ধিমাল জনজাতির অতীত-বর্তমান

কেমন আছে উত্তরবঙ্গের এই প্রাচীন সম্প্রদায়?

একসময় তাঁরা বাঘ শিকার করতেন। বাঘের মাংসও খেতেন। এখন বাঘ শিকার করার সেই ধনুক বানানোর কায়দা কেউ জানেন না। বাঘের পাশাপাশি জঙ্গলের অন্য পশুও তাঁরা শিকার করতেন। এখন সেসব প্রথা লুপ্তপ্রায়। তার পরিবর্তে তাঁদের অনেকে গুই সাপ পেলে তা ধরে খান। আবার অনেকে এখনও ইদুরের মাংসও খেয়ে থাকেন। এঁরা হলেন উত্তরবঙ্গের আদিম জনজাতি ধিমাল সম্প্রদায়।

শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকের হাতিঘিসা ও মনিরাম গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা ছাড়া খড়িবাড়ির বুড়াগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেও বসবাস এই ধিমাল সম্প্রদায়ের। নকশালবাড়ির কেতুগাবুর এক ও দুই গ্রাম এলাকা ছাড়া হুসাই মল্লিক, সাদা মল্লিক, রামধনজোত, কিলারাম, নেহালজোত, বড়মনিরামজোত সব মিলিয়ে ১৮টি গ্রামে লুপ্তপ্রায় ধিমালদের কিছু কিছু মানুষ বসবাস করেন। দার্জিলিং জেলার তরাই অঞ্চলটি ১৮৫০ সালে ইংরেজ শাসনের অধীনে আসে। এর আগে অঞ্চলটি সিকিমের অধীনে ছিল। মূলত মল্লিক পদবিধারী ধিমালরা আগে তরাইয়ের পশ্চিমে কাঙ্কি নদী থেকে পূর্বে ডুয়ার্সের তোর্সা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে বাস করতেন। এখন তাঁদের বাসস্থান শুধুমাত্র দার্জিলিং জেলার তরাই অঞ্চলে। তাঁদের সংখ্যা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ছিল পনেরো হাজার, এখন তা কমতে কমতে হয়েছে ১০১০ জন। একটা সময় গোটা এলাকা ছিল জঙ্গলে পূর্ণ। চা বাগান বলতে কিছু ছিল না। ধিমালরা কৃষিপ্রধান এলাকায় চাষবাস ছাড়া পশু শিকার করে সময় পার করতেন। ইতিহাসবিদ ডঃ ইছামুদ্দিন সরকার এবং গবেষক অশোক গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের লেখায় জানাচ্ছেন, একসময় এই তরাই অঞ্চল বসবাসের অনুপযুক্ত ছিল। সবসময় ম্যালেরিয়া লেগে থাকত। কিন্তু নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে ইংরেজ আমলে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮৬২ সালে তরাই এলাকায় চা বাগানের সূচনা ঘটে। আর তখন থেকেই চা বাগানের কাজের জন্য বাইরের শ্রমিকদের আগমন ঘটতে থাকে। তার পাশাপাশি জোতদারেরা তাদের অনেক জমি চা বাগানের জন্য বিক্রি করতে থাকে। ফলে ধিমাল সহ মেচ, থারু, রাজবংশীদের অনেকে ভূমিহীনে পরিণত হতে থাকলেন। ব্রিটিশ ব্যবসা নীতির ফলে বহিরাগত ব্যবসায়ীদের আগমন হওয়ায় মহাজন শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। এরপর আবার ইংরেজ সরকার বনভূমিকে কৃষিজ ভূমিতে পরিণত করে রাজস্ব আয়ের একটা উপায়ের পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকে। তার ফলে চিরাচরিত কৃষিপদ্ধতি বা ঝুমচাষ বাতিল হতে থাকে। তারপর ১৯৪৬ সালে তেভাগা কৃষক আন্দোলনের প্রভাব সামান্য হলেও এই অঞ্চলে পড়ে। তাতে ধিমালরাও অংশ নেন। পরবর্তীতে নকশালবাড়িতে বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন বা নকশাল আন্দোলন দানা বাঁধলে সেখানেও এই আদিম জনজাতিরা অংশ নেন। কিন্তু সেই আন্দোলন শেষমেশ থমকে যাওয়ায় সরকারি দমননীতি, মামলা, জোতদারদের অত্যাচারের জেরে ধিমাল সহ অনেক জনজাতি আরও নিঃস্ব হয়ে পড়েন। দিনকে দিন তারা আরও পঙ্গু হয়ে পড়েন। তাঁদের সংখ্যা আরও কমে যেতে লাগল দিনকেদিন।

