
তাঁর জবানীতে তাঁর চিন্তাভাবনার টুকরো কিছু অংশ, স্মৃতিতর্পণ…
১৯৮১ তে জ্ঞানপীঠ, ২০০৪-এ পদ্মবিভূষণে সম্মানিত গদ্যকার ও কবি অমৃতা প্রীতম চলে গিয়েছিলেন আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে, ২০০৫-এর ৩১ শে অক্টোবর। খুলে বসেছিলাম অমৃতার লেখা ডায়রি। মনে হল, ভাষান্তরে এখানে থাকুক আজকের দিনে তাঁর জবানীতে তাঁর চিন্তাভাবনার টুকরো কিছু অংশ, স্মৃতিতর্পণ হিসেবে।
অমৃতা প্রীতমের ডায়রি "দ্য রেভেন্যু স্ট্যাম্প" -এর ১৭৪নং পাতার ইংরিজি অনুবাদ :
"১৯৬৩ সালে লিখেছিলাম 'জলের দাগ'। পরের বছর যখন তা দিনের আলো দেখল , জোর গুজব .. পঞ্জাব সরকার নাকি এই লেখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেবে। কিছুই তেমন হল না কিন্তু। বরং ১৯৬৫ তে হিন্দিতে অনুবাদ হল, ১৯৬৬ তে উর্দুতে। তখন মনে মনে ভাবনা চিন্তা করছি, ছায়াছবির সম্ভাবনা কতটা।কিন্তু কিছুই হল না, কারণ রেবতী শরণ শর্মা খুব স্পষ্ট আর অকপট উপদেশ দিয়েছিলেন, 'না! এই উপন্যাসিকা সময়ের চেয়ে এগিয়ে আছে অন্তত এক শতক। আমাদের মন , ভারতবাসীর মন এখনো সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়নি। '
বাসু ভট্টাচার্য আরও এক কদম এগিয়ে।তিনি বলেছিলেন, 'যদি সত্যিই এ ছবি রুপোলি পর্দায় আসে, তাহলে প্রকৃত অর্থেই এটি হবে প্রথম ছায়াছবি….প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।তবে ওই যে …যদি….।';
তারপর যখন ১৯৭৪ সালে আমার বন্ধু কৃষ্ণা ইংরিজি ভাষান্তরের কাজে হাত দিল, তখন যেন নতুন করে চিনলাম অলকাকে।অথচ কী আশ্চর্য, এভাবে চিনিইনি তাকে আগে, যখন তার গল্পটি বুনেছিলাম নিরালায়।
যখন নায়ক নায়িকাকে বলে, 'প্রতিবার কুড়ি টাকা খরচ করে সে সঙ্গমের তৃপ্তি কিনে নেয়', বিষণ্ণপ্রতিমা সে নায়িকা বলেছিল, 'যদি সে সাময়িক পছন্দের জায়গায় আমি থাকতে পারতাম, হলফ করে বলতে পারি….'
আমি ফিরে যাচ্ছিলাম অতীতে।ইমরোজ বলছিল তার পুরোনো কিছু সমস্যাবহুল দিনের কথা।অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, তার মধ্যে একটি ঘটনা কিছু না জেনেই আমি প্রায় হুবহু লিখেছি আমার এই লেখায়। আমারও ইমরোজের কথা শুনতে শুনতে আমার কাহিনীর মেয়েটির মতোই বলে উঠতে ইচ্ছে করছিল…একই কথা।একই ভাষায়, একই অনুভবে।
চিনতে পারলাম নিজেকে।নতুন করে।অমৃতা,শুধুমাত্র অমৃতাই পারে অলকার মতো কথা বলতে, অলকার মতো করে ভাবতে।আর কোনো নারী এত সাহসিনী হতেই পারত না!
চরিত্র চিত্রণ করলে স্বাভাবিকভাবেই চিত্রীর সঙ্গে চরিত্রের এক মেলবন্ধন হয় বটে , তবুও কোথাও না কোথাও কিছু অন্তর্লীন দূরত্ব রয়েই যায়। কিন্তু অলকার সঙ্গে যে কী অদ্ভুত একাত্মতা আমার! সম্পূর্ণ নিখুঁত প্রতিবিম্ব যেন! এই অনুভব এতই তীব্র, যে সেই ৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪ র রাতে আমি কবিতা লিখেছিলাম।অলকার জন্য। অলকার কথা ভেবে …..
আমার হাতে ছিল
একটা দুটো তিনটে নয়
হাজার চাবি
প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা প্রবেশদ্বারের জন্য
দরজা পেরিয়ে ভেতরে গেলে
কোথাও বৈঠকখানা, কোথাও বা ভারী পর্দাটানা শোবার ঘর
এ বাড়ির বাসিন্দাদের দুশ্চিন্তা আমার মধ্যেও চারিয়ে যায়
বুকের ভেতরে ওই ঘিনঘিনে ব্যথাটা যেমন
আমার সঙ্গে সঙ্গে ওরও যেমন ঘুম ভাঙে অভ্যস্ত নিয়মে
আবার জলে বুড়বুড়ি কেটে মিলিয়ে যায় স্বপ্নে
কিন্তু আমার প্রতিটি পদক্ষেপের ঠিক সামনে
আঁকা আছে লক্ষ্মণরেখা
যা কিছুতেই যেন পেরিয়ে যেতে পারি না
আর তাই জমানো চোখের জল যত
ফিরে যায় যে যার মালিকের গোপন হেফাজতে
পা সরিয়ে নিই, রেখা স্পর্শ করি না
দ্যাখো, অথচ আমারও আঁচলে ছিল হাজার চাবির গোছা
হাজার গল্প আর মুখ
কিন্তু তোমার ঘরের চাবিতে ছিল লুকোনো সুখের জাদু
চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললেই
ওই লক্ষ্মণরেখা আর পায়ের সামনে শুয়ে চোখ রাঙায় না
পেছনে পড়ে থাকে
আর সামনে…. তুমি নেই যদিও… কিন্তু আমি …..
(এই একটিমাত্র কবিতা আমি লিখেছিলাম আমার নিজের সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত হয়ে । অলকার জন্য। আর … আমার জন্যও। )
