এ গান ভাবাবেশে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সামনে কেবল গাইতে হয়। ধরে রাখতে নেই।

আখড়াবাড়িতে প্রধান অনুষ্ঠান হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুষ্পভঙ্গ ও কুঞ্জরাগ। আর এই উৎসব যত না পূজাঅর্চনা ও ভোগের উপাচারের তার থেকেও বেশি গানের। মা গোঁসাই পুষ্পভঙ্গের গান গাইছেন, গাইছেন কুঞ্জ সাজানোর গান। আর এই গানে অনিবার্য রাধারমণ।তিনি বৈষ্ণব সহজিয়া মতে বিশ্বাসী ছিলেন। ওঁর ভাবাবেশ হত। সাধক যখন খুব উচ্চ পর্যায়ে চলে যান তখনই এই ভাবাবেশ আসে। এটা দেখনদারি কোনও ব্যাপার তো নয়। চৈতন্যদেবের হত। আবেশে আকুল হয়ে তিনি বলতেন, হা হা কৃষ্ণ… প্রাণধন… কাঁহা গেলে তোমা পাই। এই পাওয়ার বাসনা নিয়েই রাধারানি বা কখনও সখী হয়ে গান রচনা করতেন রাধারমণ। তাঁর শিষ্যরা ভাবাবেশের সেই গান তৎক্ষণাৎ মুখস্থ করে নিতেন। আবেশ শেষ, গান শেষ। সুনামগঞ্জের মানুষ তিনি।

হাওরের মরমিয়া সাধকদের কথা বলতে গেলে শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহের মতোই অনিবার্য এক নাম রাধারমণ। তাঁর আশ্রমের প্রধান সাধনা ছিল গান। আমার দাদুগুরু ভবা পাগলা বলতেন, গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা… মন্ত্রতন্ত্র কিছুই লাগে না। এই গান এখন হৈমন্তী শুক্লার কন্ঠে বিখ্যাত। রাধারমণের গান সিলেট, সুনামগঞ্জ, ভাটি পেরিয়ে এ বঙ্গের বৈষ্ণব আখড়াতেও সাধনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাটুলি, রূপকবিরাজী, নিত্যানন্দ, বীরভদ্র মতের বৈষ্ণব আখড়াবাড়িতে রাধারমণের গান যথেষ্ট ভাবাবেশে গাওয়া হয়।

পাটুলির বৃন্দাবনী আখড়ার মা গোঁসাই যখন গান, ভ্রমর কইও গিয়া /শ্রীকৃষ্ণবিচ্ছেদে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে /ভ্রমর কইও গিয়া… তখন যেন মা গোঁসাই জীবন্ত শ্রীরাধা। একঢাল কালো চুলে, গেরুয়া বসনে, পান খাওয়া ঠোঁটের মা গোঁসাইকে আমার তখন রাধারানি বলেই মনে হয়। বৃন্দাবনী আখড়া গম গম করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিচ্ছেদে। এই বিচ্ছেদীতে শুদ্ধতার ছোঁয়া না এলে আবার গান সাধনা হয় না, হয় মনোরঞ্জন।

অথচ রাধারমণের এই বিখ্যাত গান এখন শুদ্ধতার বালাই উঠিয়ে শিল্পীরা যে যাঁর মতো করে গেয়ে যান। রীতিমত কথার বিকৃতি ঘটিয়ে। বিশুদ্ধতার প্রশ্নে বলা যায় সিলেটের অভাবী লোকসঙ্গীত শিল্পী রণেন রায়চৌধুরীর নাম। সিলেটি হেমাঙ্গ বিশ্বাস, খালেদ চৌধুরীরা এই বিশুদ্ধতার পক্ষে সবসময়ই সওয়াল করেছেন।রণেন যখন গান রাধারমণ, তখন তাই —- ভ্রমর রে /না খাই অন্ন না খাই পানি /না বান্ধি মাথার কেশ /একলা মন্দিরে থাকি /পাগলিনী বেশ রে /ভ্রমর কইও গিয়া।। রাধারমণের এই দরদী বিচ্ছেদী কথকতাগুলোর বিকৃতি ঘটে না। ঠিক যেমন ঘটে না গোঁসাই মায়ের গাওয়া বিচ্ছেদীতেও। এটা তো বুঝতে হবে নারীবেশী পুরুষ গাইছেন এই আকুতি ভরা গান।

