
"আমি তোমাকে ভালোবাসি না। ভালো না বেসে কি কারো শরীর ছোঁয়া যায় ?"
আমি খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। কিন্তু অসাধারণ স্বপ্ন দেখতাম। আমার পদ্য একদিন "দেশ" পত্রিকায় ছাপা হবে। অথচ কী আশ্চর্য দেখো …দু'ঘন্টা পত্রিকা অফিসের উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থেকেও সাহসে ভর করে কোনদিন দপ্তরে গিয়ে উঠতে পারিনি। এটা আসলে মধ্যবিত্ত ভীরুতা..বুঝলে।আমি পারিনি..অথচ সেই কবি কিন্তু পেরেছিল। সেই যে… অরিন্দম লাহিড়ী বলে ছোকরা। শুধু "দেশ"পত্রিকায় পদ্য জমা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সেই পদ্য নাকি ছাপাও হয়েছিল! তারপর সেই ছোকরা …কপাল বুঝলে …সবটাই কপাল! ডালিয়া তাকে নিয়ে গেল দার্জিলিং, ঝুমা তার আঙুলে আঙুল জড়াল …আর আমি! কিস্যুই হল না আমার! অথচ দেখো, অরিন্দম যেন আমারই ছায়া। নাকি আমি অরিন্দমের? তফাত একটু ছিল ..ও একটা চাকরি করে ছোটখাট, আমি বাবার হোটেল আর টিউশানির টাকায় নবাব খাঞ্জা খাঁ।
অরিন্দম বলেছিল, "পৃথিবীতে মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন কবিতাও থাকবে। কিংবা তারও পরে। সব মানুষ মরে গেলেও কবিতা বেঁচে থাকবে।…যতদিন মানুষ অন্ধ না হবে,ততদিন রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়বে। আমার কবিতাও পড়বে।"
না না…আমি বলিনি। এ কথা অরিন্দম বলেছিল। আমিও বলি…তবে প্রথম অংশটুকু। আর অরিন্দম যখন বলে, "একজন ডাক্তার একজন মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে যে আনন্দ পায়, একজন বৈজ্ঞানিক কোনও আবিষ্কার করে ..যা সারা পৃথিবীর কাজে লাগবে ..কিংবা খুব সাধারণ কথাই ধর না , একজন জেলে সারাদিন নদীতে জাল ফেলে কিছুই পায়নি..তারপর যখন সে হঠাৎ একটা বড় মাছ পেয়ে যায় …."
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিও ওই অরিন্দমের মতোই কবিতা লিখে ঠিক ততটাই উল্লসিত হই।
কত কিছুই যে ওই ছোকরার হাত ধরে শিখলাম! লোকে বলত, তুমি খুব অহঙ্কারী। তা তো একটু ছিলেই বাপু। কিন্তু ওই আমাকে বলল, "সুন্দরী মেয়েদের তো অহঙ্কার থাকবেই! ওরা প্রিভিলেজড ক্লাস তো, ওরা তো আর সবার মতো নয়!"
ঠিক কথা ! আমিও কি একা একা ..কালি কলম নিয়ে থাকি যখন… মা রান্নাঘরে মাথা পিছু হিসেব করে সাড়ে চারশ' গ্রাম কাটা পোনার টুকরো গোণে, বাবা দাড়ি কামিয়ে বাথরুমের ওই চলটা ওঠা আয়নায় নিজেকে মাপতে মাপতে গালে ফটকিরি ঘষে, আমার ছোট বোন মিতুল পড়ার বই আড়াল করে বাজার চলতি খাজা উপন্যাসগুলো পড়ে… আমিও কি "হাতের মুঠোয় আমলকীর মতো"এই পৃথিবীটাকে ধরে রাখি না? আমিও কি একটা, জাস্ট একটা ঠিকঠাক কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারি না?
আমি লিখি ..
"ভালোবাসা ছিন্ন করে চলে যাওয়া তেমন শক্ত না
অনেকেই যায়, তারা কোন দিকে যায়, নিরুদ্দেশে?
