বিলেতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রথম ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন প্রমথলাল

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের

“যে আশা ভারতবাসী চিরদিন তরে/ পলাশির রণ-রক্তে দিয়ে বিসর্জ্জন,/ কহিবে, স্মরিবে নাহি ভাবিবে অন্তরে,/ কল্পনে! সে কথা মিছে কহ কি কারণ?”
‘পলাশির যুদ্ধ’ কবিতায় ইংরেজের হাতে ভারত-সূর্যের অস্তমিত হওয়াকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন নবীনচন্দ্র সেন। দীর্ঘ কাব্যে জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করে তোলার এমন উদ্যোগ নবীনচন্দ্র সেনকে তাঁরই সমসাময়িক, বেশ কিছুটা বড়োই বলতে গেলে, আরও এক কবির পাশেই স্থান করে দিয়েছে। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যাঁকে বলা যায়, এই ধারার সফল প্রবর্তক।
 
কিন্তু কবি ছাড়াও নবীনচন্দ্র সেনের আরও একটি পরিচয় হল, তিনি ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম পুরোধা কেশবচন্দ্র সেনের ছোটো ভাই। মধ্যযুগীয় সমাজ ব্যবস্থায় আমূল বদল আনতে যে সভার প্রতিষ্ঠা, সেই ব্রাহ্ম সমাজ কিন্তু কখনোই সমাজের সর্বস্তরে চালিত হয়ে সংস্কার-সাধন করতে পারেনি। এর মূল কারণ হিসাবে শিক্ষাবিদ প্রসন্নকুমার রায় বলেছিলেন, ব্রাহ্মদের কোনও পদ্ধতিগত ধর্মতত্ত্ব ছিল না, যার ফলে তা কোনওভাবেই প্রতিষ্ঠানের আকার নিতে পারেনি।

এই ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে পড়াশোনার জন্য যেসব ব্রাহ্ম সদস্যগণ প্রথম বিলেত যাত্রা করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কেশবচন্দ্র সেনের ‘নববিধান ব্রাহ্মসমাজ’-এর তরুণ নেতা প্রমথলাল সেন। পারিবারিক দিক থেকে তাঁর পরিচয়, তিনি কেশবচন্দ্র সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং পূর্ব-উল্লিখিত কবি নবীনচন্দ্র সেনের পুত্র। সময়টা ১৮৯৭, অর্থাৎ ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশক পরে। ম্যাঞ্চেস্টার কলেজে দু’বছর পড়ার পর অদ্বৈতবাদীরা তাঁকে ডক্টর অফ ডিভিনিটি ডিগ্রি দিতে চাইলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কেশবচন্দ্র সেনের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা যে বছরে, সেই বছরেই জন্ম প্রমথলালের। ১৮৮৪-তে কেশবচন্দ্রের মৃত্যুর পর প্রমথলাল কয়েক বছর সিন্ধ প্রদেশের অন্তর্গত হায়দ্রাবাদে (বর্তমানে পাকিস্তানে) হীরানন্দ শৌকিরাম আদবানির সঙ্গে সমাজসেবার কাজ করেছিলেন। হীরানন্দ, তাঁর বড়ো দাদা নবলরাই সকলেই ব্রাহ্ম সমাজের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। কলকাতায় প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসে সেন বাড়িতেই থাকতেন হীরানন্দ ও তাঁর ছোটোভাই মোতিরাম। মধুর স্বভাবের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের বড়ো প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি। প্রমথলাল ওরফে নালুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা সেই সময় থেকেই। ১৮৯৩ সালে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে হীরানন্দের অকালমৃত্যুর পর কলকাতায় ফিরে এসে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের সহকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন। বছরটা লক্ষণীয়, কারণ এই বছরেই সনাতন ভারতীয় দর্শনকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরলেন তিরিশ বছরের যুবক সন্ন্যাসীটি। কিন্তু তাঁর সঙ্গেই আরও একজন বাঙালি যে চিকাগোর ধর্মমহাসভায় উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে, তিনি স্বয়ং প্রতাপচন্দ্র মজুমদার।

চিকাগোর ধর্মমহাসভার আয়োজক ছিলেন অদ্বৈতবাদীরা। সতেরো বছর পর বার্লিনে তাঁদেরই আয়োজিত ধর্ম সম্মেলনে এবার ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে গেলেন প্রমথলাল সেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর শিষ্য থানওয়ারদাস লিলারাম বসওয়ানি। সম্ভবত, এই সময়েই বিলেতে প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন প্রমথলাল।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। রবীন্দ্রনাথের কবিতার আদ্যন্ত ভক্ত ছিলেন তিনি। ১৯১১ সালে লন্ডনে রথেনস্টাইনকে রবিঠাকুরের কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করতে যে দুজন প্রভূত উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন প্রমথলাল সেন ও আরও একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। সেসময় রবীন্দ্রনাথের কবিতার ইংরাজি অনুবাদ করছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী ও রবীন্দ্রনাথ দত্ত। প্রমথলালই রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে বলেন, অজিত চক্রবর্তীর আরও কিছু অনূদিত কবিতা বিলেতে পাঠাতে। কবির বিলেতে যাওয়াও স্থির হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় সেসময় তিনি যেতে পারেননি। পরে ১৯১২ সালে প্রমথলালকে চিঠিতে জানান যে, অনুবাদগুলি পছন্দ না হওয়ায় তিনি এবার ইংল্যান্ডে গেলে নিজেই হয়তো অনুবাদ করবেন।

কবির কবিতার অনুবাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজনের পরিণাম আমরা অচিরেই দেখেছি। কিন্তু প্রমথলালের মতো মানুষেরা থেকে গেছেন আড়ালেই। ব্যক্তিজীবনে নিপাট সহজ-সরল এক মানুষ। যাপনে আড়ম্বর ছিল না তাঁর। তাই বোধহয় মৃত্যুর কাছাকাছি এসে তিনি বারবার গাইতেন – ‘এবার ডুবিলাম, ডুবিলাম, প্রাণরাম সাগরে’।

Developed by DXDasia