পেশা বদলের কথকতা

ছোট ও প্রসারিত হয়ে চলা শহরগুলিতে পেশাভিত্তিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত মানুষদের অর্থনৈতিক উত্থান

মুম্বাই ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের এক সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা বলছে দেশে মধ্যবত্তিদের সংখ্যা ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। এই বৃদ্ধির পিছনে আইটি, বিপিও অথবা কোর সেক্টরের কোন ভূমিকা নেই। এই বৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু স্রেফ পেশাভিত্তিক জীবিকার হাত ধরেই। বড় তো বটেই এমনকি মাঝারি ও ছোট শহরের ইস্ত্রিওয়ালা আর ধোসাওয়ালা কিংবা ফুচকাওয়ালাদের আয় দেখলে চোখ কপালে উঠবে। এটা গোটা দেশ জুড়েই ঘটছে। ছোট ও প্রসারিত হয়ে চলা শহরগুলিতে পেশাভিত্তিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত মানুষদের অর্থনৈতিক উত্থান দেখলেই এটা বেশ বোঝা যায়।

যে কোন পেশার গায়ে থাকে সময়ের চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেশাও বদলে যায়। আগে শহরে চামড়ার মশকে করে ভিস্তিরা জল দিত। শহর জুড়ে জলের কল চালু হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দিন ফুরিয়েছে। নতুন বহুতলে বাসিন্দারা রিজার্ভারের জল খান না। সেখানে ভ্যান করে মিনারেল ওয়াটারের ডিসপেন্সারে সাপ্লাই করেন বহু মানুষ। বৃহত্তর কলকাতায় এটি এখন বহু মানুষের জীবিকা। শহরের পূর্ব ও দক্ষিণ প্রান্তে ডানা মেলেছে নতুন শহর। কাঁচা নর্দমা উদ্বাস্তু কলোনি বন্ধ কারখানার শেড আর চিমনিতে ছাওয়া এলাকাগুলি এখন উঠে আসছে আবাসন সংস্থার বিজ্ঞাপনে। সেখানকার উচ্চমধ্যবিত্ত বাসিন্দাদের চাহিদা মেটাতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জীবিকা। গৃহসজ্জা গার্ডেনিং পুষ্পসজ্জার কাজ করে অনেকেই সংসার চালাচ্ছেন। কেউ খুলেছেন ফ্লাওয়ার বুটিক কেউ বা করছেন রঙিন মাছের ব্যবসা আর ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে অ্যাকোয়ারিয়ামের দেখ ভাল করার কাজ।

কলকাতা তো বটেই ছোট মফস্বল শহরে ফ্ল্যাট ঘর সাজানোর জন্য নানা ধরণের শৌখিন শো-পিস আর ডেকোরেটিভ আইটেমের চাহিদা বাড়ছে। এথনোম্যানিয়ায় আক্রান্ত নতুন স্বদেশীরা সবাই নানা ধরণের লোকশিল্প বা তার ছোঁয়া লাগা সামগ্রী ব্যবহার করতে চান বা তা দিয়ে ঘর সাজাতে চান। সাবাই ঘাস থেকে কচুরিপানা, মাদুরকাঠি থেকে শীতলপাটি কোনটাতেই তাদের আপত্তি নেই। গুণমানে খাসা হস্তশিল্প এখন বাজারে আসতে না আসতেই ভ্যানিশ!