রক্ত সাগরের তীরে জাহাজ অপেক্ষমান, অথবা রক্ত না
কালো হ্রদ, দুর্নিবার মেঘ ঝঞ্ঝা দিগন্তের শেষে।
বুকের ভেতরে মেঘ, যার অন্য নাম অভিমান
পায়ের তলায় ফুল, কিংবা পিঁপড়ে দলে পিষে যাওয়া
ভালোবাসা তাও নয়, আরও পলকা, একটি ফুৎকারে খানখান
মরুভূমি জেগে থাকে, শিয়রে সশস্ত্র ঘোরে হাওয়া।
এই কবিতাটা লিখে খুব আত্মশ্লাঘা হল। গরীব ঘরের ছেলেরা যেমন পুজোর নতুন জামা গায়ে চড়িয়ে এদিক ওদিক দেখে..সবাই দেখছে কিনা..তেমনি একদিন ক্যান্টিনে বার খেয়ে কবিতাটা পড়েই ফেললাম।
আর..সেই দিনই তোমার সঙ্গে আলাপ হল। আমি বুঝলাম… নিস্তার নেই। দুই সতীনে বসত করবে এবার থেকে। আমার বুকে। তুমি আর কবিতা। হবেই তো! কারণ, অরিন্দম আমাকে শিখিয়েছিল, "সুন্দর জিনিসের প্রতি মানুষ চিরকালই যুক্তিহীনভাবে দুর্বল। "
আমি পড়াশুনো করি। আর পদ্য লিখি। খুব পদ্য লিখি। সব পদ্যেই তুমি আসো..ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। সে তো আসবেই! যে স্বপ্নে আসে নিত্য..তারই তো পদ্যেও মৌরসীপাট্টা! আগে আগে কবিতা লিখতাম। তখন তুমি আসোনি। কবিতা লিখতাম। সমুদ্র থাকত। আকাশ। ওরা প্রতিদান দিতে জানে না। বোঝেও না। তবু লিখতাম।কারণ ..অরিন্দম বুঝিয়েছিল আমাকে, "সৌন্দর্য হচ্ছে কবিতার প্রেরণা। "
তুমি এলে। তোমাকে পড়াই সব পদ্য। তুমি পদ্যের ভালোমন্দ বল..কিন্তু আর কোনো ভালোমন্দ কথা উচ্চবাচ্য করো না। আমি বুঝিই না..তুমি ঠিক কী ভাবো! আমাকে অবহেলা করো না। আবার মাথায়ও তোলো না। আমি সেই কুড়ি একুশে স্বপ্ন বুনতে বুনতে চোখে ছুঁচের ফোঁড় সব ঝাপসা দেখি! রঙের রকমফের বুঝি না।
তবু লিখে যাই। লিখেই যাই।
"কীসের জন্য কেন যে বেঁচে আছি, তা জানি না
'অয়ি' বলে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে হয়
আর ফিরে আসবে না?
সমগ্রতায় যদি নাও আসতে পারো
শুধু দুটি রক্তিম পায়ের পাতা
নাভিতে সদ্য বিলুপ্ত চাঁদ, ভুরুতে অচিন পাখি
দাঁড়িয়ে থাকার নিস্তব্ধ সঙ্গীত, ঊরুর বিষণ্নতা
কিছু একটা দেখা দাও
ধ্যান ভেঙে বসে আছি, দেখা দাও, দেখা দাও। "
তোমার মনে আছে? প্রথম যৌবনে ওই ট্রামরাস্তাটা খুব প্রিয় ছিল আমাদের। কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে দেবী পুস্তকালয়ের ঠিক সামনে। অথচ আমরা ট্রামে উঠতাম না। কিন্তু শেষ দুপুরে বা বিকেল ফুরোবার আগে কলেজ ছুটি হলে সবাই যখন যেত বসন্ত কেবিনে, কলেজ ক্যান্টিনে বা হেদুয়ার ভেতরে ছায়া ছায়া আড়াল খুঁজতে .. তেমনই কোনো কোনো দিনে ট্রামলাইনের সামনের রাস্তাতে এসে দাঁড়াতাম। আর যেদিনই এমনটা হত, তুমি একই বুলি আওড়াতে।
– চল চল, বেথুনের সামনে ফুচকাওয়ালাটা আছে। বেশি না..এই ছ'টা করে। তারপর তোমাকে একটা ফ্রি দেবে আর আমাকে একটা। তোমারটাও আমি খাব। তাহলে আমার আটটা হল ভাগে।
-একদিন এই ট্রামে উঠে আমরা যাব বুঝলে! সোজা টার্মিনাস। আবার এটাতেই ব্যাক করে আসব। আমার খুব শেষ দেখতে ইচ্ছে করে। ট্রামলাইনটা কোথায় গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে কে জানে!
