শুধু বিজ্ঞানীই নন, বিপ্লবীও ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র

একসময় অস্ত্র কেনার জন্য গোপনে অর্থ সাহায্যও করতেন বিপ্লবীদের

তাঁর মূল পরিচয় বিজ্ঞানী হিসেবেই। অথচ তিনি তাঁর বিজ্ঞানী পরিচয়কে ছাপিয়ে এক সময় হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবী। স্বদেশী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এই মানুষটি। একসময় অস্ত্র কেনার জন্য গোপনে অর্থ সাহায্যও করতেন বিপ্লবীদের। তাঁর বিপ্লবী সত্ত্বাকে দেখে ব্রিটিশ সরকারের এক গোয়েন্দা একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে কলকাতার টাউন হলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় এই বিজ্ঞানী বলেন, "দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্টটিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে, বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।" এই বিজ্ঞানী আর কেউ নন, বিখ্যাত রসায়নবিদ ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

স্বদেশি আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী কলকাতায় এলে প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর সঙ্গে সভায় যোগদান করেন। শুধু তাই নয়, গান্ধীজীর সরল জীবন যাপন ও মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে জাতীয় কংগেসে যোগদান করেন। গান্ধীজীর প্রতি অগাধ আস্থাশীল প্রফুল্লচন্দ্র প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন।

প্রফুল্লচন্দ্র নিজের জেলা খুলনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত সেবাশ্রম’, যেখানে গান্ধীজির অনুকরণে চরকায় সুতা কেটে মানুষকে স্বদেশি আন্দোলনে উদ্ধুদ্ধ করতে থাকেন। গান্ধীজীর নেতৃত্বে ‘লবণ আইন অমান্য আন্দোলন' যা ‘লবণ সত্যাগ্রহ’ নামে পরিচিত ছিল সেই আন্দোলনও প্রফুল্লচন্দ্র শুরু করেছিলেন নিজের গ্রাম খুলনার রাড়ুলী থেকেই। গান্ধীজীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ এই বিজ্ঞানী নিজের বিজ্ঞান কলেজের বারান্দায় একটি চরকা স্থাপন করেছিলেন।

খুলনা জেলার পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদীর তীরে রাড়ুলী গ্রামে প্রফুল্লচন্দ্রের জন্ম। বনেদি সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবার। গ্রামের সেই জমিদারবাড়িতেই শৈশব কেটেছে তাঁর। প্রফুল্লের মায়ের নাম ভুবনমোহিনী, পিতা হরিশচন্দ্র। পিতা হরিশচন্দ্র নিজের নামের যোগ্য হকদার ছিলেন, দান ধ্যান সমাজসেবার কাজে দেবতুল্য এই মানুষটিকে সবাই সম্মান করত।

প্রফুল্লচন্দ্রের হাতেখড়ি হয় তাঁর বাবা হরিশচন্দ্রের তৈরি এম. ই. স্কুলে। পরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি, পড়াশোনার জন্য। ভর্তি হন হেয়ার স্কুলে। কিন্তু বাধ সাধল অসুখ। আক্রান্ত হলেন রক্ত আমাশয় রোগে। ফলে পড়াশোনায় ছেদ পড়ল। প্রায় দু'বছর পড়াশোনায় বিরতি। এই দু'বছর তিনি কাটালেন গ্রামের বাড়িতে, আর এই দু'বছরই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

বাবা হরিশচন্দ্রের ছিল একটি অসাধারণ লাইব্রেরি। অসুস্থতার এই সময়টায় প্রফুল্লচন্দ্র বাবার লাইব্রেরিতে বিভিন্ন বই পড়তে লাগলেন। হিন্দু পুরাণ, মুসলিম সাহিত্য, কোরান – সবকিছুই। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের এসব পড়াশোনা প্রফুল্লচন্দ্রকে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলল। সুস্থ হওয়ার পর আবার কলকাতায় ফিরে গেলেন। ভর্তি হলেন অ্যালবার্ট স্কুলে। এই স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করলেন। এরপর মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলেন।

এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন বি.এ পড়ার জন্য, কিন্তু সেখানে পড়াশোনা চলাকালীন স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে ‘গিলক্রিষ্ট বৃত্তি’ পেলেন প্রফুল্লচন্দ্র। সেখান থেকেই রসায়নে বি.এস.সি'র পাঠ শেষ করেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই 'ডক্টর অব সায়েন্স' ডিগ্রি অর্জনের জন্যে গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। দুবছরে তার গবেষণার বিষয় ছিল- ‘কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি’। রসায়নে ডক্টরেট উপাধি পেলেন। প্রফুল্লচন্দ্রের গবেষণাপত্রটি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হল।যেকারনে লাভ করলেন ১০০ পাউন্ডের ‘হোপ প্রাইজ’ পুরষ্কার। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যায় প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ফাদার অফ ইন্ডিয়ান কেমিস্ট্রি' হিসেবে।

সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ‘আচার্য’ বা ‘মহান শিক্ষক’ হিসেবে। শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। ইউরোপের আয়েশি উন্নত জীবনের ধারে কাছে তিনি কোনোদিন ঘেঁষেননি। সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। যেটুকু খরচ না করলেই নয়, তার বাইরে নিজের জন্য খরচ করা একেবারেই পছন্দ করতেন না তিনি।

