শিলিগুড়ির ভারত ছাড়ো আন্দোলন – অজানা ইতিহাস

গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচ যুবক

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল শিলিগুড়ি। ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট গান্ধিজি সহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হলে দেশ জুড়ে নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ সামিল হন। আর সেই সময় ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়ে শিলিগুড়ির রাজনৈতিক আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই, ৯ সেপ্টেম্বর বিরাট মিছিল বের হলে শিলিগুড়ি থানার কাছে গুলি চালায় ইংরেজের পুলিশ। ৫জন শহিদ হন। সেই শহিদদের স্মরণে শিলিগুড়ি থানার কাছে তৈরি করা হয় শহিদ বেদি। কিন্তু সেই বেদি আজ অবহেলার শিকার। বেদির মধ্যেই পসরা নিয়ে বসছে জবরদখলকারী হকাররা।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বেশ ভালোভাবেই অংশ নিয়েছিল শিলিগুড়ি। আগস্ট মাসে শুরু হওয়া ভারত ছাড়ো আন্দোলন সেপ্টেম্বরে আরও ভয়ানক আকার নেয়। শিলিগুড়ির পুরানো লোকেরা বলেন, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’, ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ শ্লোগান দিতে দিতে ৯সেপ্টেম্বর হাজারখানেক মানুষ শিলিগুড়ি শহরে মিছিল বের করেন। তখন শিলিগুড়ির জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ হাজার। সেই মিছিলে বাঙালি, বিহারি, পাঞ্জাবি, মাড়ওয়ারি সকলেই অংশ নেন। মিছিলের মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্রজেন বসু রায়চৌধুরীর কন্যা ও কালিদাসী সেনগুপ্ত। সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। সেই সময়ের মহকুমাশাসক কে কে ঘোষের নির্দেশে পুলিস গুলি চালায়। তাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচ যুবক। মৃতদের মধ্যে ছাবিলা সিং, মহাবীর সিং আর শঙ্কর সিং-এর নাম জানা যায়। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হলে ভারত ছাড়ো আন্দোলন স্মরণে সেই স্থানে একটি শহিদ বেদি তৈরি করা হয়। 

শিলিগুড়ি থানার গায়েই সেই শহিদ বেদি। পুরসভার পরিচালনায় তা রাখা হয়েছে। কিন্তু পুরসভার কর্তাদের কাছে এ নিয়ে কিছু জানতে চাওয়া হলে তাঁরা কিছু বলতে নারাজ। বেদির চারপাশে মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে। সামনের ফুটপাথ দখল করে বসে থাকা হকারদের জিনিসই তাতে রাখা হয়। আগস্ট মাস শুরু হয়ে গেলেও সেই বেদির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ নেই কারও। শিলিগুড়িতে এই মুহূর্তে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে একমাত্র বেঁচে রয়েছেন টিকেন্দ্রজিৎ মুখার্জি। তিনি ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সেই বেদির প্রতি সকলের অবহেলা দেখে বলেন, শিলিগুড়িতে যখন অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী বেঁচেছিলেন তখন তারা সকলে মিলে সেখানে গিয়ে আড্ডা দিতেন। দেশের কথা আলোচনা করতেন। কিন্তু এখন এর প্রতি অবহেলা দেখে দুঃখ করেন টিকেন্দ্রজিৎবাবু। এবছর ভারত ছাড় আন্দোলনের ৭৫ বছর পূর্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তেরঙ্গা যাত্রা শুরু হয়েছে। ৯ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তা চলবে, কিন্তু শিলিগুড়িতে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সাক্ষ্য বহন করা সেই বেদি নিয়ে কারও হেলদোল নেই। কেউই এ নিয়ে মন্তব্য করতেও রাজি নন। আন্দোলনের পঁচাত্তর বছর পূর্তিতে তাই অবহেলাতেই পড়ে রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করা শহিদ বেদি। 
 

Developed by DXDasia