প্রথম বায়না পূরণ হত মাঝে মাঝে।দ্বিতীয়টা আর হলই না কখনও! প্রথমটা মানে আমার অনন্ত সুখ! তুমি রাস্তা পেরোতে ভয় পাও। তাই আমার কনুইয়ের কাছটা খিমচে ধরে কোনক্রমে ওপারে পৌঁছনো।আর এমন অদ্ভুত মেয়ে তুমি রুমি …সিগনাল লাল ..তুমি তখন দোনামনা করছ । যাবে , না যাবে না! ফুচকা খাবে, না খাবে না। আর যেই হলুদ হল ..অমনি..
–চল চল।
তারপরেই হুড়োহুড়ি সবুজ, ঘরঘর করে ট্রাম, ঘাড়ের ওপর ডবল ডেকার, মিনিবাসের হেলপারের খিস্তি, আমার ভয়ে বিরক্তিতে প্রাণ যাই যাই আর তুমি….আমার কনুইতে নখ বসিয়ে শার্ট খাবলে ধরে আলো আলো মুখে রাস্তা পেরিয়ে যাও অবহেলায়। রাজহাঁসীর মতো দশ দিক তুচ্ছ করে। যেন আর্যাবর্ত থেকে দাক্ষিণাত্য তোমার বাবা যুদ্ধে জিতে তোমাকে দানপত্র করে দিয়েছেন!
আমি বলতাম,
—এরপর একদিন ট্রাম চাপা পড়বে।
তুমি খুব সিরিয়াস মুখে জানতে চেয়েছিলে,
–জীবনানন্দও বুঝি সবুজ আলোয় রাস্তা পার হতে গিয়েই …?
তোমাকে কী যে বলব বুঝে উঠতে পারিনি।পাগলি একটা!
"আকাশেও চোখ আছে বাতাস উৎসুক, তবু তুমি শুধু
দেখছ না আমাকে "
"কবিতা তোমার ওষ্ঠে, তোমার অঙ্গুলি স্পর্শে, নখের ধুলোয়
মিশে থাকে"
তুমি কি প্রেমে পড়েছিলে আমার? কখনও? আমি তো পড়েছিলাম! কিন্তু মুখ ফুটে বলতেই পারিনি! ভেবেছিলাম অনেক সময় আছে হাতে; সুযোগ বুঝে একদিন বলে দেব ঠিক! আমি বুঝতেই পারিনি..জানো ..কবে যে তুমি বড় হয়ে গেলে, ফুচকা খেতে যেতে শুরু করলে টাউন স্কুলের মোড়ে ..ওখানকার ফুচকা নাকি উত্তর কলকাতার সেরা। ফাউ দিত? একের বেশি? ক'টা? আমি টেরই পেলাম না..কবে তুমি অন্য রুটে ট্রামে উঠে শেষ দেখে এলে। আমি কিছুই বুঝে ওঠার আগেই একদিন দেখলাম তুমি হাত রেখেছ যুক্তি আর নিরাপত্তার হাতে। তারপর ঠিকঠাক লালবাতি জ্বলে ওঠার অপেক্ষা করলে আর ওই হাত শক্ত করে ধরে ট্রামলাইন পেরিয়ে গেলে সাবধানে।
"ঝড় ওঠবার আগেই সে কেন হঠাৎ হারিয়ে গেল
নৈরাজ্য বা বিপর্যয়ের জন্য একটু অপেক্ষা করল না
আকাশ যখন মেঘের সঙ্গে মেতে ওঠে সংঘর্ষে
তখন চতুর্দিকেই তো চলে এলোমেলো আনাগোনা।
যারা কাছে ছিল তারা কোন টানে চলে গেল খুব দূরে
একা বসে আছি সারাটা বিকেল রোদ ঝলমল ছুটি
কিংবা আমিই জ্যা – মুক্ত এক তিরের মতন বেগে
কিছুই না জেনে বাতাসে রেখেছি ব্যর্থ বজ্রমুঠি।
আমি হাঁ করে বসন্ত কেবিনের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তুমি দেখতেই পেলে না আমাকে। না না , আমি জানি, ইচ্ছে করে নয়! আমাকে সত্যিই দেখতে পাওনি তুমি। তাহলে একটু নিশ্চয়ই চেনা দিয়ে হাসতে। সব কিছু কেমন আমার চোখের সামনে অথচ মনের অগোচরে ঘটে যাচ্ছিল। স্লাইড শো।