শহর ও শহরতলি ছাড়িয়ে এই প্রবণতা এখন কল্যাণী থেকে কৃষ্ণনগর। হিন্দমোটর চন্দননগর উত্তরপাড়া কিংবা বারাসাত বা মধ্যমগ্রামের মত জায়গাগুলির কথা বাদই দিলাম। এই তালিকায় অনায়াসেই এসে যাবে দুর্গাপুর আসানসোল শিলিগুড়ি আর মালদার মত শহরগুলি। শুধু লেকটাউন, সল্টলেক, নিউটাউনই নয় একটু মফস্বল শহরেও ভোরবেলা রাস্তায় বেরোলে চোখে পড়ে কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোনো বা তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মীদের। নিঃসঙ্গতা পশুপাখির প্রতি মানুষের প্রেম আরও বাড়িয়েছে। এদের চাহিদা মেটাতে খোঁজ পড়ছে ডগ ট্রেনার আর পেট কেয়ারদের। পার্কে, মাঠে পাড়ার জিমে দেখা যায় শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ দেওয়া স্যারদের। ব্যায়াম সমিতিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদায় দিয়ে মাল্টিজিম এখন ছোট শহরেও। ডগ ট্রেনার, ফিজিক্যাল ট্রেনার, গার্ডেনার সবাই কিন্তু এখন পেশাদার। এর শুধু পেশা করে কামাচ্ছেন তা নয়, একই সঙ্গে এরা প্রশিক্ষক। মানুষ এদের কাছেই শিখতে চায়। এগুলিও জীবিকার নতুন নতুন ক্ষেত্র।

কথায় বলে খেতে পেলে শুতে চায়। রোজগার বাড়ার ফলে মানুষের আর্থিক ভিত মজবুত হয়েছে। এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে তার কালচার্ড হওয়ার প্রচেষ্টা আরও প্রসারিত হয়েছে। লোকজন দলে দলে শিখছেন ফোক গান। শহরে ছৌ অ্যাকাডেমি বা রায়বেঁশে নাচের স্কুল হল বলে। পুরানো বাংলা গান থেকে থিয়েটারের গানের আগ্রহীদের সংখ্যা আরও বেশি। এসব কিছুর মাস্টারদের এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। বহু নামী শিল্পীর এটাই এখন মূল রোজগার। তারা অনলাইন আর স্কাইপে নাচ-গান শিখিয়ে কূল পাচ্ছেন না।

 

এসব কাজই বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নির্ভর। মোদ্দা কথা কাজ শিখে ফেললে কেউ বসে থাকে না। এসব নতুন জীবিকার পাশাপাশি পুরোনো মোটর মেকানিক ইলেকট্রিশিয়ান অটো-মেকানিক প্লাম্বার এসি ওয়াশিং মেশিন আর মোবাইল মেকানিকদের চাহিদাও তুঙ্গে। সত্যি বলতে কি এদের ডাকা মাত্র পাওয়া মানে স্বর্গ পাওয়া। কারণ চাহিদার তুলনায় যোগান কম। কাজেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কার্মীরা তো বটেই কাউকে বসে থাকতে হয় না। এগুলি একা একা করা যায়, শেখাও যায়। আবার দল গড়ে কিছু কর্মী নিয়েও করা যায়। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে এই জীবিকাগুলির কিছু উৎপাদন ভিত্তিক আবার কিছু পরিষেবা ভিত্তিক।

গত কয়েক দশকে শহরে কলকাতা তো বটেই রাজ্যের ছোট ও মাঝারি শহরগুলিতে সব থেকে বেশি বেড়েছে বিউটিপার্লার নাচ শেখার স্কুল আর মাল্টিজিম। সবগুলিই রমরম করে চলছে। এগুলি সবই পেশাভিত্তিক জীবিকা। বাজার আছে এমন পণ্য বা পরিষেবার প্রশিক্ষণ ভিত্তিক শিক্ষা অনেকেরই অসময়ের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। শেখার নেশা একসময় হয়ে উঠতে পারে পেশা। তাছাড়া যে কোন কাজে বিশেষ দক্ষতা শুধু কর্মসংস্থানই নয়, বাড়ায় মানুষের আত্মমর্যাদাও। নিজের এলাকায় স্থানীয় জীবিকা বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়লে কাজের খোঁজে মরীয়া হয়ে বাইরে যাওয়া কমবে। আবার স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবা পাওয়াও সহজ হবে।
 

রাজনীতি থেকে সংস্কৃতির পালাবদলের ভাঁজে ভাঁজে অনেক রহস্য ও উত্তেজনা থাকে। পেশা বদলের এই কথকতাও কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়। এর পরতে পরতে আমরা দেখতে পারছি এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উঠে আসার গল্প।

Developed by DXDasia