
যাত্রার স্বর্ণযুগ বলা হয় সত্তরের শুরু থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়টাকে
আশির দশকের শুরুতে গ্রাম বাংলার সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলেছিল ‘মরমী বধূ’ নামের এক যাত্রাপালা। জসীম উদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ অবলম্বনে নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। নট ও নাট্যকার নির্মল মুখোপাধ্যায় আর মীনাকুমারী তখন গ্রামের পর গ্রাম রাত জেগে অভিনয় করছেন। ‘মরমী বধূ’ পালা দেখতে ১০/১৫ কিলোমিটার ভ্যান রিকশা ভাড়া করে যেতেন বাড়ির মেয়েরা। গ্রামে যেহেতু কাছাকাছি আত্মীয়ের বাড়ি থাকে যাত্রাপালার আগের দিন থেকে তাই ভিড় জমাতেন মানুষ। নিখাদ প্রেমের এই পালা বলা যায় শরৎচন্দ্রের দেবদাসকে হারিয়ে দিয়েছিল।প্যান্ডেল থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হতেন না এমন নারী-পুরুষের সংখ্যা পাওয়া ছিল দুষ্কর।
তার আগে অবশ্য ‘বিবি আনন্দময়ী’, ‘নটী বিনোদিনী’, ‘মীরার বঁধুয়া’, ‘গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম’, ‘মা মাটি মানুষ’ বাংলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তার চেয়ে মরমী বধূ ছিল গ্রামের মানুষের অনেক কাছের। তখনও জনপ্রিয়তার বিচার হত কত টিকিট বিক্রি হল আর হাটে-বাজারে, মাঠে ঘাটে কোন যাত্রাপালা আলোচনা হচ্ছে, তা দিয়ে। গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, মীরার বঁধুয়া ছিল পৌরণিক পালা। হিন্দু, এমনকি মুসলমানদের একটা অংশ এই দুই যাত্রাপালা দেখতে ছুটতেন। এর বড় কারণ বীণা দাশগুপ্ত আর বেলা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়। তবে এই দুই নায়িকাকে ছাপিয়ে মীনাকুমারী হয়ে উঠেছিলেন গ্রাম বাংলার পার্বতী বা লায়লা মজনুর লায়লি।
এখন যেমন দুর্গোপুজোর রমরমা, পুজো শেষ হলেই পরের বারের থিম নিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে যায়, তখন প্যান্ডেলের পরের বারের বায়না দেওয়া হত বা রথযাত্রায়। প্রতিবছর যেমন হালখাতা হয়, তখনও যাত্রাপালায় হালখাতা হত। বায়না দেওয়া হত, উল্টোরথে বুকিং নেওয়া হত ঠিকই, তবে পছন্দমতো তারিখ পাওয়া যেত না।
গ্রামে তখন ‘শার্দুল জারাক খান’, ‘আমি সুভাষ বলছি’, ‘হারেমের কান্না’ও বেশ জনপ্রিয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকটাতেও বেশ জনপ্রিয় ছিল যাত্রাপালা। তার বেশ কিছুদিনের মধ্যেই হঠাৎ ভাটার টান। যাত্রার স্বর্ণযুগ বলা হয় সত্তরের শুরু থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়টাকে। অনেকে বলেন, ততদিনে গ্রামে ঢুকে পড়েছে টেলিভিশন, বিনোদন ঘরের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় যাত্রার নাকি কদর কমেছিল। কিন্তু যেসব কমিটি পালার আয়োজন করত তাদের মতে, নির্মল মুখার্জি, মীনাকুমারী, ইন্দ্র লাহিড়ী, ছন্দা রায়, বেলা মুখার্জি, বীণা দাশগুপ্ত, তরুণ কুমার, শিবদাস মুখার্জি যাত্রাজগৎ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন ততদিনে পরবর্তী ক্ষেত্রে যে পালা এসেছিল তা মানুষের মন ততটা জয় করতে পারেনি বলে লোকসান হতে শুরু করল। বড় কমিটিগুলো সরে এল পালা আয়োজন করা থেকে। তাই যাত্রাশিল্পে ভাটা পড়তে শুরু করল।
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র পরিচালনার কাহিনী
একসময় যেমন উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট ছিল যাত্রাপালার পীঠস্থান। কোলিয়ারি এলাকার বুকিং হত রানীগঞ্জ ও বর্ধমান থেকে। দুই মেদিনীপুরের বুকিং হত তমলুক বা নন্দকুমার থেকে। এখনও হয় ঠিকই, তবে সে কৌলিন্য আর নেই। একসময় যাত্রা করে জনপ্রিয় হয়েছিলেন যাঁরা তাঁদের অভিনয় দেখতেই মানুষ ভিড় জমাতেন। পরবর্তীকালে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের একটা অংশ নেমে পড়েন আসরে। তাঁদের দেখতে ভিড় জমান উৎসাহী মানুষ। ঠিক এখনও যেমন সিরিয়ালের পরিচিত মুখ দেখলে মানুষ ছুটে যান প্যান্ডেলে।
তা বলে কি পালার কদর কমেছে! আশির দশকে নামী পালা দেখতে যেমন মানুষ ছুটতেন, একই সঙ্গে গ্রামে হত মনসার ভাসান, বনবিবি চম্পা, রূপবান যাত্রা, বেহুলা-লখিন্দর, লায়লা মজনুর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় যাত্রাপালা। গ্রামে খেটে খাওয়া মানুষ হিন্দু-মুসলমান সন্ধের পর একসঙ্গে বসতেন রিহার্সালে। এক-একটা দল দু তিনটে করে পালা নামাত। সেরা অভিনেতা অভিনেত্রীকে খুশি হয়ে বহু মানুষ পুরস্কার দিতেন, তাঁদের নাম ঘোষণা করা হত মাইকে, এই নাম ঘোষণার ব্যাপারটা নামী যাত্রাতেও হত, গ্রামের মানুষ মনে করতেন এতে তাঁর সম্মান বেড়েছে, দেখাদেখি আরও অনেকেই ছুটে আসতেন স্টেজে। অভিনেতাদের মোটা টাকা ব্যক্তিগত আয় হত। গ্রামে একসময় যাত্রাপালার প্রতিযোগিতা হত। সেসব দিন এখন আর নেই। এর কারণ কী?
এখন মানুষের সময় কম। সবাই ছুটছেন আয়ের জন্য। সন্ধেবেলাতেও ফুরসত নেই, আর থাবা বসিয়েছে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে সামান্য হলেও চিড় ধরা। ধর্ম বেশ বড় আকারেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, বাঙালি মুসলমানদের বাড়ির বউ আর আগের মতো যাত্রা দেখার অনুমতি পান না। বহু মেয়ের গায়ে উঠেছে বোরখা। ধর্মের অনুশীলন হিন্দু মুসলমান উভয়ের মধ্যে বেড়েছে। যৌথভাবে যাত্রাপালা সংগঠিত করার মানসিকতা নেই। হিন্দু মন্দির যেমন বাড়ছে, মুসলমানদের মসজিদও বাড়ছে। শহরতলি ছাড়িয়ে এই প্রবণতা এখন গ্রামেও। আগে দেখা যেত বেহুলা সাজছেন মুসলমান অবিবাহিত মেয়ে, হিন্দুর অবিবাহিত ছেলে সাজছেন লখিন্দর, সেসব দিন আর নেই। ধর্মের বেড়াজালে সবই আটকে গেছে যেন।