দেশে ফিরেই চাকরি পেলেন না প্রফুল্লচন্দ্র। জগদীশচন্দ্র তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ান। দেশের প্রথম আধুনিক রসায়নবিদ 'ড. প্রফুল্লচন্দ্র' তখন বেকার। ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষাবিভাগে কাজ করার সুযোগ পেলেন না। মাঝেমধ্যেই সময় পেলে যান জগদীশচন্দ্রের বাড়ি। কিন্তু জগদীশচন্দ্র তখন প্রফুল্লচন্দ্রকে কোনো সাহায্য করতে পারলেন না।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রেসিডেন্সি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন প্রফুল্লচন্দ্র। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন আমৃত্যু।

ক্লাসে বক্তৃতা দিতেন বাংলায়, যাতে ছাত্রদের বুঝতে সুবিধা হয়। অসাধারণ ছিল তাঁর বাচনভঙ্গি। পড়ানোর সাথে সাথে তিনি দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের জীবনকাহিনী ও নানান আবিষ্কার নিয়ে কথা বলতেন। প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে স্বনামধন্য বিজ্ঞানী হয়েছিলেন। যাদের মধ্যে আছেন ড. মেঘনাদ সাহা, ড. কুদরত-ই-খুদা, হেমেন্দ্রকুমার সেনের মত বিজ্ঞানী।

এদিকে ইংল্যান্ডে তখন সদ্য গঠিত হয়েছে সাইমন কমিশন। কমিশনের পদাধিকারীরা লন্ডনে থাকতেই শুনেছিলেন কলকাতার বিজ্ঞান কলেজের নাম। আর শুনেছিলেন এই কলেজের এক বিজ্ঞানীর কথা। কমিশনের লোকজন ঠিক করলেন তাঁরা বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে যাবেন। এলেনও। দুপুরবেলা, কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজে এলেন। এসেই খোঁজ করে উপস্থিত হলেন প্রফুল্লচন্দ্রের ঘরে। তাঁরা দেখলেন, একটি সাদামাঠা কক্ষ। ঘরের একদিকে একটি সাধারণ খাট, মাঝখানে একটি টেবিল-চেয়ার আর অন্যদিকে পোশাক রাখার জন্য একটি কমদামি আলনা। তাঁরা দেখলেন ঘরের মধ্যে একজন গামছা পরে বসে রয়েছেন, আর ভিজে ধুতিখানা রোদে শুকোচ্ছেন। এই মানুষটিই কিনা দেশের সেরা রসায়নবিদ প্রফুল্লচন্দ্র রায়! লন্ডনে তারা এই মানুষটিরই এত তারিফ শুনেছেন! কমিশনের লোকেরা তো প্রফুল্লচন্দ্রকে দেখে অবাক!

বাঙালির শিল্প-কারখানা স্থাপন ও ব্যবসায় অনাগ্রহই যে জাতির পিছিয়ে থাকার কারণ, সেটি প্রফুল্লচন্দ্র লক্ষ্য করেছিলেন। ব্যবসার দিকে না গিয়ে শিক্ষিত যুবকদের দলে দলে ব্রিটিশ অফিসে কেরানিগিরিতে যোগদান করছেন দেখে তিনি চরম বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগলেন তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্য দিয়ে। বাঙালিদের ব্যাবসায় আগ্রহী করে তোলার জন্য নিজে উদ্যোগ নিলেন।

সেসময় সর্বত্র ছিল বিলিতি পণ্যের রমরমা। আর বাজারে ওষুধ বলতে ছিল বিলিতি ওষুধ। বিলিতি ঔষধের রমরমা কমিয়ে দেশীয় ঔষধের নিজস্ব বাজার তৈরি করতে তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যালস, ‘বেঙ্গল কেমিকেল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড’। মেডিসিন তৈরির জগতে বিপ্লব এনে দিল প্রফুল্লচন্দ্রের ভাবনা।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বিয়ে করেননি। সারা জীবনই ব্যয় করেছেন গবেষণা, শিক্ষকতা আর সেবাকার্যে। ভেবেছেন বাঙালি জাতির উন্নতির কথা। সারা জীবনের উপার্জন ব্যয় করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে। নিজের বাবার তৈরি এম.ই. স্কুলের আরো উন্নয়ন করেছেন, স্কুলের পরিসর আরো বাড়িয়ে পরে নামকরণ করেন আর.কে.বি.কে. হরিশচন্দ্র ইনস্টিটিউট। বাগেরহাটের পি.সি. কলেজ, সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুল সহ ইত্যাদি একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার অর্থানুকূল্যে তৈরি। খুলনার বি.এল কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশালের অশ্বিনীকুমার ইনস্টিটিউশন সহ প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তিনি অর্থসহায়তা করছিলেন।

শিক্ষার উন্নয়নই নয়, কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র গ্রামের ৪১টি সমবায় ঋণদান সমিতি নিয়ে গড়ে তোলেন ‘রাড়ুলী সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক’। এই ব্যাঙ্ক ছিল অবিভক্ত বাংলার তৃতীয় বৃহত্তম ব্যাঙ্ক।

আমৃত্যু শিক্ষকতা করে আর ছাত্রদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন এই বিজ্ঞানী। শেষ জীবনে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর বেঁচে ছিলেন আট বছর। সেই সময়ও কাটিয়েছিলেন বিজ্ঞান কলেজের একটি ছোট্ট ঘরে, যেখানে ছিল একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাবার জন্য ছোট্ট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। প্রিয় শিক্ষকের কাছে সবসময় ভিড় থাকত ছাত্রদের। এক ছাত্রেরই হাতে মাথা রেখে ৮৩ বছর বয়সে এই বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Developed by DXDasia