চৈতন্যদেবের কয়েকজন শিষ্য নারীবেশে সাধনা করতেন, সেই সাধনা বাংলায় পরবর্তী সময়েও বেশ জায়মান। নবদ্বীপে থাকতেন ললিতা সখী। আদ্যন্ত পুরুষ মানুষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার। তাঁর ছিল ব্রজগোপীর সাধনা। এই নারীবেশী পুরুষ সাধিকাকে দেখতে গিয়েছিলেন তন্ত্র ও মরমিয়াবাদের প্রধান গবেষক অধ্যাপক চিন্তাহরণ চক্রবর্তী। সেই শাড়ি সামলানো সাধিকাপুরুষের গল্প তিনি করেছিলেন ছাত্র সুধীর চক্রবর্তীকে। গৌড়বঙ্গে রামকেলির পাশে রাজপুরে আছেন কৃপাময়ী। তিনিও পুরুষ। কিন্তু নারী সেজে ব্রজগোপীর সাধনা করছেন। সুধীরবাবুর কাছে প্রথম এই তথ্য পাই। নবদ্বীপে সমাজ বাড়ির সাধনায় একসময় নারীবেশী পুরুষের স্রোত ছিল। এখনও এই স্রোত অল্প হলেও নদিয়ায় বর্তমান।

এখানের দরবেশী সাধনার এক ধারায় পুরুষ ও নারী সকলেই নামের পর রানি শব্দ যোগ করেন। আমি যখন দেখা করতে গেলাম নিতাইরানি দরবেশের সঙ্গে তখন জানতাম তিনি নারী। মাথাতে ঘোমটা টেনে যখন তিনি কথা বলতে থাকলেন, বুঝলাম আস্তেধীরে পুরুষ মানুষ । আসলে এসব হল গিয়ে বিভোরের সাধনা। ফকির লালন শাহ বলতেন, ডুবলে পরে রতন পাবে ভাসলে পরে পাবে না। তাই রাধারমণের গান আদতেই পুরষবেশী নারীর গান। সেই গান ডুবে না গাইতে পারলে তার ভাব ও আবেশ ফোটানো খুবই কষ্টসাধ্য। কিন্তু একেই অনায়াসসাধ্য করেছেন সিলেটের প্রবীণা শিল্পী সুষমা দাশ। রাধারমণের গানের সম্মাননীয়া এই শিল্পী এ বছরই পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের একুশে সম্মান।

আরেক সিলেটী চন্দ্রাবতী রায়বর্মণ। তিনিও রাধারমণের গানের সম্মাননীয়া শিল্পী। তাঁর এক সাক্ষাৎকার গ্রন্থ পড়লাম। বন্ধু সুমনকুমার দাস সিলেট থেকে পাঠিয়েছে এই গ্রন্থ। সাক্ষাৎকারটি ওঁর নেওয়া। রাধারমণের অনেক অগ্রন্থিত গানও সংগ্রহ করেছে সুমন। সেসব এক জায়গায় করে বের হয়েছে বই সুমনকুমার দাসের সম্পাদনায়। আমি জানি না সুষমা ও চন্দ্রাবতীর গান ইউ টিউবে মেলে কিনা।

আমাদের মনের মানুষ শিল্পী ও সংগ্রাহক মৌসুমী ভৌমিক এই দুই নারীর গান বের করেছেন ফিল্ড রেকর্ডিং থেকে। এটা না বেরোলে জানাই যেত না মেয়েদের গানের অসামান্য বিচ্ছেদী। বৃন্দাবনী আখড়ার মা গোঁসাই যমুনাবালা দাসীর বিচ্ছেদী হারিয়ে যাবে। তাঁর গুরুদেবের বারণ সাধন গান ধরে রাখা যাবে না। এ গান ভাবাবেশে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সামনে কেবল গাইতে হয়। ধরে রাখতে নেই। তাই বাঙালি আরেক সাধিকানারীর বিচ্ছেদী হারিয়ে যাচ্ছে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। তাঁকে না জানিয়ে এ সম্পদ ধরে রাখা যায়। কিন্তু মা গোঁসাইয়ের বিশ্বাসকে আঘাত করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য আমার নেই।

Developed by DXDasia