তুমি চলে গেলে। অরিন্দম এসে আমার হাত ধরল। নিয়ে গেল চন্দ্রমল্লিকার কাছে। ওর ডালিয়া। আমার চন্দ্রমল্লিকা। সব মেয়েই নাকি ফুল। সহজ। সরল। সুন্দর। আমার তখন মাথার ভেতরে রেলগাড়ি চলে অবিরাম। ঝমঝম শব্দ। ঘেঁটু, কচুরিপানা। নিখিলের পয়সায় সেই প্রথম ..আমার মদ গেলা। বেশ ধুনকি লেগেছে। চন্দ্রমল্লিকা আমাকে বলল, "দু'চার লাইন অন্তত বল। আমি সব বুঝতে পারি না, তবু আমার ভালো লাগে। মনে হয় অন্য জগতের কথা —
"ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে ..এতকাল ডাকনি আমায়।
কাঙালের মতো আমি এত একা, তোমার কি মায়া হয়নি;
শোননি আমার দীর্ঘশ্বাস?
হৃদয় উন্মুক্ত ছিল, তবুও হৃদয় ভরা এমন প্রবাস ….
আমার কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল সব। কানের পাশে আগুন। আমি চন্দ্রমল্লিকাকে… বললাম, "তুমি অসহ্য সুন্দর। তোমাকে আমি ভেঙে ফেলব, নষ্ট করে ফেলব।" আসলে বলতে চাইনি! অরিন্দম আমাকে বলিয়ে নিয়েছিল।
ও খুব সুন্দর ..জানো রুমি! কিন্তু অরিন্দম আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল, "এ সেই ধরনের সৌন্দর্য, যা দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।দেওয়ালির আলোতে বাদলা পোকারা যে সৌন্দর্য দেখতে পায়। "
আমার ভেতরে ভর করেছে অরিন্দম। ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা…ফুলদানির সাজানো ফুল…দেখছি … দেখছি…
আ:, অরিন্দম আমার ভেতরে এমন বাসা বেঁধে আছে….আমি অরিন্দমের শেখানো বুলি আওড়ালাম তোতাপাখির মতো।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি না। ভালো না বেসে কি কারো শরীর ছোঁয়া যায় ?"
চন্দ্রমল্লিকা বাঁকা হেসে আমাকে বলেছিল, "ভালোবাসা খুব ভালো। কিন্তু একজনকেই তুমি সারা জীবন ভালোবাসবে, এরকম প্রতিজ্ঞা করলে কেন? সারা জীবন রাখতে পারবে?"
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিলাম, "তা জানি না। কিন্তু এখন এ প্রতিজ্ঞা ভাঙার সামর্থ্য আমার নেই। "
আমি যে তখন তোমায় দেখছিলাম। কমলালেবু রোদ্দুরে আঁচল ভিজিয়ে তুমি!
অথচ তুমি ছিলে না।
"আমার সে অরণ্য প্রবাসে, উপবাস-খিন্ন দেহের সামনে
তুমি পায়সান্নের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে না
গাছতলার আলো ছায়ায় আর কেউ ছিল না….."
তবু থাকে। থেকে যায়।
কিছু কিছু অভ্রকুচি সুখদৃশ্য এভাবেই। আমৃত্যু। আমাদের চোখের পাতায়।
"ময়দানে বোতাম খোলা ছেলেটি আর একটু দাঁতে কাটুক ঘাস
মেয়েটির চোখ থাক না কান্নাভেজা, রুমাল ছোঁয়াবার দরকার নেই
আরও কিছুক্ষণ, আরও কিছুক্ষণ
বিশ্ব-সংসার চোখ বুজে থাকো
দূরত্ব,তুমি থমকে দাঁড়াও।"
[অংশ-সংলাপ ঋণ : কবি ও নর্তকী উপন্যাসের অরিন্দমের কাছে, আর অংশ – কবিতা ঋণ ? সেও সুনীলের কাছেই ।]