 

সময়ের প্রবাহে আজও এই ধিমালদের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সেখানকার শিক্ষক গর্জেন কুমার মল্লিক জানালেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ আসারও অনেক আগে এক সময় বাঘ শিকার করে তার মাংস খেতেন। বিশেষ ধরনের এক প্রকার ধনুক তৈরি করা হত। সেই ধনুকের মাথায় ধারালো বল্লম লাগানো থাকত। তার পাশাপাশি ছিল ছুঁচালো বাঁশ। আর বনের মধ্যে এই রকম বল্লম ও বাঁশ লাগানো অনেক ধনুক জায়গায় জায়গায় লাগানো থাকত। বাঘ সেই ধনুকের পাশ দিয়ে যখন দৌড়ে যেত তখন পেট চিরে যেত। তারপর আহত বাঘ একসময় বনেই লুটিয়ে পড়ত। তারপর সেই বাঘকে জঙ্গল থেকে তুলে এনে ভোজ হত। এভাবে চলত হরিণ শিকারও। এই শিকারকে তাঁরা বলতেন উস্টি। এখন সেইসব শিকার না হলেও তাঁদের কেউ কেউ মাটির নিচে গুই সাপ পেলে তা ধরে রান্না করে খেয়ে নেন। ধিমালদের কোনো কোনো ঘরে এখনও ইঁদুরের মাংস রান্না হয়। তার সঙ্গে পাখির মাংসও আছে। চলে শুয়োরের মাংসও। তাঁদের বাড়িতে অনেকে ঘোড়াও পুষতেন।

সেই সময় এক ধরনের ঢাকও বাজত। এখন সেই ঢাক তৈরি হলেও তা বাজানোর লোক ধিমালদের মধ্যে পাওয়া যায় না। তা বাজানোর জন্য নেপাল থেকে লোক নিয়ে আসতে হয়। ইংরেজরা আসার আগে সিকিম ও ভুটান রাজের সময় ধিমালদের কাউকে কাউকে জমির খাজনা ওঠানোর ভার দেওয়া হত। আর সেই রাজাদের সময় থেকেই তাঁদের কাউকে কাউকে রাজার পরিবার থেকে মল্লিক উপাধি দেওয়া হয়।

গ্রামগুলোয় সময়ের সঙ্গে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। মোবাইল আর নেট [পৌঁছে গেছে ঘরেও। পঞ্চায়েতের জন্য অনেক রাস্তাঘাট, স্বনির্ভরতার প্রকল্প এসেছে। ফলে তাঁদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে যাচ্ছে আজ। আর এতে পরিবর্তন হচ্ছে তাঁদের আদিম মানসিকতারও।

তবে আধুনিকতার সূত্রে যেভাবে তাঁদের সংস্কৃতি যেমন গানবাজনা, পোশাক, বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যেতে বসেছে তাতে গভীর উদ্বিগ্ন শিক্ষক গর্জেনবাবু। এই ধিমালদের মধ্যে আগে তাঁতের তৈরি হাতের কাজও ছিল। একে তাঁরা টানা বা থিরকা বলতেন। এখন বড় থিরকা না থাকলেও ছোট টানা রয়ে গেছে। তাঁদের মহিলারা ঘরে হস্তশিল্প ধোকড়ার কাজ করেন।

Developed by DXDasia