। ঐতিহ্যমণ্ডিত এই রাস মেলায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক আধুনিকতা ছোঁয়া লেগেছে। প্রবীণ সাংবাদিক দেবাশিস ভৌমিক বলেন, আগে অনেকেই গরুর গাড়িতে চেপে এই মেলায় আসতেন। এখন আর তা দেখা যায় না। আগে খুব দইচিড়া পাওয়া যেত। এখন তার দখল নিয়েছে ফার্স্ট ফুড।

রাস চক্র ঘিরে আর একটি বড় বার্তা হল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। রাসচক্র তৈরি করেন আলতাফ হোসেন। লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে চক্র তৈরির কাজ শুরু হয়। বাঁশ দিয়ে বাতা তৈরি করা হয়। বাঁশ শুকিয়ে গেলে তাতে কাগজের কারুকাজ করা হয়। পাট দিয়ে গড়া দেব দেবীর ছবিও আটকানো হয় চক্রের মধ্যে। ২২ ফুট উঁচু এই রাসচক্র। রাস মেলার আর একটি আকর্ষণ পুতনা রাক্ষসীর মূর্তি। রামায়ণ মহাভারতের বিভিন্ন গল্প মূর্তির মডেলে তৈরি করা হয়। মেলায় জিলিপির বেশ আকর্ষণ। ভেটাগুড়ির জিলিপি আর বাবুহাটের জিলিপির মধ্যে লড়াই হয়। ঘানি ঘুরিয়ে তেল বের করার মেশিন নিয়েও লোকজন বসেন। হস্তশিল্পের অনেক স্টল বসে মেলায়। সেখানে মেখলিগঞ্জের মেখলি যেমন আছে তেমনই শিতলখুচির শীতল পাটিও পাওয়া যায়। মেলার দিন যত গড়ায় ততই মেলায় ভিড় বাড়তে থাকে। আগে এই মেলায় পাওয়া যেত মাটির পুতুল, মাটির অনেক কাজ, লোহার অনেক কাজ, ধান ভাঙ্গার মেশিনও। মেলা ছাড়ারও এই সময় দর্শনার্থীরা ভিড় জমায় মধুপুরের শঙ্কর দেবের সমাধি মন্দিরে। গবেষক রঞ্জিত দেব বলেন, আগে মেলা উপলক্ষে অনেক স্পেশাল ট্রেন দেওয়া হতো। বাংলাদেশের গিতালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত এই ট্রেন চলত। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা গরুর গাড়ির পরিচয় পাওয়া যেত ভিন্ন ঘণ্টা ও তার আওয়াজ শুনে। এখন অবশ্য গরুগাড়ি দেখা যায় না।

Developed by DXDasia