পির জঙ্গল বিলাসের মাজারে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সমারোহ

প্রসাদ মান্না
পির জঙ্গল বিলাসকে কেন্দ্র করে বৎসব্যাপী আরও যে সব বিরল প্রকৃতির ঘটনা ঘটে থাকে তার মধ্যে ১লা বৈশাখ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা মহরৎ, কালীপূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে, হিন্দুগণের ও সবেররাত উপলক্ষে মুসলমানগণের পিরের মাজারে বাতিদান, মহরম উপলক্ষে মুসলমানগণের তাজিয়াসহ পিরের দরগায় আগমন ও কারবালা যুদ্ধের নকল মহড়া প্রদর্শন, পৌষমাস ধরে হিন্দু মহিলাদের পিরের দরগায় বসে পিরের বনভোজন ব্রত পালন, পৌষ সংক্রান্তির বা মকর সংক্রান্তির ভোরে বা ব্রাহ্মমুহূর্তে পিরের পুণ্যপুকুরে হিন্দু মহিলাদের মকরস্নান প্রভৃতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বাণীবন গ্রামের পীরপুর পল্লীর প্রধান আকর্ষণ পির আব্বাসউদ্দিন শাহের কবরস্থান।

 

পিরের দরগায় হিন্দু মহিলাদের ‘বনভোজন’ ব্রত পর্ব শুরু হয় পৌষমাসে। পৌষমাস ধরে প্রতি রবিবার ও বুধবার এই বনভোজন ব্রত পালিত হয়ে থাকে। যে সব মহিলারা পিরের বনভোজন ব্রত করেন, তারা ব্রত পালনের দিন সূর্যোদয় থেকে উপবাস করেন। তারপর দুপুর নাগাদ পিরের দরগায় এসে কেউ পিরের পুণ্যপুকুরে স্নান করেন, কেউ বা পুণ্যপুকুরের জল মস্তকে ছিটিয়ে পিরের শিরনি বা পূজা দিয়ে পিরের দরগায় কলার পাতা পেতে মুড়ি, মুড়কি, খেজুরগুড়, তরি-তরকারি, পাঁপড়, ফুলুরি প্রভৃতি সহযোগে বনভোজন করে চাঁদের উপবাস ভঙ্গ করেন। তারপর ঘট ভরা পিরের পুণ্যপুকুরের জল নিয়ে ঘরে ফিরে, সেই জল ঘরবাড়ির চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন।

 

 

পিরের উদ্দেশ্যে এই বনভোজন ব্রতপর্ব কতকাল পূর্বে ও কী কারণে শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে লোকবাহিত এক কিংবদন্তীসূত্রে জানা যায় যে, এক সময় বাণীবন ছিল ভয়ঙ্কর এক জল-জঙ্গল। সেই জল-জঙ্গলে বসবাস করত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বংশধরগণ। সেই সঙ্গে নানা রকম হিংস্র জন্তু জানোয়ার। সেই ভয়ঙ্কর জল-জঙ্গলে এক সময় পির জঙ্গল বিলাস সাহেবের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ছিলেন প্রভুত ঐশীশক্তিসম্পন্ন এক পির। বাণীবনের জল-জঙ্গলে এসে তিনি তাঁর ঐশীশক্তি দিয়ে বনের বাঘ ও হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের বশীভূত করে জঙ্গল শাসন করতে থাকেন। তারপর এক সময় বাণীবনের বন কেটে মানুষ বসবাস করতে শুরু করলেও তাঁদের মনে সদাসর্বদা বনের বাঘ ও হিংস্র জন্তু জানোয়ারের ভয় থেকে গিয়েছিল। সে কারণে বনের বাঘ ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের আক্রমণ থেকে আপনাপন স্বামী, পুত্র, কন্যা, পরিবার, পরিজনদের রক্ষা করতে হিন্দু মহিলাগণ পির জঙ্গল বিলাসের শরণাপন্ন হন ও তাঁকে তুষ্ট করতে পৌষমাস ধরে বনভোজন ব্রত করতে করেন। পৌষমাসে পির জঙ্গল বিলাসের বনভোজন ব্রত করে, পিরের পুণ্যপুকুরের জল বাড়ির চারিপাশে ছড়িয়ে দিলে, সেই জল ছড়ানো গণ্ডির মধ্যে কোন বাঘ বা হিংস্র জন্ত-জানোয়ারের আক্রমণ ঘটবে না এই বিশ্বাসে আজও হিন্দু মহিলাগণ পৌষমাসে পির জঙ্গল বিলাসের বনভোজন ব্রত পালন করে থাকেন।

পিরের দরগায় হিন্দু মহিলাদের বনভোজনব্রত পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পর পৌষ সংক্রান্তির দিন পালিত হয় পিরের ঊরুষ উৎসব বা বাৎসরিক স্মরণোৎসব। এই উৎসবটি একান্তভাবেই মুসলমানদের। পিরের দরগায় মুসলমানদের ঊরুষ উৎসবটিকে হিন্দু মহিলাদের বনভোজন ব্রতপর্বের নামান্তর বলা যেতে পারে। কারণ এ ক্ষেত্রেও মুসলমানগণের দলবদ্ধভাবে আসা-যাওয়া, রান্না-খাওয়া, পিরের নাম-গান করা, প্রার্থনা করা মানত করা, মানত পরিশোঢ করা, গান-বাজনা করা ইত্যাদিই হ’ল প্রধান বিষয়।

 

পৌষ সংক্রান্তির রাতভর ঊরুষ উৎসব সারা করে চন্দন চর্চ্চিত কপালে, গলায় রজনীগন্ধার মালা পরে ভোর বেলায় যখন ঊরুষ যাত্রী মুসলমানগণ ঘরমুখো হন, ঠিক তখনই অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির ব্রহ্মমুহুর্তে পিরের পূণ্যপুকুরমুখী হন। মকর সংক্রান্তির ব্রাহ্মমুহূর্তে যে ভাবে সাগর তীর্থ যাত্রীরা সমুদ্রে মকর স্নান করে কপিল মুনির মন্দিরে পূজা দিয়ে থাকেন ঠিক সেই ভাবে এই সব হিন্দু মহিলারা পিরের পুণ্যপুকুরে মকরস্নান করে পিরের মাজারে পূজা বা শিরনি দিয়ে থাকেন। এই উৎসব ঘিরে বসে গ্রামীম মেলা। মেলায় বিক্রি হয় কালোহাঁড়ি, কললসী, বেত, বাঁশের জিনিসপত্র, লোহজাত সামগ্রী, শুকনো মাছ ও নানাধরনের ফল যেমন- কুল, শাকালু, বাদাম, খই। মেলা থেকে কেনা কালোহাঁড়ি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মাঘ মাসে শুভকামনার্থে রাখেন। প্রতিবছর এই হাঁড়ি পরিবর্তন করা হয়। মাঘ মাস জুড়ে চলা হাওড়া এই রকম নানা পীরের মেলায় পাওয়া যায় এই সব হাঁড়ি।&

(ঋণ – জেলা লোকসংস্কৃতি পরিচয় গ্রন্থ ‘হাওড়া’)

(ছবি- সোমা মুখোপাধ্যায়) 

Developed by DXDasia